# গ্যাস সংকটে একের পর এক কারখানা বন্ধ, থমকে উৎপাদন
# বিদ্যুৎ-গ্যাসের দ্বিমুখী চাপে শিল্পে বাড়ছে ক্ষতি
# রফতানি আদেশ হারানোর শঙ্কা, ঝুঁকিতে কর্মসংস্থানও
# ডিজেলে কারখানা চালিয়ে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
# শিল্পের সংকট ছড়িয়ে পড়ছে নিত্যপণ্য ও বাজারে
# ছয় মাসের ব্যবস্থাপনায় বড় প্রশ্ন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান চায় সংশ্লিষ্টরা
গ্যাস নেই, তাই মেশিন চলছে না। আবার মেশিন না চলায় উৎপাদন নেই। আর উৎপাদন না থাকায় ঝুঁকিতে পড়েছে শ্রমিকের আয় থেকে শুরু করে রফতানি আদেশ পর্যন্ত পুরো অর্থনৈতিক চক্র। টানা কয়েক সপ্তাহের গ্যাস সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় দেশের শিল্প খাতে এখন এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
মেঘনা গ্রুপের ৫৭টি, টি কে গ্রুপের প্রায় ২০টি এবং বিএসআরএমের ১০টি প্রধান কারখানা বন্ধ হওয়ার তথ্য এসেছে। নরসিংদী-মাধবদীতে বিপুলসংখ্যক টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানা এবং দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আরও শত শত কারখানা উৎপাদন হারিয়েছে। সংকট দ্রুত না কাটলে এর প্রভাব রফতানি, কর্মসংস্থান ও বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহেও পড়তে পারে।
সরকারের প্রথম ছয় মাসের অন্যতম বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও ছয় মাস শেষে সেই খাতেই দেখা দিয়েছে সবচেয়ে তীব্র অস্থিরতা।
দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ঘাটতি। ফলে দেশের ভারী শিল্প থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা, তৈরি পোশাক থেকে নিত্যপণ্য উৎপাদন, সিএনজি পরিবহন থেকে আবাসিক গ্রাহক, প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর অভিঘাত পড়েছে।
কয়েক সপ্তাহের গ্যাস সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে দৈনিক প্রায় ১৯৩ থেকে ২০৩ কোটি ঘনফুটে। বিপরীতে চাহিদা প্রায় ৩৮০ থেকে ৩৮৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ১৮০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি। সংকটের কারণে দেশের বড় শিল্পাঞ্চলগুলোর বহু কারখানা বন্ধ, কোথাও উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকের নিচে। কোথাও শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ, রপ্তানি আদেশ, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা।
ছয় মাসের মূল্যায়নে তাই প্রশ্ন উঠছে, বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? সংকটের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনা কি সাময়িক স্বস্তি দিতে পারছে, নাকি জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে?
গ্যাস সংকটে থমকে শিল্পের চাকা
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়েছে গ্যাসনির্ভর শিল্পে। স্টিল, সিমেন্ট, কাচ, টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, পোশাক, কাগজ, খাদ্য ও নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ প্রায় সব শিল্পই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কোথাও পুরো কারখানা বন্ধ, কোথাও সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন চালানো হচ্ছে।
দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপের ৫৭টি কারখানাই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বন্ধ রয়েছে। গত ১০ আগস্ট রাত থেকে এসব কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বলে জানিয়েছেন গ্রুপটির চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল। চিনি, ভোজ্যতেল, গম, আটা, ময়দা, সুজি, সিমেন্ট, কাগজ, এলপিজি ও ফিডসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি। গ্রুপটির ৬৫ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন।
কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, কারখানা চালানোর মতো ন্যূনতম গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে। সংকট দীর্ঘ হলে সরবরাহব্যবস্থায়ও এর প্রভাব পড়তে পারে। টি কে গ্রুপের ২৮টি প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার মধ্যে প্রায় ২০টি বন্ধ রয়েছে। নাবিল গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কিছু কারখানা চালু রাখা হলেও এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
একের পর এক শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন বন্ধ
শুধু বড় শিল্পগোষ্ঠী নয়, দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকটের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় ১৭১টি কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। এতে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গাজীপুরে জেলা ও মহানগর এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাস সংকটে প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি। অর্থাৎ প্রায় ৫২৫টি কারখানা সরাসরি সংকটে পড়েছে। চালু থাকা বড় কারখানাগুলোরও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় প্রায় ৪৫০টি ডায়িং কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানা থেকে প্রয়োজনীয় কাপড় না পাওয়ায় শতাধিক পোশাক কারখানাও ঝুঁকিতে রয়েছে।
সাভার-আশুলিয়ায় বয়লার, ডায়িং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং বিভাগ স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে এ অঞ্চলে কয়েক হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে।
নরসিংদী ও মাধবদীর প্রায় ৮০ শতাংশ টেক্সটাইল, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে শিল্প প্রতিনিধিদের দাবি। এতে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা। দেশের অন্যতম বড় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমও তাদের ১০টি প্রধান কারখানা বন্ধ করেছে।
দ্বিমুখী সংকটে শিল্পখাত
গ্যাস সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। গ্যাসের অভাবে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। কোনো কোনো এলাকায় দিনে আট থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন এলাকায় যেখানে ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন, সেখানে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াটে। ফলে গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি রাজধানীতেও লোডশেডিংয়ের প্রভাব দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই দ্বিমুখী সংকট সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে শিল্পকে। কারণ একটি কারখানায় গ্যাস না থাকলে বয়লার, চুল্লি বা উৎপাদনযন্ত্র চলে না। বিদ্যুৎ না থাকলে পুরো উৎপাদন লাইনই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে একই সময়ে দুই ধরনের জ্বালানি সংকট শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতাকে আরও নিচে নামিয়ে দিচ্ছে।
পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে অর্ডার হারানোর ভয়
গ্যাস সংকটের প্রভাব তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে পড়ছে সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন ধাপে। স্পিনিং থেকে সুতা, ডাইং থেকে কাপড়, ফিনিশিং থেকে তৈরি পোশাক, প্রতিটি ধাপ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। একটি ধাপ বন্ধ হলেই পরের ধাপেও উৎপাদন ব্যাহত হয়।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, গ্যাস সংকট এখন আর শুধু পোশাকশিল্পের সমস্যা নয়, এটি পুরো শিল্প ও অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।
তার মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা। সময়মতো পণ্য উৎপাদন ও জাহাজীকরণ করতে না পারলে ক্রেতারা অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন। ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বাজারে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করতে পারে।
তিনি বলেন, শিল্পাঞ্চলে কখন গ্যাসের চাপ কমবে আর কখন সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে, সে বিষয়ে সরকারকে একটি পূর্বানুমানযোগ্য সময়সূচি দিতে হবে। এতে উদ্যোক্তারা উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবেন।
ডিজেলে কারখানা চালিয়ে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর জানিয়েছেন, দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের ডিজেল ব্যবহারের পরিমাণ ৩৯০ শতাংশ বেড়েছে। স্নোটেক্স গ্রুপের জ্বালানি ব্যয়ও বেড়েছে প্রায় ১৫০ শতাংশ।
একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর কর্মকর্তার হিসাবে, কারখানা চালাতে প্রতিদিন প্রায় ৬৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে, যার পেছনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৭০ লাখ টাকা।
এভাবে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে প্রভাব
গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু রফতানিমুখী শিল্পে সীমাবদ্ধ নেই। চিনি, ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, সুজি, চাল, ফিডসহ নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানাগুলোও উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।
এখন পর্যন্ত গুদামে থাকা পণ্য দিয়ে বাজারের চাহিদা মেটানো সম্ভব হলেও উৎপাদন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে মজুত কমে যেতে পারে। তখন বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
কুষ্টিয়ার খাজানগরে চালকলগুলোও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কোনো কোনো মিল দিনে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছে। ফলে যেখানে একটি মিলে প্রতিদিন ৯০ টন চাল উৎপাদন হতো, সেখানে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ৩০ টনে।
অর্থাৎ গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ধীরে ধীরে শিল্প থেকে বাজারে এবং বাজার থেকে ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করছে।
কর্মসংস্থানেও বাড়ছে শঙ্কা
শিল্প উৎপাদন বন্ধ হলে সবচেয়ে দ্রুত যে ধাক্কাটি আসে, সেটি পড়ে শ্রমবাজারে। কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক ছুটি, মজুরি কমানো কিংবা ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়।
ইতোমধ্যে কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের কর্মহীন হওয়ার তথ্য এসেছে। সংকট দীর্ঘ হলে শ্রমিকদের মজুরি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঋণের কিস্তি ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ নিয়েও সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্প প্রতিনিধিরা।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে কারখানা মালিকদের জন্য শ্রমিকের মজুরি, ইউটিলিটি বিল ও ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়বে। এতে শ্রমিক অসন্তোষও তৈরি হতে পারে।
সংকটের পেছনে এলএনজি সরবরাহের ধাক্কা
বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা। ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি সমস্যার পর একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়।
পরে টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও পুরো সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। এর মধ্যে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি বহনকারী জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হতো। সংকটের সময়ে তা ৩০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। ফলে দৈনিক প্রায় ৩৮০ থেকে ৩৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। এর ফলেই শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও আবাসিক খাতে একযোগে চাপ তৈরি হয়েছে।
শিল্পের সংকট এখন অর্থনীতির সংকট
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির সমস্যা। চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এরই মধ্যে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হকও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহে পূর্বপরিকল্পিত ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, প্রয়োজন হলে রেশনিং করা যেতে পারে, তবে শিল্পোদ্যোক্তাদের আগে থেকে জানাতে হবে কখন গ্যাস সরবরাহ কম থাকবে।
অন্যদিকে শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। বড় শিল্পগোষ্ঠীর মতো বিকল্প জ্বালানি কেনার সক্ষমতা তাদের নেই। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে অনেক উদ্যোক্তাকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে।
সংকট সমাধানে বিশেষজ্ঞরা কি বলছেন?
বর্তমান সংকট থেকে বের হতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি এলএনজি আমদানি ব্যবস্থাকে আরও নমনীয় ও সাশ্রয়ী করার পরামর্শও রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম জাকির হোসেন খান বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এলএনজি আমদানিকে এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা বা সরবরাহ সংকট দেশের শিল্পকে বিপর্যস্ত না করে।
তার মতে, রফতানি আয় ধরে রাখতে বিদ্যমান অবকাঠামো ও রফতানি প্রক্রিয়ার সক্ষমতাও কাজে লাগাতে হবে। কারণ জ্বালানি সংকটের কারণে রফতানি ব্যাহত হলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও চাপ পড়বে।
ছয় মাসের মূল্যায়নে বড় প্রশ্ন
সরকারের ছয় মাসের বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখন দৃশ্যমান। সংকট সামাল দিতে তাৎক্ষণিকভাবে এলএনজি আনা, গ্যাসের বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস কিংবা বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হচ্ছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ সংকটের মূল কারণ দূর করতে পারছে না।
অন্যদিকে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন এলএনজি টার্মিনাল, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণ। কিন্তু এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সময় লাগবে।
তাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বর্তমান সংকট সামলে শিল্পকে টিকিয়ে রাখা এবং একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করা।
কারণ একটি কারখানা বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রমিকের আয়, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ, ব্যাংকের ঋণ, রফতানি আদেশ, বৈদেশিক মুদ্রা, বাজারে পণ্যের সরবরাহ এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়।
ছয় মাসের শেষে তাই বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট আর শুধু একটি খাতের সমস্যা নেই। শিল্পের চাকা থেমে গেলে তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। এখন সরকারের সামনে প্রশ্ন একটাই: সাময়িকভাবে গ্যাসের সংকট সামলানো, নাকি এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ভবিষ্যতে একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই পুরো শিল্প ও অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়বে না।
এমআর/এআরএম




