সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

সরকারের ১৮০ দিন

উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ, বিদেশি ঋণ কমায় বাড়ছে দুঃশ্চিন্তা

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৩ এএম

শেয়ার করুন:

উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ, বিদেশি ঋণ কমায় বাড়ছে দুঃশ্চিন্তা
ছবি: এআই

** ৬১ হাজার কোটি টাকার ১৭ প্রকল্প অনুমোদন 
** সবচেয়ে বড় প্রকল্প: পদ্মা ব্যারেজ ৩৪,৪৯৭ কোটি টাকা
** কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড চালুর উদ্যোগ
** মোট উন্নয়ন ব্যয়ের ৫৬ শতাংশই এক প্রকল্পে 
** অর্থনীতিবিদদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন

বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ১৮০ দিনে উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সংস্কারকে সামনে রেখে একাধিক নীতিগত উদ্যোগ নিয়েছে। এই সময়ে ছয়টি একনেক সভায় ১৭টি নতুন প্রকল্পে ৬১ হাজার ৭৭ কোটি টাকার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল পুনঃখনন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, এআইভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত নগরায়নের মতো কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে।

তবে এই ছয় মাসের হিসাব কেবল অর্জনের নয়। একদিকে পদ্মা ব্যারেজের মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প সরকারকে উন্নয়নের বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে একটি প্রকল্পেই অর্ধেকের বেশি বরাদ্দ, বিদেশি ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়া, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানমুখী বড় প্রকল্পের ঘাটতি এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নও সামনে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রথম ১৮০ মাসের চেয়ে বড় বিষয় হলো আগামী কয়েক বছরে ঘোষিত প্রকল্পগুলো কতটা সময়মতো ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিই সরকারের প্রকৃত সফলতার মানদণ্ড হবে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম ১৮০ দিনে অনুষ্ঠিত ছয়টি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মোট ১৭টি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ হাজার ৭৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৫৪ হাজার ৭৫২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান ৬ হাজার ১৮০ কোটি ৭২ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১৪৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের উন্নয়ন কার্যক্রমের চিত্রে দেখা যায়, অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মূল গুরুত্ব পড়েছে পানি সম্পদ, সড়ক ও সেতু, স্বাস্থ্যসেবা, রেল যোগাযোগ, গ্রামীণ অবকাঠামো, শিল্পায়ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর। অনুমোদিত ১৭টি প্রকল্পের সবকটিই নতুন প্রকল্প, যা আগামী কয়েক বছরে দেশের বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রথম ছয় মাসে উন্নয়নের রূপরেখা

নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের একনেক সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাৎক্ষণিক ছোট প্রকল্পের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নকাল ২০২৮ থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে এসব প্রকল্প আগামী এক দশকের উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।

মোট ১৭টি প্রকল্পের মধ্যে পানি সম্পদ খাতেই সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। এরপর রয়েছে সড়ক ও মহাসড়ক, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, রেলওয়ে এবং শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন।

এক প্রকল্পেই অর্ধেকের বেশি বরাদ্দ

অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়)। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা মোট অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় ৫৬ শতাংশ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পদ্মা অববাহিকার পানির সর্বোত্তম ব্যবহার, শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নের অনুমোদনকে দেশের অন্যতম বড় পানি অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শিল্পায়নে ৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ

দ্বিতীয় বৃহৎ প্রকল্প হলো চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। প্রকল্পটির আওতায় শিল্পাঞ্চলে সড়ক, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ এবং অন্যান্য মৌলিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

পানি সম্পদ খাতে একাধিক বড় উদ্যোগ

পানি সম্পদ খাতে পদ্মা ব্যারেজ ছাড়াও আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। ফেনী জেলার মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প পুনর্বাসনে ব্যয় হবে ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও বন্যা সমস্যার সমাধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।

এছাড়া করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়নের জন্য দুটি পৃথক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একটি প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৯৪ কোটি ৩৫ লাখ এবং অন্যটির ব্যয় ১ হাজার ১২২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে শহর ও জেলা দুই স্তরেই জোর

স্বাস্থ্য খাতে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো জেলা শহরের বিদ্যমান মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলোকে ৩০ শয্যাবিশিষ্ট কেন্দ্রে উন্নীত ও পুনর্নির্মাণ প্রকল্প। এতে ব্যয় হবে ১ হাজার ৩২৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। একই সঙ্গে শহুরে জনগোষ্ঠীর জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে ১ হাজার ১৫৭ কোটি ৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। 

রাজধানীর নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ঢাকা শহরের জরুরি পানি সরবরাহ প্রকল্পেও ৮৪০ কোটি ৮৫ লাখ টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত নগরায়ণের ফলে বাড়তে থাকা পানির চাহিদা পূরণে এ প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সড়ক, সেতু ও রেলে ৯ হাজার কোটির বেশি ব্যয়

যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে তিনটি বড় প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ময়মনসিংহ বিভাগে পাঁচটি জলবায়ু সহনশীল সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৬৭৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও দুর্যোগ সহনশীল সেতু নির্মাণ করা হবে।

রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার সীমান্ত সড়ক নির্মাণের দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৬৬৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। দুর্গম পার্বত্য এলাকায় সারা বছর যোগাযোগ নিশ্চিত করা, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করাই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনে ব্যয় হবে ২ হাজার ২৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। পুরোনো রেললাইন সংস্কার, নিরাপদ ট্রেন চলাচল এবং পণ্য পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে।

গ্রামীণ উন্নয়নে এলজিইডির চার প্রকল্প

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর ও বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় চারটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এতে সড়ক, সেতু, বাজার ও স্থানীয় অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হবে।

পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্পে ২ হাজার ৮২ কোটি ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে গ্রামীণ সড়কের মানোন্নয়ন হবে, অন্যদিকে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অংশীদারিত্বমূলক পল্লী উন্নয়নের চতুর্থ পর্যায়ে ৫৯৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ব্যয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়বর্ধক কার্যক্রম, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

সচিবালয়ে নতুন ভবন, গ্যাস অনুসন্ধানেও অনুমোদন

প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ সচিবালয়ে ২১ তলাবিশিষ্ট নতুন অফিস ভবন নির্মাণে ৬৪৯ কোটি ২৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। 

অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে বাপেক্সের আওতায় একটি মূল্যায়ন কূপ এবং দুটি অনুসন্ধান কূপ খননের জন্য ৭২৯ কোটি ২২ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। দেশীয় গ্যাসের নতুন মজুত অনুসন্ধানই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

সরকারি অর্থায়নের আধিপত্য

অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই সরকারি তহবিল থেকে আসবে। সরকারি অর্থায়নের পরিমাণ ৫৪ হাজার ৭৫২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ।

অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের অংশ ৬ হাজার ১৮০ কোটি ৭২ লাখ টাকা। মূলত স্বাস্থ্য, শিল্পাঞ্চল ও জলবায়ু সহনশীল সেতু নির্মাণ প্রকল্পে বিদেশি অর্থায়নের অংশ রাখা হয়েছে। সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের ১৪৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যবহৃত হবে জ্বালানি অনুসন্ধান প্রকল্পে।

সফলতা

১. বৃহৎ অবকাঠামোতে সাহসী বিনিয়োগ

সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প অনুমোদনকে। পাশাপাশি ফেনীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, করতোয়া নদী উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল সেতু নির্মাণ প্রকল্প পানি নিরাপত্তা ও কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

২. সামাজিক সুরক্ষার নতুন উদ্যোগ

নারীপ্রধান নিম্ন আয়ের পরিবারকে মাসে ২,৫০০ টাকা দেওয়ার ফ্যামিলি কার্ড এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালুর পরিকল্পনা সরকারের সবচেয়ে আলোচিত জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলোর একটি। এর লক্ষ্য সরাসরি দরিদ্র ও কৃষক পরিবারের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।

৩. গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্ব

পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ, বৃহত্তর দিনাজপুর সমন্বিত উন্নয়ন, খাল পুনঃখনন এবং অংশীদারিত্বমূলক পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ অবকাঠামো ও কৃষিপণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প স্থানীয় কর্মসংস্থানও বাড়াতে পারে।

৪. স্বাস্থ্য ও জনসেবায় বিনিয়োগ

জেলা শহরের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রকে ৩০ শয্যায় উন্নীত করা, শহুরে সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং ঢাকা শহরের জরুরি পানি সরবরাহ প্রকল্প জনসেবামুখী বিনিয়োগ হিসেবে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।

৫. প্রযুক্তিগত সংস্কার

নতুন প্রকল্প অনুমোদনের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, এআইভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল পরীক্ষামূলক চালু, বাস রুট রেশনালাইজেশন এবং পরিকল্পিত নগরায়নের উদ্যোগ প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ব্যর্থতা 

১. একটি প্রকল্পেই অতিরিক্ত বরাদ্দ

মোট ৬১ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা একাই পদ্মা ব্যারেজে বরাদ্দ হয়েছে। অর্থাৎ মোট উন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় ৫৬ শতাংশ একটি প্রকল্পে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২. কর্মসংস্থানে সরাসরি উদ্যোগের ঘাটতি

