- ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ে থানায় প্রায় এক লাখ মামলা
- জানুয়ারি–জুলাইয়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ৩ হাজার ৪৫১ ঘটনা
- সাত মাসে ৫৯৪ নারী, কিশোরী ও শিশু ধর্ষণের শিকার
- বিভিন্ন ঘটনায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে ১৩৪ জনকে
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। খুন, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মব সহিংসতা, ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের থানাগুলোতে ৯৯ হাজার ৯৯২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যার ঘটনায় ১ হাজার ৭৯১টি, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১১ হাজার ১৬৫টি এবং দ্রুত বিচার আইনে ৪০৮টি মামলা হয়েছে। এ সময়ে ডাকাতির ২৬৫টি, ছিনতাইয়ের ৯০৪টি, অপহরণের ৫১২টি, চুরির ৪ হাজার ৮০৮টি ও সিঁধেল চুরির ১ হাজার ৫৯১টি মামলা হয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ৩ হাজার ৪৫১টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৭৪ জন। হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন ৪০০ জন এবং নিহত হয়েছেন ৭৭ জন।
আসকের তথ্য বলছে, একই সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজিত জনতার পিটুনিতে ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ৫০ জন, চট্টগ্রামে ৩১, খুলনায় ১৭, রাজশাহীতে ১২, বরিশালে ১০, ময়মনসিংহে ৯ ও রংপুরে ৫ জন রয়েছেন।
নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক। আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫৯৪ জন নারী, কিশোরী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১০১ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের ঘটনায় ৪০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ১৩৫টি মামলা করেছেন।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও অন্তর্কোন্দল
রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। আসকের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির নেতাকর্মীদের অন্তর্কোন্দলে ৯৩৩ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে আরও প্রায় ৪০ জনের বেশি নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেসব ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বেড়েছে—
থানায় হামলা ও ভাঙচুর:
৯ জুলাই বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় চুরি ও মাদক মামলার এক আসামির মৃত্যুর গুজবকে কেন্দ্র করে থানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ছয় পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ১২ জন আহত হন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে ৮ জুলাই সন্ধ্যায় উপজেলার বাকাল ইউনিয়নের ফুল্লশ্রী গ্রামের রিয়াজ ফকির নামের এক তরুণকে চুরির মামলায় গ্রেফতার করা হয়। তাঁকে থানার হাজতে রাখা হয়। পুলিশের দাবি, সেখানে থাকা অবস্থায় রিয়াজ নিজেই মাথায় আঘাত করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাত ১১টার দিকে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে গভীর রাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পরদিন দুপুরে এলাকায় রিয়াজের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা দেখা দেয়। বিকেলে শতাধিক নারী-পুরুষ মিছিল নিয়ে থানায় এসে হামলা চালান। এতে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় কয়েকজন আহত হন। আহত এএসআই আবদুল হালিমকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় সরকারি কাজে বাধা ও হামলার অভিযোগে মামলা করে পুলিশ। পরে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়।
আদালত প্রাঙ্গণ থেকে আসামি ছিনতাইয়ের চেষ্টা:
১৫ আগস্ট ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণ থেকে সাভার মডেল থানায় দায়ের করা প্রতারণা মামলার আসামি মো. ইউসুফকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় দুজনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে পুলিশ।
গ্রেফতার দুজন হলেন মো. সোহাগ খান ও মো. নাজমুল হাসান। তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে।
ঢাকা জেলার কোর্ট ইন্সপেক্টর কামাল উদ্দীন জানান, শনিবার বিকেলে সাভার মডেল থানার একটি মামলায় ইউসুফকে আদালত চত্বরে আনা হয়। তাঁকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ দুজনকে আটক করে। এ ঘটনায় আদালতের হাজতখানার ইনচার্জ উপপরিদর্শক হুমায়ুন কবির বাদী হয়ে মামলা করেন।
প্রকাশ্য দিবালোকে বিমানবন্দর সড়কে ছিনতাই:
৯ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে ক্রাউন প্লাজার সামনে ডিএল ফিলিং স্টেশনের ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তরা গাড়ির গতিরোধ করে সহকারী ম্যানেজার মোহাম্মদ আল আমিনকে কুপিয়ে টাকার ব্যাগ নিয়ে যায়।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, আল আমিন সিএনজি অপারেটর সেলিমুজ্জামান ও কাভার্ডভ্যানের চালক মো. খোরশেদকে সঙ্গে নিয়ে উত্তরা ১ নম্বর সেক্টরের পূবালী ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাচ্ছিলেন। ক্রাউন প্লাজার সামনে পৌঁছালে তিনটি মোটরসাইকেলে আসা ৬-৭ জন দুর্বৃত্ত তাঁদের গাড়ির গতিরোধ করে। পরে আল আমিনের বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং তাঁকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়।
এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় ৬-৭ জনের বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগে মামলা করেন ডিএল ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মো. আব্দুল করিম। অস্ত্র আইনে পুলিশ বাদী হয়ে আরও একটি মামলা করে।
১৫ আগস্ট ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে র্যাব লেখা একটি কটি, পিস্তল ও গুলি এবং ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত চাপাতিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
ডিএল ফিলিং স্টেশনটির মালিক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খালাতো ভাই তাসীন আক্তার হক। তাঁর মা প্রয়াত খুরশীদ জাহান হক সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় বোন।
যা বলছে পুলিশ সদর দপ্তর ও বিশেষজ্ঞ:
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন ঢাকা মেইলকে বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত এবং বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। আইজিপি, ডিএমপি কমিশনারসহ গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোপলিটন ও রেঞ্জ ডিআইজি পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসবি, সিআইডি ও ডিবিতেও রদবদল করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে বিএনপি কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা
পুলিশকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করতে ভালো কাজের জন্য প্রণোদনা এবং পেশাগত গাফিলতির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতৎপরতা রোধে সাইবার নিরাপত্তা আইন সংস্কার এবং ডিজিটাল মনিটরিং জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক, সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সাময়িক অভিযান গুরুত্বপূর্ণ হলেও পুলিশের সক্ষমতা, তদন্তব্যবস্থা, গোয়েন্দা নজরদারি ও বিচারিক প্রক্রিয়া কার্যকর না হলে অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে পুলিশের সক্ষমতার বিষয়টি সরাসরি জড়িত। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীর একটি অংশের ওপর আস্থার সংকট, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর কমান্ড কাঠামোর ঘাটতি অপরাধ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে। তাই সমন্বিতভাবে এসব বিষয়ে কাজ করা প্রয়োজন। এতে অপরাধ কমার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তিও ফিরে আসবে।
একেএস/এআর




