শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ব্যাংকে অনাস্থা, সঞ্চয়পত্রে ফিরছেন বিনিয়োগকারীরা

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০১:২৯ পিএম

শেয়ার করুন:

ব্যাংকে অনাস্থা, সঞ্চয়পত্রে ফিরছেন বিনিয়োগকারীরা
  • টানা তিন মাসের ঋণাত্মক ধারা ভেঙে ইতিবাচক অবস্থানে সঞ্চয়পত্র
  • এপ্রিলে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়ে ২,২৬০ কোটি টাকা
  • ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ নিট বিক্রির রেকর্ড
  • ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতায় নিরাপদ বিনিয়োগে ঝুঁকছেন গ্রাহকরা
  • শেয়ারবাজারের মন্দাও বাড়িয়েছে সঞ্চয়পত্রের আকর্ষণ
  • নিরাপত্তা ও আস্থার কারণেই ফিরছে সঞ্চয়পত্রের জনপ্রিয়তা

দেশে টানা কয়েক মাস ধরে ঋণাত্মক প্রবণতায় থাকা জাতীয় সঞ্চয়পত্রের বাজারে আবারও প্রাণ ফিরেছে। ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থাহীনতা, শেয়ারবাজারের দীর্ঘস্থায়ী মন্দা এবং নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা—এই তিন কারণে আবারও সঞ্চয়পত্রমুখী হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। এরই প্রভাবে গত এপ্রিল মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৬০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম দিকে ইতিবাচক ধারা থাকলেও পরে কয়েক মাস ধরে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি ক্রমাগত কমতে থাকে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত টানা তিন মাস নিট বিক্রি ঋণাত্মক অবস্থানে ছিল। তবে এপ্রিলে এক লাফে বিক্রি বাড়ায় আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে সঞ্চয়পত্র। তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা ছিল ঋণাত্মক ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা এবং মার্চে ঋণাত্মক ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। এর আগে ডিসেম্বরে নিট বিক্রি ইতিবাচক হয়ে দাঁড়িয়েছিল ৩৮৫ কোটি টাকা। তবে নভেম্বরে তা আবার ঋণাত্মক ২৯৩ কোটি টাকায় নেমে আসে। অন্যদিকে অর্থবছরের শুরুতে জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক মাস আগে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি বড় উদ্বেগ ছিল সরকার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমিয়ে দিতে পারে। সেই আশঙ্কায় অনেকে নতুন বিনিয়োগে অপেক্ষা করছিলেন। তবে সরকার আগামী ছয় মাসের জন্য বিদ্যমান মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সেই অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে গেছে। এতে নতুন করে বিনিয়োগের আগ্রহও বেড়েছে।

govt

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকে আমানতের সুদহার কিছুটা বাড়লেও মানুষের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। গত কয়েক বছরে একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি, দুর্বল ব্যাংকের সংকট এবং আমানতকারীদের উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। একই সময়ে শেয়ারবাজারও দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশিত গতি ফিরে পায়নি। ফলে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে অনেকেই আবার সঞ্চয়পত্রকে বেছে নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে এখনো স্থিতিশীলতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আস্থার ঘাটতি রয়ে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থও আগের তুলনায় কম। যাদের কিছু সঞ্চয় করার সুযোগ রয়েছে, তারা সেই অর্থ নিরাপদ রাখতে চাইছেন। এ কারণেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ছে। সঞ্চয়পত্রে মূলধন হারানোর ঝুঁকি নেই, প্রয়োজনে সহজে নগদায়ন করা যায় এবং মুনাফার হারও তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয়। এই তিন কারণই বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের কাছে সঞ্চয়পত্রকে আবারও জনপ্রিয় করে তুলছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারের অন্যতম অভ্যন্তরীণ উৎস হলো সঞ্চয়পত্র। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন কমে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও পরে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে সরকার নতুন করে যত ঋণ নিয়েছে, তার চেয়ে ৪২৯ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করেছে। ফলে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ ঋণাত্মক অবস্থানে রয়েছে। এ কারণেই নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের জন্য জাতীয় সঞ্চয় কর্মসূচির মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ সময়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীরা আগের নির্ধারিত হারেই মুনাফা পাবেন বলে জানিয়েছে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতর। স্কিমভেদে আগামী ছয় মাস সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১.৮২ শতাংশ থেকে ১১.৯৮ শতাংশের মধ্যে থাকবে। গত ২ জুলাই এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরকারি ঋণ ও আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়েছে, জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোর জন্য চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন মেয়াদে যে সুদহার বলবৎ ছিল, আগামী জুলাই-ডিসেম্বর সময়েও তা একই হার এবং একই শর্তে অব্যাহত থাকবে।

তবে বাজেটে সঞ্চয়পত্রের কর ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখার পর সেটিকেই চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করা হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এই উৎসে কাটা কর আর চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচিত হবে না। বিনিয়োগকারীকে আয়কর রিটার্নের মাধ্যমে কর সমন্বয় করতে হবে। যদি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কর কাটা হয়ে থাকে, তাহলে আবেদন সাপেক্ষে সেই অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে। এ পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জে পড়তে পারেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। বর্তমানে ১০ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ছোট বিনিয়োগকারীর টিআইএন নেই। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে অতিরিক্ত কাটা কর ফেরত পেতে তাদের টিআইএন নিতে হবে, আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

নিয়মিত করদাতাদের জন্য নতুন ব্যবস্থা তুলনামূলক সুবিধাজনক হতে পারে। তারা রিটার্নে ব্যাংক হিসাব উল্লেখ করে অতিরিক্ত কাটা কর ফেরতের আবেদন করতে পারবেন। যাচাই-বাছাই শেষে ১২০ দিনের মধ্যে সেই অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেওয়ার কথা রয়েছে।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি অব্যাহত রাখার জন্য সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের সঞ্চয়পত্র নিয়ে নতুন নির্দেশনার চিঠি দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছে না—কয়েক দিন ধরেই এমন অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি বিভিন্ন পর্যায়ের গ্রাহকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে যে তফসিলি ব্যাংকগুলো সঞ্চয়পত্র বিক্রির তালিকাভুক্তিতে থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকদের নানা প্রক্রিয়ায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে। সঞ্চয়পত্র রুলস, ১৯৭৭–এর অনুচ্ছেদ নম্বর–৩–এর নির্দেশনা মোতাবেক সঞ্চয়পত্রের ইস্যু অফিস হিসেবে বিনিয়োগকারীদের কাছে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান এবং সেবার মান নিশ্চিত করতে শাখাগুলোর সঞ্চয়পত্র–সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়মিত তদারকিতে রাখার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হলো। গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক অভিযোগ গ্রহণের প্রক্রিয়া শাখাগুলোর দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের জন্য ও অভিযোগগুলোর বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের পরামর্শ দেওয়া হলো।

অন্যদিকে আস্থাহীনতাসহ বিভিন্ন কারণে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত মুদ্রানীতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল শেষে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। মে মাসে তা বেড়ে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ, এক মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা, যা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে রিজার্ভ মানি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাপানো টাকার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এপ্রিল শেষে রিজার্ভ মানি ছিল ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪০৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। মে মাস শেষে তা বেড়ে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪২ কোটি ১০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে এক মাসে রিজার্ভ মানি বেড়েছে ৫০ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা।

টিএই/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর