বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

ঈদে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ভরসা ‘গরিবের মার্কেট’

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬, ০১:৫১ পিএম

শেয়ার করুন:

ঈদে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ভরসা ‘গরিবের মার্কেট’

ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, রাজধানীর ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা গুলিস্তানের ফুটপাতগুলো ততই জমে উঠছে। স্বল্প আয়ের মানুষদের কাছে ‘গরিবের মার্কেট’ হিসেবে পরিচিত এসব ফুটপাতের দোকান এখন ঈদের কেনাকাটার অন্যতম ভরসা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বড় শপিংমল বা অভিজাত মার্কেটের বদলে ফুটপাতেই খুঁজছেন সাধ্যের মধ্যে ঈদের পোশাক।

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া, আবরার ফাহাদ এভিনিউ, জিরো পয়েন্ট, পুরানা পল্টন, বায়তুল মোকাররম এলাকার ফুটপাতগুলোতে দেখা যায় ক্রেতাদের ভিড়। কেউ পরিবারের শিশুদের জন্য জামা-প্যান্ট কিংবা পায়জামা পাঞ্জাবি কিনছেন, কেউ আবার নিজের জন্য পাঞ্জাবি বা জুতা দেখছেন।


বিজ্ঞাপন


দোকানিদের হাঁকডাক, ক্রেতাদের দরদাম আর মানুষের ভিড়ে পুরো এলাকা যেন ঈদমুখর হয়ে উঠেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার ব্যবসা খুব একটা ভালো যায়নি। ফলে এবার ঈদকে ঘিরে তাদের অনেক প্রত্যাশা। যদিও এখনো প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি হয়নি, তবে ঈদের আগের কয়েক দিনে ব্যবসা জমে উঠবে বলে আশাবাদী তারা।

জিরো পয়েন্টের পাশে শিশুদের পোশাক নিয়ে বসেছেন সাব্বির আহমেদ নামের ব্যবসায়ী। কয়েক বছর ধরে ফুটপাতে ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, গত দুই বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসা অনেকটা খারাপ গেছে। এবার ঈদে একটু ভালো বিক্রির আশা করছি। মানুষ আসতেছে, কিন্তু এখনো আগের মতো ভিড় হয়নি। চানরাইতের দিকে বেশি বিক্রি হয়।

Gulistan2


বিজ্ঞাপন


সাব্বিরের দোকানে দাঁড়িয়ে সন্তানের জন্য জামা-প্যান্ট কিনছিলেন ডেমরা থেকে আসা সাজ্জাদুর রহমান। তিনি একজন পোশাক শ্রমিক। তিনি বলেন, বড় বড় মার্কেটে গেলে দাম অনেক বেশি। আমাদের মতো মানুষের পক্ষে সবসময় সেখান থেকে কেনা সম্ভব না। তাই ফুটপাতেই আসি। এখানে কম দামে কিছু ভালো জিনিস পাওয়া যায়।

তবে তিনিও স্বীকার করেন, এবার দাম কিছুটা বেড়েছে। আগে যে পোশাক ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটির দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। তবুও বড় মার্কেটের তুলনায় দাম অনেক কম বলেই ফুটপাতই তার ভরসা।

গুলিস্তানে প্রায় তিন দশক ধরে ফুটপাতে ব্যবসা করছেন আলামিন শেখ নামে এক বৃদ্ধ দোকানি। বয়স এখন প্রায় ৫০। ফুলবাড়িয়া মার্কেটের সামনে মেয়েদের পোশাক বিক্রি করেন তিনি। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আগে ঈদের সময় গুলিস্তান অনেক বেশি জমজমাট থাকত। এখন চারদিকে মার্কেট হয়েছে, পাড়া-মহল্লাতেও দোকান হয়েছে। তাই ক্রেতা একটু ভাগ হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, সব জিনিসের দাম বাড়ছে। আমরা যে পোশাক বিক্রি করি সেগুলোর দামও কিছুটা বেড়েছে। একটা পোশাকে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দিতে হচ্ছে। তারপরও আমরা কম লাভে বিক্রি করার চেষ্টা করি।

ঈদের সময় পাঞ্জাবির চাহিদা সবসময়ই বেশি থাকে। গুলিস্তানের ফুটপাতেও নানা ধরনের পাঞ্জাবি সাজিয়ে রেখেছেন বিক্রেতারা। মাত্র ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে ৭০০ টাকার মধ্যেই এখানে পাঞ্জাবি পাওয়া যায়। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছে এসব দোকানের আলাদা কদর রয়েছে।

Gulistan4

বায়তুল মোকাররম এলাকার পাঞ্জাবি বিক্রেতা বাসার আলম বলেন, এখন সব জায়গায় মার্কেট হয়েছে। তাই ক্রেতাদের সঙ্গে অনেক দরাদরি করতে হয়। লাভ খুব বেশি থাকে না। তারপরও ব্যবসা চালিয়ে যেতে হয়।

নিজের ও সন্তানের জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে মেরাদিয়া এলাকা থেকে এসেছেন গুলিস্তানে এসেছেন মানিক হাওলাদার। তিনি বলেন, ঈদে পরিবারের জন্য কিছু না কিছু কিনতে ইচ্ছা করে। কিন্তু বাজারের যে অবস্থা, সেখানে হিসাব করে চলতে হয়। তাই সীমিত বাজেটে ভালো কিছু পাওয়ার জন্য ফুটপাতেই আসি।

গুলিস্তানের হকার্স মার্কেটের সামনে ছোটদের জিন্স প্যান্ট বিক্রি করেন সুমন মিয়া। তার দোকানে সারি সারি করে ঝুলছে শিশুদের পোশাক। তিনি জানান, ঈদ উপলক্ষে এবার অনেক পোশাক তুলেছেন। কিন্তু এখনো বিক্রি খুব একটা হয়নি। তবে ঈদের আগে পরিস্থিতি বদলাবে বলে আশা করছেন।

একই এলাকায় শিশুদের পোশাক বিক্রি করেন আকরাম হোসেন নামের আরেক দোকানি। তিনি বলেন, ৩০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে ভালো পোশাক পাওয়া যায় এখানে। কিন্তু অনেক ক্রেতা খুব কম দাম করতে চান। আমরা বারবার বোঝাই যে একই জিনিস বড় মার্কেটে গেলে আরও বেশি দাম পড়বে।

Gulistan3

বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটের পাশে পাঞ্জাবি বিক্রি করছেন সোহেল। তিনি বলেন, ক্রেতারা আসতে শুরু করেছে। ঈদের আগের দিন পর্যন্ত ভালো বিক্রি হবে বলে আশা করছি।

সন্ধ্যার পর গুলিস্তানের ফুটপাতের চিত্র আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। অফিস শেষ করে অনেকেই সরাসরি এখানে চলে আসেন কেনাকাটার জন্য। রাস্তার দুই পাশে রঙিন পোশাকের সারি, ভিড়ের মধ্যেও দরদাম আর দোকানিদের হাঁকডাক মিলিয়ে এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়।

বড় মার্কেটের ঝলমলে আলো বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য গুলিস্তানের এই ফুটপাত যেন ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সহজ ঠিকানা। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য অনেকেই শেষ ভরসা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন এই ‘গরিবের মার্কেট’কেই।

ঈদের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বাড়বে ক্রেতাদের ভিড়। আর সেই ভিড়ের মধ্যেই জীবিকার আশা খুঁজে নেন ফুটপাতের হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তাদের প্রত্যাশা, অন্তত ঈদের এই মৌসুমে ভালো বিক্রি হবে, কিছুটা স্বস্তি মিলবে সংসারের খরচ মেটাতে।

এমআর/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর