বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

রমজানজুড়ে বিয়ের পোশাকের বাজার মন্দা

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম

শেয়ার করুন:

রমজানজুড়ে বিয়ের পোশাকের বাজার মন্দা
রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের একটি বিয়ের পোশাকের দোকান। ছবি: ঢাকা মেইল
  • শেরওয়ানি, টুপি, মালা সেটের ভাড়াও কমেছে
  • মাত্র তিন মাস ব্যবসা জমে, বাকি সময় কম
  • ডালার বহুমুখী ব্যবহার বেড়েছে
  • ছেলেদের বিয়ের পোশাকে ভারতের প্রভাব

একদিকে মানুষ ঈদুল ফিতরের কেনাকাটায় ব্যস্ত। কিন্তু অন্যদিকে ছেলেদের বিয়ের পোশাকের বাজারে তেমন বিক্রি নেই। সারাদিনেও ক্রেতার দেখা মিলছে না। যেসব পণ্য ভাড়ায় যেত, সেগুলোর ভাড়াও এখন কমে গেছে। ভাড়া নেওয়ার লোকজনও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।


বিজ্ঞাপন


মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড ঘুরে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

একটা সময় এলিফ্যান্ট রোড ছিল বিয়ের পোশাক কেনাকাটার একমাত্র মার্কেট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুধু নয়, লন্ডন এবং ইউরোপে থাকা লোকজনও দেশে বিয়ে সারতে এই মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসত। কিন্তু এখন আর সেই জাঁকজমক নেই। দোকানের সংখ্যা বেড়েছে। এসব আইটেম ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তেও বিক্রির দোকান বেড়েছে। ফলে এখন আর আগের মতো মানুষজন এলিফ্যান্ট রোডে ছোটে না। হাতের নাগালেই এখন পাওয়া যায় বিয়ের সব সরঞ্জাম। ক্রেতা ভাগ হয়ে যাওয়ায় এই রোডের ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় এখন বড়ই মন্দা চলছে।

পুরো রমজান মাসে পোশাকের বাজার রমরমা থাকলেও বিয়ের পোশাকের বাজারে জোয়ার আসে না। দোকান খুলে বসে গল্পগুজব করে সময় কাটাতে হয়। এর মাঝেও দিতে হয় কর্মচারীদের বেতন-বোনাস।

কথা হয় পাত্রকে সাজানোর সাজসজ্জার দোকান ‘নবরূপ’-এর ম্যানেজার রিফাত মিয়ার সঙ্গে। তাদের দোকানে শেরওয়ানি, পাগড়ি, জুতা, পায়জামা, মালা, ওড়না—এক সেট হিসেবে ভাড়া মেলে। প্রতি সেট মাত্র আড়াই হাজার টাকা। যে কেউ এসব ভাড়া নিয়ে সর্বোচ্চ সাত থেকে ১০ দিন রাখতে পারবেন। দেশের যেকোনো প্রান্তে তারা এসব ভাড়া দেন। তবে ভাড়ার বাইরে কিনতে চাইলে গুনতে হবে সাড়ে আট হাজার টাকা।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন: নামিদামি ব্র্যান্ডের মোড়কে নকল প্রসাধনীর দাপট, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

এসবের বাইরে কনের বাড়িতে পোশাক এবং উপহার পাঠাতে গত কয়েক বছর ধরে চালু হয়েছে ডালা। ডালায় করে পাঠানো হয় বরের বাড়ির বিশেষ উপহার। এই ডালার প্যাকেজ দশ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত। ডালা শুধু বিয়েবাড়িতেই নয়, এখন এর বহুবিধ ব্যবহার বেড়েছে। ব্যাংক, বীমা, গার্মেন্টস, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল—সব জায়গায় এই ডালা উপহার দেওয়া হয়। ফলে দিনদিন ডালার কদর বাড়ছে।

তবে বিয়েতে সাধারণত বরেরা, বিশেষ করে মুসলিমরা, পাগড়ি পরে থাকে। এই পাগড়ির প্রচলন বহুকাল থেকে। নব্বইয়ের দশক থেকে টুপির বদলে বাংলাদেশে পাগড়ি যোগ হয়। এই পাগড়ি মসলিন কাপড়ে তৈরি হলে দাম চার হাজার টাকার ওপরে। টিস্যু কাপড় হলে মান ভেদে ১২০০, ১৫০০ বা ২০০০ টাকা এবং ফ্রেমের পাগড়ি ১০০০-১২০০ টাকায় কিনতে পাওয়া যায়। তবে অভিজাত পরিবারগুলোর বিয়েতে পাগড়ি বাঁধতে তারা দোকান থেকে ভাড়ায় লোক নিয়ে যান। বাসায় গিয়ে বেঁধে দিয়ে এলে মসলিন কাপড়ের পাগড়ি বাঁধাতে ১৮-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পড়ে যায়। আগে পাগড়ি চুন্নি কাপড়ের হতো, কিন্তু সে কাপড় এখন মার্কেট আউট বলে জানালেন তিনি।

শেরওয়ানি বেশির ভাগই ভারতীয় হয়ে থাকে। দেশটির আচকন কাজ করা শেরওয়ানির দাম ১৮ থেকে ২২ হাজার টাকা এবং পাকিস্তানি শেরওয়ানি ১৬ হাজার টাকার মতো হয়ে থাকে। ভারতীয় ফিটিংয়ের শেরওয়ানি বেশি চলে। তবে দোকানদাররা থান কাপড় কিনে শেরওয়ানি তৈরি করেও বিক্রি করেন। এতে মধ্যবিত্তরাও সেই শেরওয়ানি নিতে পারেন।

তার দোকানে পাগড়ি ও শেরওয়ানির সেট তিন বারের বেশি ভাড়া দেওয়া হয় না। পরে সেগুলো হোলসেলে উপজেলা ও জেলার দোকানিরা নিয়ে যান। তারা আবার উপজেলা ও জেলায় সেগুলো দিনের পর দিন ভাড়া খাটান। ঢাকায় তিন বারের বেশি চলে না, কারণ রং চটলে কেউ নিতে চায় না।

বিয়েতে বরের সাজসজ্জার আরেকটি অনুসঙ্গ জুতা। এই জুতা সাধারণত দুই ধরনের হয়—নাগড়া ও লোফার। নাগড়া ৪০০-৬০০ টাকা এবং লোফার নকশা-ডিজাইনভেদে ১০০০ থেকে ১৭০০ টাকা পর্যন্ত হয়।

এবার বিয়ের বাজারের পণ্য বিক্রিতে ভাটা চলছে। তবে এ ব্যবসার ঘাটতি পূরণ হয় ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে। এবার ব্যবসার সেই সিজন তারা পাননি নির্বাচন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বলে জানান তিনি।

বরের সাজসজ্জার পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ‘সানাই’-এর মালিক সায়েরা আলম বলেন, শেরওয়ানির ছয় আইটেমের সেট ১০, ২০ ও ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। আবার কেউ ভাড়ায় চাইলে ২৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়।

তার মতে, আজ থেকে ৪০ বছর আগে যখন তাদের প্রথম দোকান ছিল, তখন এ রোডে এত দোকান ছিল না। ফলে ভালো বিক্রি হতো। কিন্তু এখন অনেক দোকান হওয়ায় প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ক্রেতারাও ভাগ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, আগে লন্ডন থেকে অনেকেই দেশে এসে বিয়ের সাজসজ্জার জিনিস কিনতেন। এখন ভাড়াও আগের মতো হয় না। তবু দোকান চালু রাখতে হয়, কর্মচারীদের বেতন ও ঈদ বোনাসও দিতে হয়।

এমআইকে/এআর

 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর