বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

ফুটপাতে ‘স্টকলট ও রিজেক্ট’ পণ্যে স্বস্তি খুঁজছে স্বল্প আয়ের মানুষ!

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৭ এএম

শেয়ার করুন:

ফুটপাতে ‘স্টকলট ও রিজেক্ট’ পণ্যে স্বস্তি খুঁজছে স্বল্প আয়ের মানুষ!
ফুটপাতে ‘স্টকলট ও রিজেক্ট’ পণ্যে স্বস্তি খুঁজছে স্বল্প আয়ের মানুষ!

পবিত্র ঈদুল ফিতর ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে জমে উঠেছে ঈদের কেনাকাটা। বিশেষ করে মতিঝিল ও গুলিস্তান এলাকার ফুটপাতজুড়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে পোশাক বিক্রি। স্বল্প আয়ের মানুষ কম দামে ঈদের পোশাক কিনতে ভিড় করছেন এসব দোকানে। আর এই বাজারের বড় অংশজুড়ে রয়েছে ‘স্টকলট’ ও ‘রিজেক্ট’ পোশাক, যেগুলো তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়।

সরেজমিনে মতিঝিল ও গুলিস্তান এলাকায় দেখা যায়, ফুটপাতের সারি সারি অস্থায়ী দোকানে সাজানো রয়েছে শার্ট, প্যান্ট, টি-শার্ট, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, শিশুদের পোশাক এবং বিভিন্ন ধরনের জুতা-স্যান্ডেল। দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড়ও চোখে পড়ার মতো। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের জন্য একসঙ্গে কয়েকটি পোশাক কিনছেন। অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে রাজধানীর অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ফুটপাতের এই বাজারই হয়ে উঠেছে ঈদের কেনাকাটার প্রধান ভরসা। শপিংমল বা বড় দোকানের তুলনায় অনেক কম দামে পোশাক পাওয়ায় মানুষ এসব দোকানের দিকে ঝুঁকছেন।


বিজ্ঞাপন


10

মতিঝিলের পূবালী ব্যাংকের সামনে ফুটপাতে বিপুল পাঞ্জাবির সমাহার। ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় মিলছে এসব পাঞ্জাবি। যেগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন নামি দামি ব্র্যান্ডের স্টিকার। বিক্রেতারাও হাঁক ডাক দিয়ে বিক্রি করছেন পাঞ্জাবি। ক্রেতারাও যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন এই এলাকায়।

বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব পণ্যের বড় একটি অংশই তৈরি পোশাক কারখানার ‘স্টকলট’ বা ‘রিজেক্ট’ হিসেবে পরিচিত। স্টকলট বলতে সাধারণত এমন পোশাক বোঝানো হয়, যেগুলো বিদেশে রফতানির জন্য তৈরি হলেও অতিরিক্ত উৎপাদন বা অর্ডার বাতিল হওয়ায় দেশে থেকে যায়। অন্যদিকে রিজেক্ট পণ্য হলো সেই পোশাক, যেগুলোতে সামান্য ত্রুটি থাকায় বিদেশে পাঠানো হয়নি। এসব ত্রুটি অনেক সময় এতটাই ছোট হয় যে, সাধারণ ক্রেতার চোখে পড়ে না।

ফুটপাতের বিক্রেতা আবদুল মালেক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের দোকানে বেশির ভাগই স্টকলট আর রিজেক্ট পণ্য। বড় বড় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থেকে এগুলো পাইকারি দামে কিনে এনে বিক্রি করি। নতুন মার্কেটের তুলনায় এখানে দাম অনেক কম। তাই গরিব মানুষ বেশি আসে। একটি ব্র্যান্ডেড শার্ট যেখানে শপিংমলে দুই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে ফুটপাতে একই ধরনের স্টকলট শার্ট ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়।’


বিজ্ঞাপন


8

গুলিস্তান এলাকায় ফুটপাতে টি-শার্ট বিক্রি করছেন মোহাম্মদ রাসেল। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ঈদের সময় আমাদের ব্যবসা সবচেয়ে ভালো হয়। অনেকেই কম দামে ভালো পোশাক খুঁজতে এখানে আসে। স্টকলটের টি-শার্ট আমরা ২০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি করছি। অনেক সময় বিদেশি ব্র্যান্ডের পোশাকও আসে। তবে সেগুলোতে হয়তো সাইজ বা সেলাইয়ে ছোটখাটো সমস্যা থাকে। কিন্তু দাম কম হওয়ায় ক্রেতারা সেগুলো কিনতে আগ্রহী।’

ফুটপাতের দোকানগুলোতে শুধু পুরুষদের পোশাক নয়, নারীদের থ্রি-পিস, ওড়না, লেগিংস এবং শিশুদের বিভিন্ন ধরনের পোশাকও বিক্রি হচ্ছে। ছোটদের ফ্রক, শার্ট-প্যান্ট সেট, জিন্সসহ নানা ধরনের পোশাকের দাম ২০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। ক্রেতা মো. সাইফুল ইসলাম, যিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন, তিনি বলেন, আমার বেতন খুব বেশি না। শপিংমল থেকে সবাইকে ঈদের কাপড় কিনে দেওয়া সম্ভব না। তাই প্রতি বছরই ফুটপাত থেকে কিনি। এখানে কম দামে মোটামুটি ভালো পোশাক পাওয়া যায়। এবার তিনি নিজের জন্য একটি শার্ট এবং ছেলের জন্য একটি প্যান্ট কিনেছেন। সব মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৭০০ টাকা।

তবে ফুটপাতের এসব পণ্য নিয়ে কিছু অভিযোগও রয়েছে। অনেক সময় ক্রেতারা অভিযোগ করেন, কিছু পোশাক ধোয়ার পর রং উঠে যায় বা কাপড়ের মান ভালো থাকে না। তবু কম দামের কারণে অনেকেই ঝুঁকি নিয়েই এসব পোশাক কিনে থাকেন। ফুটপাতের বাজারে দরদামও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক দোকানে নির্দিষ্ট দাম থাকলেও বেশির ভাগ জায়গায় দরদাম করে পোশাক কেনা যায়। ক্রেতারা কয়েকটি দোকান ঘুরে দাম তুলনা করে তারপর কেনাকাটা করেন।

9

মতিঝিলের এক ক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে দরদাম করলে অনেক সময় অর্ধেক দামে পর্যন্ত কমে যায়। তাই একটু সময় নিয়ে কেনাকাটা করতে হয়।’

ঈদ সামনে রেখে রাতেও এসব এলাকায় কেনাকাটার ভিড় বাড়ছে। অনেক অফিসফেরত মানুষ সন্ধ্যার পর ফুটপাতে এসে কেনাকাটা করছেন। দোকানগুলোও রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে ফুটপাতের এই জমজমাট বাজার পথচারীদের জন্য কিছুটা ভোগান্তির কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক জায়গায় দোকান বসানোর কারণে ফুটপাত সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে পথচারীদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের মৌসুম তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। অনেকেই সারা বছর অপেক্ষা করেন এই সময়ের জন্য। ঈদের আগে কয়েক সপ্তাহের ব্যবসাতেই তাদের বছরের বড় অংশের আয় হয়ে যায়। ঈদের আনন্দ সবার মাঝে ভাগাভাগি করে নেওয়ার ইচ্ছা থেকেই অনেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক কিনতে চান। আর সেই চাহিদা পূরণে মতিঝিল ও গুলিস্তানের ফুটপাতের স্টকলট ও রিজেক্ট পণ্যের বাজার স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এক ধরনের স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে।

টিএই/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর