- দুই শতাধিক দোকানে শাড়ি ও পোশাকের সমাহার
- শাড়ির দাম দেড় থেকে দশ হাজার টাকা
- বড় দোকানগুলোতে তুলনামূলক বেশি ভিড়
- চাঁদরাত পর্যন্ত বেচাকেনার আশা ব্যবসায়ীদের
রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর সংলগ্ন বেনারসি পল্লীতে এখন উৎসবের আমেজ। সারি সারি দোকানে রঙিন শাড়ি আর নানা পোশাকের সমাহার। প্রতিটি দোকানেই একাধিক বিক্রয়কর্মী ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ দোকানের ভেতরে ক্রেতাদের বাহারি পোশাক দেখাচ্ছেন, আবার কেউ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁকডাক দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছেন। নতুন নতুন কালেকশন, ডিজাইন এবং বিভিন্ন ছাড়ের কথা বলে ক্রেতাদের দোকানে টানছেন বিক্রয়কর্মীরা।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বিকেলে বেনারসি পল্লী ঘুরে দেখা গেছে, ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতাদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করেছে। বিকেলের দিকে বাজারে ভিড় আরও বাড়ে। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই এসেছেন ঈদের কেনাকাটা করতে। কেউ শাড়ি দেখছেন, কেউবা পছন্দের পোশাক খুঁজে পেতে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরছেন।
দোকানগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, বড় দোকানগুলোতে তুলনামূলক ভিড় বেশি। ছোট বা ভেতরের দোকানগুলোতে ক্রেতা কম হলেও সেখানেও বিক্রেতারা ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতাদের মধ্যে তরুণীদের উপস্থিতি বেশি। কেউ নিজেদের জন্য শাড়ি কিনছেন, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের জন্য পোশাক বেছে নিচ্ছেন। অনেকেই আবার দোকানের ভিড় এড়িয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে দেখছেন।

মিরপুরের এই বেনারসি পল্লী রাজধানীর অন্যতম পরিচিত শাড়ির বাজার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়। এখানে দুই শতাধিক দোকান রয়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের শাড়ির বিশাল সংগ্রহ থাকায় অনেকেই বিশেষ উৎসবের কেনাকাটার জন্য এই বাজারে আসেন।
বিজ্ঞাপন
দোকানগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে নানা ধরনের শাড়ি। ঐতিহ্যবাহী জামদানি, টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি, রাজশাহী সিল্ক, ব্রোকেড, ধুপিয়ান, ঢাকাই মসলিন, কাতান, কোটা, কাঞ্জিপুরম, জর্জেটসহ নানা কাপড়ের শাড়ি সাজানো রয়েছে দোকানজুড়ে। প্রতিটি শাড়ির ডিজাইন ও কাজ আলাদা। ক্রেতাদের পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন রঙ ও নকশার শাড়ি তুলে ধরছেন বিক্রেতারা।
দামের দিক থেকেও রয়েছে বেশ বৈচিত্র্য। সাধারণ শাড়ি দেড় হাজার টাকা থেকেই শুরু হচ্ছে। আবার কাপড়ের মান ও কাজের ধরন অনুযায়ী দাম গিয়ে দাঁড়াচ্ছে পাঁচ হাজার, আট হাজার এমনকি দশ হাজার টাকারও বেশি। কিছু বিশেষ শাড়ির দাম আরও বেশি বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
শুধু শাড়িই নয়, এই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে লেহেঙ্গা, সারারা, গাউন এবং দেশি-বিদেশি থ্রিপিসও। অনেক দোকানে ঈদের নতুন ডিজাইনের পোশাক আলাদা করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে রঙিন ব্যানার, পোস্টার এবং আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে দোকানের সামনের অংশ।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, রোজার শুরুতেই বেচাকেনা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে ছুটির দিনে ক্রেতাদের ভিড় তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। ঈদের সময় যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বাজার জমে উঠবে। ঈদের শেষ সপ্তাহে সাধারণত সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। তখন অনেক সময় ক্রেতাদের সামাল দিতেও হিমশিম খেতে হয়। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঈদের পরপরই পহেলা বৈশাখ। এই দুই উৎসবকে ঘিরে বেনারসি পল্লীর ব্যবসা ভালো হবে। এজন্য নতুন ডিজাইনের শাড়ি ও পোশাক মজুত করা হয়েছে বলে জানান তারা।
রূপসী বেনারসি নামের একটি দোকানের স্বত্বাধিকারী আফজাল জানান, তাদের দোকানে ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই জামদানি, সিল্ক, কাতান, লিনেন এবং টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি পাওয়া যায়। ঈদ উপলক্ষে নতুন ডিজাইনের অনেক শাড়ি আনা হয়েছে। এখন ধীরে ধীরে বেচাকেনা শুরু হয়েছে। সামনে ঈদ, তারপরই নববর্ষ। এই দুই উৎসবকে সামনে রেখে ভালো ব্যবসার আশা করছি। সাধারণত চাঁদরাত পর্যন্ত ক্রেতার ভিড় থাকে।
আরেক ব্যবসায়ী আফজান হোসেন বলেন, ছুটির দিনগুলোতে ক্রেতা তুলনামূলক বেশি আসছেন। তবে কিছু পণ্যের দাম আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। ভারত থেকে আগের মতো পণ্য আসছে না। এজন্য কিছু শাড়ির দাম একটু বেশি পড়ছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি ক্রেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিক্রি করতে। যাতে কেউ খালি হাতে ফিরে না যায়।
শাহিনা ফ্যাশন হাউজের বিক্রয়কর্মী শফিক ঢাকা মেইলকে বলেন, ঈদকে সামনে রেখে বাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে বড় ও পরিচিত দোকানগুলোতে ক্রেতার ভিড় তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। তবে বাজারের বেশির ভাগ দোকানেই প্রায় একই ধরনের পোশাক ও পণ্য পাওয়া যায়। অনেক ক্রেতা সরাসরি কোনো দোকান থেকে কেনাকাটা না করে আগে কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখেন। পণ্যের নকশা, মান ও দাম তুলনা করে তারপর তারা সিদ্ধান্ত নেন। এ কারণে বাজারে ক্রেতার ভিড় থাকলেও অনেক সময় তাৎক্ষণিক বিক্রি কম হয়। তবে ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, ততই কেনাকাটা বাড়বে বলে আশা করছেন বিক্রেতারা।
বাজারে আসা অনেক ক্রেতা জানান, পছন্দের পোশাক খুঁজে পেতে তাদের বেশ সময় লাগছে। বিভিন্ন দোকান ঘুরে নকশা ও কাপড়ের মান দেখে তারপর তারা কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অনেকেই পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্যও পোশাক কিনছেন, তাই তুলনামূলক বেশি সময় নিয়ে বাছাই করছেন।

তবে শুধু পছন্দ হলেই হচ্ছে না, দামের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন ক্রেতারা। অনেকের অভিযোগ, কিছু পোশাকের দাম তুলনামূলক বেশি মনে হচ্ছে। তাই একই ধরনের পণ্য বিভিন্ন দোকানে ঘুরে দেখে কম দামে ভালো মানের পোশাক খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।
বেনারসি পল্লীর কলকাতা বড় বাজার নামের একটি শোরুমে কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা হয়। তাদের একজন মনোয়ারা বেগম। তিনি ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে শাড়ি কিনতে এসেছেন। তিনি বলেন, পছন্দের শাড়ি খুঁজে পেতে কয়েকটি দোকানে ঘুরেছি, কিন্তু এখনো পছন্দমতো শাড়ি পাইনি। অনেক শাড়ির নকশা ভালো লাগলেও দামের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হচ্ছে। শাড়ির দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে। তাই তাড়াহুড়া না করে আরও কিছু দোকান ঘুরে দেখে তারপর নিবো ভাবছি।
নুসরাত জাহান বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে শাড়ি কিনতে এসেছেন। তিনি বলেন, ঈদ উপলক্ষে নতুন শাড়ি কেনার জন্য বাজারে এসেছি। অনেক দোকানেই সুন্দর নকশার শাড়ি আছে, তবে সবকিছু মিলিয়ে পছন্দেরটি খুঁজে পাওয়া সহজ হচ্ছে না। কিছু শাড়ি ভালো লাগলেও দামের কারণে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে।
উত্তরা থেকে আসা আরেক ক্রেতা নাসিম উদ্দিন তার নতুন বউয়ের জন্য উপহারের জন্য শাড়ি কিনতে এসেছেন। তিনি রাঙ্গাবউ নামের একটি দোকানে শাড়ি দেখছিলেন। তিনি বলেন, দাম একটু বেশি রাখার চেষ্টা করছে। যেসব পিউর বেনারসি শাড়ির দাম চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা হওয়ার কথা, সেগুলোর জন্য সাত থেকে আট হাজার টাকা চাইছে। তবে দরদাম করলে কিছুটা কমে যায়।বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য ভালো থাকলেও দাম কিছুটা বেশি। তবুও ঈদ উপলক্ষে উপহার হিসেবে শাড়ি কিনতে অনেকেই এই বাজারে আসছেন।
এএইচ/জেবি