ঘোষিত ১৭টি প্রকল্পের অধিকাংশই অবকাঠামোনির্ভর। যুব কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, দক্ষতা সৃষ্টি বা প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন শিল্পে সরাসরি কর্মসংস্থানের জন্য বড় কোনো জাতীয় প্রকল্প এই তালিকায় নেই।

৩. শিক্ষা খাতে বড় উন্নয়ন প্রকল্পের অভাব

কারিগরি শিক্ষায় ট্যাবলেট বিতরণ ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের পরিকল্পনা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, বিদ্যালয় অবকাঠামো কিংবা উচ্চশিক্ষা উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হয়নি।

৪. পরিবহন সংস্কারের ধীরগতি

এআই ট্রাফিক সিগন্যাল, কমিউটার ট্রেন বৃদ্ধি এবং বাস রুট রেশনালাইজেশনের ঘোষণা থাকলেও এসব উদ্যোগের অনেকটাই এখনো পরিকল্পনা বা প্রাথমিক বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে। ফলে নগর যানজট কমানোর দৃশ্যমান ফল এখনো সীমিত।

৫. বিদেশি ঋণের প্রবাহ কমেছে, বাড়ছে ঋণ পরিশোধের চাপ

বর্তমান অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বিদেশি ঋণ ছাড় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে বাংলাদেশ মাত্র ৪.২৩৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশি ঋণ ও অনুদান পেয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ কম। একই সময়ে নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতিও ৩৪ শতাংশ কমে ২.৮০৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। 

একই সময়ে উল্টো চিত্র দেখা গেছে ঋণ পরিশোধে। জুলাই-এপ্রিল সময়ে বাংলাদেশকে ৩.৮০২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮.৪ শতাংশ বেশি। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পে নতুন অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বাজেটের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। 

প্রথম ১৮০ দিনের ছয়টি একনেক সভায় অনুমোদিত ১৭টি প্রকল্পের সামগ্রিক চিত্র বলছে, সরকার দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো, পানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন, গ্রামীণ যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও জ্বালানি অনুসন্ধানকে উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে বেছে নিয়েছে। ৬১ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প প্যাকেজ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার, গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শিল্প বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।

তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, রেলপথ সম্প্রসারণে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ইশতেহারে ঘোষিত আন্তঃনগর ও কমিউটার ট্রেন সেবা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা-গোপালগঞ্জ-ঢাকা রুটে ‘অভিযাত্রিক কমিউটার’ নামে নতুন এক জোড়া ট্রেন চালু করা হয়েছে।

ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, এই সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় কী ধরনের কাজ করেছে, তা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের সমন্বয়ে একটি কমিটি রয়েছে।  সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড ও অগ্রগতি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ১৮০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নিজেই জনগণের সামনে সরকারের অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়গুলো তুলে ধরবেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড় বিলম্বিত হওয়ায় বিদেশি ঋণের প্রবাহ কমেছে। এর ফলে বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। 

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরি ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রথম ছয় মাস কোনো সরকারের চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য দীর্ঘ সময় নয়। এই সময়ে সরকারকে জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতির মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। তারপরও সরকার সংকট উত্তরণে উদ্যোগ নিয়েছে এবং কিছুটা সফলতা অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, আগের সরকারের সময় নেওয়া চলমান বড় প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করাই সরকারের সঠিক কৌশল। কারণ কোনো প্রকল্প নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের বাইরে চলে গেলে এর ব্যয় বেড়ে যায় এবং জনগণ প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো জরুরি। নতুন প্রকল্প গ্রহণেরও যৌক্তিকতা রয়েছে। সরকারের রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য কৃষক কার্ড, সামাজিক সুরক্ষা এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের মতো কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে একই সঙ্গে চলমান প্রকল্পগুলোকেও অগ্রাধিকার দিয়ে শেষ করতে হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের মান নিয়ে তিনি বলেন, সফলতা শুধু অর্থ বরাদ্দে নয়, বরং বাস্তবায়নের গতি ও ব্যয়ের গুণগত মানে। দুর্নীতি ও অর্থের অপচয় রোধ করা না গেলে কোনো প্রকল্প থেকেই প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, দেশের সংকট বহু বছরের এবং তা প্রায় সব খাতে বিস্তৃত। তাই ছয় মাসে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আগামী দিনে সরকারের প্রচেষ্টাকে আরও গতিশীল, দৃঢ় এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসতে পারে।

এএইচ/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর