সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

তারেক রহমান সরকারের ছয় মাস: আশার শুরু, এখন পরীক্ষার সময়

শামসুল আলম
প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩২ এএম

শেয়ার করুন:

তারেক রহমান সরকারের ছয় মাস: আশার শুরু, এখন পরীক্ষার সময়

১. নির্বাহী সারাংশ 

বাংলাদেশে নতুন সরকার এলে মানুষের আশা একটু বেড়ে যায়। সঙ্গে বাড়ে চায়ের দোকানের আলোচনা। কেউ বলেন, এবার দেশ বদলে যাবে। কেউ বলেন, আগেও তো সরকার এসেছে, কী হয়েছে? দুটো কথার মধ্যেই কিছু সত্য আছে।

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ২৯৯টি নির্বাচিত আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে বিজয়ী হয়ে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। দীর্ঘ ফ্যাসিজমের করাল গ্রাস, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান, একটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এবং বহু বছরের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর এই সরকার এসেছে একটি বড় জনম্যান্ডেট নিয়ে। তাই সরকারের প্রথম ছয় মাসকে শুধু ভালো বা খারাপ বলে বিচার করলে ভুল হবে। দেখতে হবেরাষ্ট্র কোন দিকে হাঁটছে, মানুষ কতটা স্বস্তি পেয়েছে এবং আগামী দিনের জন্য ভিত কতটা শক্ত হচ্ছে।

ছয় মাস খুব বেশি সময় নয়। একটি শিশুর হাঁটতে শিখতেও কখনো কখনো তার চেয়ে বেশি সময় লাগে। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ছয় মাস একেবারে কম সময়ও নয়। এই সময়ে সরকার কোন দিকে হাঁটছে, কোন কাজকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, প্রশাসন কীভাবে চলছে এবং মানুষের জীবন কতটুকু বদলাচ্ছেতার একটা ছবি পাওয়া যায়।

প্রথম দুই মাসে সরকার ৬০টি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের কথা জানিয়েছিল। প্রথম ১০০ দিনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকাশিত ই-বুকে প্রায় ২০০টি উদ্যোগ ও প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার কথা বলা হয়। ছয় মাস পূর্তিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের হিসাবেও পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, জ্বালানি, পরিবহন ও পররাষ্ট্রনীতিতে বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা উঠে এসেছে।

এই লেখার উদ্দেশ্য সরকারের প্রশংসা করা নয়। আবার সমালোচনা করার জন্য সমালোচনাও নয়। একটি নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসকে যতটা সম্ভব নিরপেক্ষভাবে দেখা। সরকার কী করেছে, কী শুরু করেছে, কী এখনো কাগজে আছে এবং জনগণ এখন কী চাইছেসেই হিসাব।

এগুলো ছোট কথা নয়। তবে সরকারি উদ্যোগের সংখ্যা দিয়ে সরকারকে ভালো বলা যায় না। একশটি কাজের মধ্যে একশটিই যদি কাগজে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের কোনো লাভ নেই। আবার দশটি কাজ যদি সত্যি মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়, তার মূল্য অনেক বেশি।

এই জায়গাটিই তারেক রহমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

২. অর্থনৈতিক খাত: মূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্যিক সংস্কার ও পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার

অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

ক. মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার শৃঙ্খলা

  • বাজার তদারকি ও তদারকি কেন্দ্র: নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য সহনীয় রাখতে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা পুনর্গঠন ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা হয়েছে।
  • ভোক্তা সুরক্ষানীতি ও খাদ্য তহবিল: ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় নতুন 'ভোক্তা সুরক্ষা নীতিমালা' প্রণয়ন এবং ভবিষ্যতের খাদ্য সংকট মোকাবিলার জন্য একটি বিশেষ 'খাদ্য নিরাপত্তা তহবিল' গঠন করা হয়েছে।

খ. পাচারকৃত সম্পদ ও অর্থ উদ্ধার

  • সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ: আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে 'এস আলম গ্রুপ'-এর ৪,২৬৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
  • আন্তর্জাতিক চুক্তি ও ট্র্যাকিং: বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে বিশ্বের ১০টি দেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় অর্থ প্রত্যাবর্তন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সহায়তায় দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের ট্র্যাকিং অভিযান ত্বরান্বিত করা হয়েছে।

গ. রপ্তানি বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ সুবিধা

  • দীর্ঘমেয়াদী রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা: ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
  • ব্যবসায়িক নিয়ম সহজীকরণ (Ease of Doing Business): বাণিজ্য প্রসারে 'ভিয়েতনামী মডেল' অনুসরণ করে রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ব্যবসায়িক অনুমোদনের প্রক্রিয়াকে মাত্র ১৪ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।
  • অবকাঠামোগত ২৪/৭ সেবা: চট্টগ্রাম বন্দর ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন সেবা চালু রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার স্থাপনসহ বিনিয়োগকারীদের জন্য ই-ভিসা প্রদান এবং ফি মওকুফ সুবিধা চালু করা হয়েছে। বর্তমানে ২৫টি প্রধান মার্কিন কোম্পানি বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ অন্বেষণ করছে।

বিরোধী দল ও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া: বিরোধী দলসমূহের মতে, ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত অবাস্তব। সাধারণ মানুষের মূল সমস্যাযেমন মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপ এবং বেকারত্ব সমস্যা সমাধানের সুনির্দিষ্ট কৌশল এখনো অনুপস্থিত।

৩. শক্তি ও জ্বালানি খাত: সংকট, রূপান্তর ও সুশাসন

জ্বালানি খাতে পূর্ববর্তী সরকারের অব্যবস্থাপনা কাটানো এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ক. এলএনজি ও গ্যাস সরবরাহ পরিকল্পনা

  • শিল্পের উন্নয়ন: শিল্প খাতের চাহিদা মেটাতে ৩য় ভাসমান এলএনজি (LNG) টার্মিনাল বরাদ্দের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত FSRU (Floating Storage Regasification Unit) পুনর্নির্মাণ ও পুনরায় চালু করার কার্যক্রম চলছে।
  • আন্তর্জাতিক গ্যাস আমদানির উদ্যোগ: আঞ্চলিক সমন্বয়ের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং মালয়েশিয়ার সাথে সম্ভাব্য গ্যাস সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।

খ. নবায়নযোগ্য শক্তি ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ

  • সৌরবিদ্যুৎ ও ইনভার্টার: দেশের সকল সরকারি ভবনে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে সৌর ইনভার্টার উৎপাদন এবং লিথিয়াম ব্যাটারি শিল্প প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রীয় সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
  • সবুজ বিদ্যুৎ প্রযুক্তি: জলবায়ু সহনশীল আর্থিক মডেল উদ্ভাবনের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে।

গ. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিদ্যমান সংকট (বাস্তবচিত্র)

  • চট্টগ্রামের ভয়াবহ গ্যাস সংকট: সরবরাহ লাইনে কারিগরি সমস্যার কারণে চট্টগ্রামে ৪৫% গ্যাস সরবরাহ হ্রাস পেয়েছে, যার সরাসরি শিকার হয়েছেন প্রায় ৬ লক্ষ আবাসিক ও শিল্প ভোক্তা
  • বিদ্যুৎ ঘাটতি: শিল্প উৎপাদন ও গৃহস্থালি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার এখনো হিমশিম খাচ্ছে।

৪. সামাজিক কল্যাণ, জনসেবা ও কাঠামোগত সংস্কার

জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বহুমুখী প্রান্তিক কল্যাণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।

ক. সামাজিক নিরাপত্তা ও পরিবার সুরক্ষা

  • পরিবার ও কৃষক কার্ড বিতরণ: প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সুরক্ষায় ইতোমধ্যে ৫৩,০৯৬টি পরিবারকে 'পরিবার কার্ড' এবং ২০,৭৪৮টি পরিবারকে 'কৃষক কার্ড' প্রদান করা হয়েছে। এর অধীনে বিনামূল্যে সার, বীজ, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি এবং সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
  • ভর্তুকিমূল্যে খাদ্য সহায়তা: মোট ৫.৫ মিলিয়ন (৫৫ লাখ) নিম্নআয়ের পরিবারকে প্রতি কেজি মাত্র ১৫ টাকা দরে সাবসিডিযুক্ত চাল সরবরাহ করা হচ্ছে।

খ. স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের সংস্কার

  • স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগ ও অবকাঠামো: স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে ১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী এবং ৫,০০০ নতুন চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (ICU) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
  • শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা: বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে দলীয়করণ দূর করে পূর্ণাঙ্গ মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি কমানোর পাশাপাশি আধুনিক ডিজিটাল পাঠ্যক্রম প্রবর্তন করা হয়েছে।

৫. পরিবেশ, অবকাঠামো ও পরিবহন উন্নয়ন

দেশের টেকসই পরিবেশ সুরক্ষা ও যোগাযোগের আধুনিকায়নে সরকার নতুন কিছু বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

  • বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সুরক্ষা: দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের সকল ইপিজেড (EPZ) এলাকায় ১,২৫,০০০টি গাছ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
  • জলাশয় ও খাল খনন: ড্রেজিং এবং পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করতে দেশব্যাপী ২০,০০০ কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচির সূচনা হয়েছে। এর আওতায় ঢাকা শহরের মৃতপ্রায় খাল ও জলপথ পুনরুজ্জীবন প্রকল্প এবং 'পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প' শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
  • পরিবহন অবকাঠামো: রাজধানী ঢাকার ওপর চাপ কমাতে ঢাকার বাইরে ৪টি নতুন আধুনিক উপশহর (Satellite Town) গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, দ্রুত বাস পরিবহন (BRT) সংস্কার এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত ৩য় টার্মিনাল দ্রুত চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

৬. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি ও জাতীয় অবস্থান

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গৃহীত কূটনৈতিক উদ্যোগসমূহ:

  • দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত সহযোগিতা: ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব, চীনের সাথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন প্রযুক্তিগত সমঝোতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে শ্রমবাজার ও জ্বালানি সংক্রান্ত চুক্তি জোরদার করা হয়েছে।
  • সার্বভৌমত্ব ও স্বকীয়তা: জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ঐতিহাসিক মূল্যবোধের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশী পাসপোর্টে "ইসরাইল ব্যতীত" (Except Israel) শর্তটি পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

৭. প্রধান সমস্যা, জনদাবি ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ

খাত

মূল চ্যালেঞ্জ/সমস্যা

জনগণের মূল দাবি

বিরোধী দলের সমালোচনা ও অবস্থান

শক্তি ও জ্বালানি

চট্টগ্রামে ৪৫% গ্যাস ঘাটতি; ৬ লাখের বেশি ভোক্তা ভোগান্তিতে

দ্রুততম সময়ে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা

সরকার সংকট নিরসনে ব্যর্থ; কেবল আশ্বাস ও আশ্বাসবাণী দিচ্ছে

অর্থনীতি

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব

নিত্যপণ্যের দাম কমানো ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি

নীতিগুলো কেবল বড় ধনকুবেরদের স্বার্থ রক্ষা করছে

প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বিচারব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব

নিরপেক্ষ, দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ প্রশাসন গঠন

সরকার প্রধান বিরোধী দলগুলোর প্রতি প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে

সামাজিক নিরাপত্তা

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক মন্দা

সকল ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রদায়ের সমঅধিকার নিশ্চিত করা

সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তায় সরকারের দৃশ্যমান ঘাটতি রয়েছে

শুরুটা ভালো, কিন্তু এখন ফল দেখানোর সময়

প্রথম ছয় মাসে সরকারের একটি ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য চোখে পড়েছে—সরকার অনেক কথা বলার বদলে কিছু কাজ দ্রুত শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছেন। মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কাজের ওপর নজরদারি, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা এবং মাঠপর্যায়ে সমস্যা জানতে চাওয়ার প্রবণতা প্রশাসনের মধ্যে কিছুটা গতি এনেছে।

সরকারি মহল বলছে, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী ও এমপিদের কর্মদক্ষতা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি, দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনে অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়—এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করছেন। কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে সতর্ক করার খবরও এসেছে। এটি ভালো লক্ষণ। কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রকল্পের অভাব নয়; সমস্যা হলো প্রকল্প বাস্তবায়ন, জবাবদিহি এবং টাকা খরচের মান।

আগের সরকারের সময়ে আমরা দেখেছি—একটি রাস্তা করতে যত সময় লাগে, অনেক দেশে তত সময়ে একটি শহর তৈরি হয়। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ে, খরচ বাড়ে, কিন্তু কাজের মান অনেক সময় বাড়ে না। নতুন সরকার এই সংস্কৃতি বদলাতে চাইছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব কমানো, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে নতুন নীতি, নির্মাণ ব্যয়ের হার পুনর্বিবেচনা এবং ডিজিটাল মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন একটাই—এই উদ্যোগ কতটা টেকসই হয়।

অর্থনীতি: একটু আলো দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ঘর এখনো গরম

অর্থনীতির ক্ষেত্রে নতুন সরকার সবচেয়ে কঠিন উত্তরাধিকার পেয়েছে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের পকেট কাটছে। জুন ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯.১৬ শতাংশ হয়েছে, মে মাসে যা ছিল ৯.৪২ শতাংশ। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে ৯.১৬ আর ৯.৪২-এর পার্থক্য খুব বড় নয়। বাজারে চাল, ডাল, মাছ, সবজি, ওষুধ, বাড়িভাড়া—সবকিছুর দাম যখন বেশি, তখন পরিসংখ্যানের সামান্য পতনকে মানুষ খুব বেশি স্বস্তি হিসেবে নেয় না।

সরকারের ২০২৬-২৭ বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬.৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, স্থানীয় সরকার, গ্রামীণ উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

লক্ষ্য ভালো। কিন্তু বাজেটের আসল পরীক্ষা সংসদে নয়, বাজারে।

একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি বলেন, “মূল্যস্ফীতি কমেছে”, আর একজন রিকশাচালক বলেন, “বাজারে খরচ কমেনি”—তাহলে দুজনের মধ্যে কাউকে মিথ্যা বলা যাবে না। পরিসংখ্যান তার জায়গায় সত্য, মানুষের অভিজ্ঞতাও তার জায়গায় সত্য।

এখানে সরকারের আরও কঠোর হতে হবে। বাজারে সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, মধ্যস্বত্বভোগীর অস্বাভাবিক মুনাফা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ভাঙতে না পারলে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ জেতা কঠিন।

তবে অর্থনীতিতে কয়েকটি ভালো খবরও আছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭.৩ শতাংশ বেশি। জুলাইয়ের প্রথম ২৭ দিনেই রেমিট্যান্স এসেছে ২.৫২ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.২ শতাংশ বেশি।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। জুনে মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৭.৫৮ বিলিয়ন ডলার এবং আইএমএফেরBPM6 হিসাবে ৩২.৯৩ বিলিয়ন ডলার।

৩০ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বা রেপো রেট (Repo Rate) ১০ শতাংশ থেকে ৯.৫০ শতাংশে নামিয়েছে। উদ্দেশ্য—বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো।

অর্থাৎ অর্থনীতির শরীরে জ্বর এখনো আছে, কিন্তু থার্মোমিটারে আগের চেয়ে একটু কম তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে।

জ্বালানি: সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা

বিদ্যুৎ ও গ্যাস বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ। শিল্পে গ্যাস নেই মানে কারখানায় উৎপাদন নেই। উৎপাদন নেই মানে কর্মসংস্থান নেই। কর্মসংস্থান নেই মানে পরিবারের আয় কমে যায়।

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সংকট আবার প্রকট হয়েছে। আগস্টের মাঝামাঝি গ্যাসের ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।

চট্টগ্রামের গ্যাস সংকটের মতো সমস্যা সরকারকে খুব দ্রুত সমাধান করতে হবে। কারণ এখানে শুধু একজন গৃহিণীর রান্নার সমস্যা নেই; শিল্প, হাসপাতাল, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থান—সবকিছু জড়িত।

এই খাতে সরকারের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা। কত গ্যাস দেশীয় উৎস থেকে আসবে, কত LNG আমদানি হবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ কত হবে, শিল্পকে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—সবকিছুর একটি প্রকাশ্য রোডম্যাপ দরকার।

শুধু নতুন টার্মিনাল নয়, পুরোনো অব্যবহৃত অবকাঠামোও কাজে লাগাতে হবে। এসপিএম (Single Point Mooring), রিফাইনারি, গ্যাস সঞ্চালনব্যবস্থাকোথায় কত টাকা খরচ হয়েছে এবং তার বিপরীতে কত সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, জনগণকে তা জানাতে হবে।

পরিবার কার্ড: ভালো ধারণা, কঠিন বাস্তবায়ন

পরিবার কার্ড সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্মসূচিগুলোর একটি হতে পারে। কারণ এটি যদি সঠিকভাবে করা যায়, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগী কমবে এবং সরাসরি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ।

কার্ড যদি দলীয় পরিচয়ে দেওয়া হয়, তাহলে এটি কল্যাণ কর্মসূচি থাকবে না; রাজনৈতিক কর্মসূচি হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও পরিবার কার্ডের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ডাটাবেস এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।

সরকারের উচিত পরিবার কার্ডের তথ্য প্রকাশযোগ্য করা—অবশ্যই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে। কত পরিবার কার্ড পেয়েছে, কোন জেলায় কত, নারী কতজন, প্রকৃত দরিদ্র কতজন—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার।

কৃষক কার্ডও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষককে শুধু সার দিলে হবে না। বীজ, সেচ, যন্ত্র, ঋণ, বাজার এবং ন্যায্যমূল্য—সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর, লাভজনক ও টেকসই করার কথা বলেছেন।

খাল, নদী, বৃক্ষ—এগুলোও অর্থনীতি

সরকার পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের কর্মসূচি নিয়েছে। জুন পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাল পুনঃখননের কাজ এগিয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। খাল খনন মানেই উন্নয়ন নয়। খাল খননের পর যদি আবার দখল হয়ে যায়, তাহলে কোটি টাকা খরচ করে শুধু মাটি সরানো হবে।

ঢাকার খাল, নদী ও জলাধারকে রক্ষা করতে হলে একই সঙ্গে দখলদার উচ্ছেদ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নগর পরিকল্পনা করতে হবে।

গাছ লাগানোর ক্ষেত্রেও একই কথা। ছবি তুলে গাছ লাগানো সহজ। তিন বছর পরে সেই গাছ বেঁচে আছে কি না, সেটিই আসল পরীক্ষা।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা: এখানেই সরকারের আসল মানবিক পরীক্ষা

প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে চিকিৎসাসেবার মান, প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসা-সুবিধা এবং চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলতার ওপর জোর দিয়েছেন। ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণ ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করার নির্দেশও দিয়েছেন।

কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে আমাদের দরকার আরও মৌলিক পরিবর্তন।

সরকারি হাসপাতালের সামনে দালাল থাকবে না। ওষুধের জন্য রোগীকে বাইরে ছুটতে হবে না। ডাক্তার কখন হাসপাতালে আসেন—এই প্রশ্ন থাকবে না। উপজেলা হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা পাওয়া যাবে। একজন দরিদ্র মানুষ যেন চিকিৎসা নিতে গিয়ে জমি বিক্রি না করেন।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা। নতুন ডিজিটাল পাঠ্যক্রমের চেয়ে জরুরি হলো ভালো শিক্ষক, ভালো বিদ্যালয়, নিয়মিত ক্লাস এবং পরীক্ষার মান।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে এমন একটি স্কুল যেখানে একজন দরিদ্র কৃষকের সন্তান এবং একজন সচিবের সন্তান একই মানের শিক্ষা পায়।

প্রশাসন: পুরোনো অভ্যাস বদলানো সবচেয়ে কঠিন

সরকার বদলানো সহজ। প্রশাসনের সংস্কৃতি বদলানো কঠিন।

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে বহু ভালো কর্মকর্তা আছেন। কিন্তু একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বদলি-পদায়ন, তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অদৃশ্য নেটওয়ার্কের অভিযোগ আছে। নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—যোগ্য মানুষকে যোগ্য জায়গায় বসানো যায় কি না।

প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে মন্ত্রী, এমপি ও কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করেন, তাহলে এটি একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হতে পারে।

কিন্তু এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। পরিষ্কার করার পরে “আমাদের লোক” এবং “তোমাদের লোক”—এই পুরোনো হিসাব যেন আবার ফিরে না আসে। আগের সরকারের একটি বড় ব্যর্থতা ছিল প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা। নতুন সরকার যদি সেই একই ভুল করে, শুধু দলের নাম বদলাবে; রাষ্ট্র বদলাবে না।

দুর্নীতি দমন: সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা সহজ। দুর্নীতির রাস্তা বন্ধ করা কঠিন।

সরকারের প্রথম ছয় মাসে আর্থিক খাত, পাচারকৃত সম্পদ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ উদ্ধারের বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ও উপযুক্ত কমিশন গঠন।

কারও সম্পদ জব্দ হলেই তিনি দুর্নীতিবাজ হয়ে যান না। আবার বড় ক্ষমতাবান কেউ আইনের বাইরে থাকলেও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা থাকে না।

তাই দুর্নীতি দমন করতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, আদালতের মাধ্যমে, রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথা বললেও জবাবদিহি ও দুর্নীতিবিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের স্পষ্ট রোডম্যাপের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। এই সমালোচনা সরকারের শত্রুতার ভাষা হিসেবে না দেখে আয়না হিসেবে দেখা উচিত।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: আবেগ নয়, স্বার্থের কূটনীতি

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি “conducive environment” প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণের বিষয়টিও আলোচনায় আছে।

এখানে সরকারের অবস্থানকে পরিমিত ও বাস্তববাদী হওয়া দরকার।

ভারত আমাদের প্রতিবেশী। চীন বড় অর্থনৈতিক শক্তি। যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদার। মধ্যপ্রাচ্য আমাদের শ্রমবাজারের বড় অংশ। কারও সঙ্গে বন্ধুত্বের নামে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া যাবে না। আবার প্রতিবেশীর সঙ্গে অহেতুক উত্তেজনাও বাংলাদেশের স্বার্থে নয়।

পররাষ্ট্রনীতির সহজ সূত্র হতে পারে—বন্ধু অনেক, নির্ভরতা কারও ওপর নয়।

ছয় মাসের জনমত: আশাবাদ আছে, কিন্তু শর্তও আছে

জুনে পরিচালিত ডেল্টাগ্রামের ৩,০০০ প্রাপ্তবয়স্কের জরিপে ৭৫.৩ শতাংশ উত্তরদাতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মদক্ষতাকে সমর্থন করেছেন; ১৭.৫ শতাংশ অসন্তুষ্ট এবং ৭.২ শতাংশ কোনো মত দেননি। জরিপটির জাতীয় পর্যায়ের সম্ভাব্য ত্রুটিসীমা প্রায় ±২.১ থেকে ±২.৪ শতাংশ বলে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।

এটি নিঃসন্দেহে সরকারের জন্য ভালো খবর। কিন্তু এটাকে চূড়ান্ত সাফল্যের সনদ ভাবা উচিত নয়।

নতুন সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা এখনো মূলত “আশার আস্থা”। ছয় মাসে মানুষ আশা করে। এক বছরে ফল চায়। দুই বছরে হিসাব চায়। পাঁচ বছরে রায় দেয়।

আগের সরকারের সঙ্গে তুলনা: পার্থক্য কোথায়, ধারাবাহিকতা কোথায়

আগের আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে অতি উচ্চমূল্যে বড় বড় অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে—পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ নানা প্রকল্প দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে, যার মধ্যে খুব বড় ধরণের দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, প্রকল্প ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি, মেগা দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হওয়া এবং জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, সংস্কার এবং নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও নির্বাচিত সরকারের মতো পূর্ণ রাজনৈতিক ম্যান্ডেট তার ছিল না।

তারেক রহমান সরকারের সুযোগ এখানেই। এটি আগের সরকারের সবকিছু বাতিল করবে না, আবার সবকিছু অন্ধভাবে অনুসরণও করবে না। ভালো প্রকল্প চলবে, খারাপ প্রকল্প বন্ধ হবে। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে। রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে রাষ্ট্রীয় যোগ্যতা গুরুত্ব পাবে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন কোনো এক দলের সম্পত্তি নয়।

শেষ কথা

তারেক রহমান সরকারের প্রথম ছয় মাসকে আমি বলব—আশাব্যঞ্জক শুরু, কিন্তু অসমাপ্ত পরীক্ষা।

সরকার কিছু ভালো কাজ করেছে। সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল পুনঃখনন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক কর্মদক্ষতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা—এসব ইতিবাচক দিক। জনমত জরিপেও সরকারের প্রতি শক্তিশালী প্রাথমিক সমর্থনের ছবি পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনো খুব সাধারণ।

“বাজারের দাম কমবে কবে?”

“বিদ্যুৎ যাবে না তো?”

“গ্যাস থাকবে তো?”

“ছেলের চাকরি হবে?”

“হাসপাতালে চিকিৎসা পাব?”

“থানায় গেলে টাকা লাগবে না তো?”

“সরকারি অফিসে কাজ করাতে পরিচয় লাগবে না তো?”

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই সরকারের আসল রিপোর্ট কার্ড।

রাজনীতি দিয়ে সরকার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু মানুষের জীবন দিয়ে সরকার বিচার হয়।

তারেক রহমানের সামনে তাই একটি বড় সুযোগ আছে। তিনি চাইলে বিএনপি সরকারের ছয় মাসকে কেবল রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের গল্প হিসেবে রেখে দিতে পারেন। আবার চাইলে এটিকে রাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনিক সংস্কৃতির প্রথম অধ্যায় বানাতে পারেন।

এর জন্য প্রশংসা যতটা দরকার, সমালোচনাও ততটাই দরকার। কারণ প্রশংসা মানুষকে উৎসাহ দেয়, কিন্তু সমালোচনা পথ দেখায়।

বাংলাদেশের মানুষ এখন আর শুধু বড় বড় কথা শুনতে চায় না। তারা ছোট ছোট নিশ্চয়তা চায়—সকালে বাজারে গিয়ে যেন কম টাকা লাগে, রাতে বিদ্যুৎ যেন থাকে, হাসপাতালে গেলে ডাক্তার যেন পাওয়া যায়, কৃষক যেন ফসলের দাম পান, তরুণ যেন কাজ পান, সরকারি অফিসে যেন সম্মান পান।

রাষ্ট্র আসলে খুব জটিল কোনো বস্তু নয়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—একজন সাধারণ মানুষ তার কাছে গিয়ে কতটা নিরাপদ, সম্মানিত এবং ন্যায়বিচারপ্রাপ্ত বোধ করেন।

প্রথম ছয় মাসে সরকার দরজাটা খুলেছে।

এখন দরকার ঘরের ভেতর আলো জ্বালানো।

আর সেই আলোর হিসাব শেষ পর্যন্ত জনগণই নেবে।

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর