বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে স্বস্তি ও অস্বস্তির মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। প্রবাসী আয়ের রেকর্ড প্রবাহে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, রপ্তানি ও মূল্যস্ফীতির কিছু সূচকেও মিলেছে ইতিবাচক বার্তা। তবে অর্থনীতির প্রাণভোমরা বিনিয়োগে এখনো ফেরেনি কাঙ্ক্ষিত গতি। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেমেছে প্রায় তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বেড়েছে খেলাপি ঋণের বোঝাও। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। ফলে বৈদেশিক খাতে স্বস্তি ফিরলেও অর্থনীতিতে টেকসই গতি ফেরার চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ২৯ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। ছয় মাসের ব্যবধানে ১২ আগস্ট দিন শেষে মোট রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ এখন ৩২ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার।
আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ রয়েছে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। মাসে গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় ধরলে এই রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। সাধারণভাবে তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ রিজার্ভকে নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে বৈদেশিক লেনদেনে রিজার্ভের বর্তমান অবস্থান অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি এনে দিয়েছে।
রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাস ফেব্রুয়ারিতে দেশে এসেছে ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স। মার্চে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে ওঠে।
এপ্রিল ও মে মাসে এসেছে যথাক্রমে ৩ দশমিক ১৩ ও ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। জুলাইয়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এক বছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৫২৬ কোটি ডলার বা ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে এটিই সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ।
রপ্তানি আয়েও কিছুটা ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি থেকে এসেছে ৪৭২ কোটি ডলার, যা সর্বশেষ ১২ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে আগের বছরের জুলাইয়ে রপ্তানি আয় ছিল ৪৭৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকলেও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে। তৈরি পোশাক ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের প্রবৃদ্ধি কমেছে। বিপরীতে চামড়া, হোমটেক্সটাইল, পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে।
বৈদেশিক খাতে স্বস্তি ফিরলেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কাটেনি। জানুয়ারিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে দাঁড়ায়। মার্চে কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ হলেও এপ্রিলে আবার বেড়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ হয়। মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। জুনে তা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং জুলাইয়ে আরও কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। এটি আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন মূল্যস্ফীতি।
খাদ্য মূল্যস্ফীতিতেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ। জুনে তা কমে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় সাধারণ মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ। একই সময়ে গড় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ০৬ শতাংশ হয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনে বাজারদরের চাপ পুরোপুরি কমেনি। কারণ মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কমে যাওয়া। মানুষের প্রকৃত স্বস্তির জন্য আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়া জরুরি হলেও সেই জায়গায় বড় ধরনের পরিবর্তন এখনও দেখা যায়নি।
থমকে আছে বিনিয়োগ, ব্যবসায় অনিশ্চয়তা
অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা এখন বিনিয়োগ। গত ১৮০ দিনে বেসরকারি বিনিয়োগের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান তৈরি হয়নি। তবে ব্যাংক খাত থেকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের চিত্র বিনিয়োগ পরিস্থিতির দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। মে মাসে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের হিসাবে, ১৯৯৩ সালের পর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি এত কম আর দেখা যায়নি।
ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট এবং রপ্তানি চাহিদা কমে যাওয়াকে বিনিয়োগের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রেও জোরালো উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এ বিষয়ে গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও ব্যাংক খাতে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি এবং রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রবাহ থাকলেও বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ দুর্বল। ব্যাংক খাতের সংস্কার ও আস্থার সংকট, রাজস্ব আদায়ের কাঠামোগত সমস্যা, শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। এ অবস্থায় আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, ব্যাংকের তারল্যকে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে ব্যবহার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বাস্তবভিত্তিক জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আগামী ছয় মাসে এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতিই সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হবে।’
খেলাপি ঋণের বোঝায় নাজুক ব্যাংক খাত
এদিকে ব্যাংক খাতের পরিস্থিতিও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। তিন মাস পর ২০২৬ সালের মার্চে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায়। এতে মোট ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের অংশ বেড়ে হয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের ব্যাংক খাতের সংকট এখনও কাটেনি, বরং কিছু ক্ষেত্রে তা আরও গভীর হয়েছে। তবে ব্যাংক খাত সংস্কারে উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক মধ্যমেয়াদি রোডম্যাপ দিয়েছে। এতে ঋণ আদায়, ব্যাংক তদারকি, আইনি সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুসরণের বিষয় রাখা হয়েছে।
অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতেও কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতি আগের অবস্থান থেকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমান প্রবৃদ্ধির সঙ্গে এ লক্ষ্যের ব্যবধান এখনও বড়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এপ্রিলে পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। বিনিয়োগের দুর্বলতা ও আর্থিক খাতের সংকটকে দ্রুত উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে ফেরার পথে ঝুঁকি হিসেবে দেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে অর্থনীতির কিছু সূচকে প্রাণচাঞ্চল্যের আভাসও রয়েছে। সর্বশেষ জুলাইয়ের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স বা পিএমআই সূচক ৫৭ দশমিক ৮ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে প্রকাশিত এ সূচক উৎপাদন ও সেবা খাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে অর্থনীতিতে একই সঙ্গে স্বস্তি ও অস্বস্তির দুই ধরনের চিত্র ফুটে উঠেছে। রেকর্ড রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ বৃদ্ধিতে বৈদেশিক খাতে শক্তি ফিরেছে, রপ্তানি ও মূল্যস্ফীতিতেও কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু বিনিয়োগে গতি না আসা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ঐতিহাসিক নিম্নগতি এবং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। এখন এই স্থিতিশীলতাকে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বৃদ্ধিতে রূপ দেওয়াই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হলেও অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো এখনো রয়ে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের নিম্নগতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থবিরতা এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট এখনো অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। তবে বাজেট ও নীতিগত ক্ষেত্রে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা সম্প্রসারণ, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, সিঙ্গেল উইন্ডোসহ কিছু উদ্যোগ বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।’
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে সবচেয়ে বড় বাধা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। তাই স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি আমদানি করে সংকট মোকাবিলা এবং মধ্যমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও সমন্বয় বাড়িয়ে দ্রুত ও নির্ধারিত সময়ে সেবা নিশ্চিত করতে হবে। নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়; নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারলেই বিনিয়োগে গতি ফিরতে পারে।
টিএই/এমআর




