কথা ছিল বাবার সঙ্গে নতুন জামাকাপড় পড়ে, ছোট্ট রবিন ও রকি ঈদের নামাজ আদায় করবে। আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠবে। সেখানে তাদের ঈদ আনন্দ রূপ নিয়েছে বিষাদে। চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে মৃত্যু হয় তাদের বাবা মো. রাজুর। বাবার ছেঁড়া, রক্তমাখা জামাকাপড় নিয়ে অশ্রুসিক্ত তিন সন্তান এখন দাঁড়িয়ে আছে ঘরের সামনে।
জানা গেছে, রোববার (৩০ মার্চ) চাঁদরাতে সদর উপজেলার চররুহিতা ইউনিয়নের সবুজের গোজা নামক এলাকায় রাজুকে রাত আড়াইটার দিকে তার ভাতিজা কবিরের ঘর থেকে চোর আখ্যা দিয়ে উৎসুক জনতা ধরে নিয়ে স্থানীয় একটি ইটভাটার সামনে নারিকেল গাছের সঙ্গে হাত-পা বেঁধে রাতভর নির্যাতন করে। ঈদের দিন সকালে উদ্ধার করে রাজুকে সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় রাজুর স্ত্রী জোৎস্না বেগম ৮জনের নাম উল্লেখ করে সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৪জনকে গ্রেফতার করে। অন্যদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
নিহত রাজু চররুহিতা ইউনিয়নের (৯ নম্বর ওয়ার্ডের) মৃত সফিক উল্লাহর ছেলে। পেশায় শ্রমিক। পাশাপাশি ওই ওয়ার্ড শ্রমিকদলের দফতর সম্পাদক ছিলেন তিনি।
স্বামীকে হারিয়ে স্ত্রী জোৎস্না বেগম এখন বাকরূদ্ধ। তার মাথার ওপর মনে হয় পুরো আকাশ ভেঙে পড়ছে। তার সংসারজুড়ে এখন অন্ধকার। সংসারের হাল ধরার মতন তার কেউ নেই।
নিহত রাজুর মেয়ে রুবি আক্তার ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলেন, গাছের সঙ্গে বেঁধে নিষ্ঠুর নির্যাতন করার একপর্যায়ে হামলাকারী রাজুর হাত-পা ইট দিয়ে থেঁতলে দেয়। খেজুর গাছের কাঁটা দিয়ে পুরো শরীরের আঘাত করা হয়। তারা এ ঘটনায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছে।
বিজ্ঞাপন
নিহত রাজুর মা জীবনুর নাহার বুকের সন্তানকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, চাঁদরাতে সবাই আনন্দ করে। আমার সন্তানকে ওরা হত্যা করছে। আজ আমার অবুঝ দুই নাতি ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত। তাদের অভাবের সংসার। কীভাবে আমার পুত্রবধূ এ দুই ছেলেকে নিয়ে সামনের দিনগুলো চলবে। আমি হত্যাকারীদের উপযুক্ত বিচার চাই।
প্রতিবেশী অনেকেই রাজু হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে দোষীদের গ্রেফতারে দাবি তুলছেন। তার ক্ষোভ-প্রকাশ করে বলেন, রাজুকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে না দিয়ে এভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা ঠিক হয়নি। যারা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের বিচার হওয়ার উচিত।
এদিকে অভিযুক্ত কবিরের স্ত্রী রাবেয়া বেগম বলেন, রাজু আমাদের সম্পর্কে চাচা হয়। যখন তিনি আমাদের ঘরে ঢুকে মোবাইল চুরি করার চেষ্টা করে। হাতে-নাতে ধরা পড়ে। চোরচোর বলাতে আশপাশের লোকজন এসে আমাদের কাছ থেকে রাজু ছিনিয়ে নেয়। তার অত্যাচারে গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ।
লক্ষ্মীপুর পুলিশ সুপার মো.আকতার হোসেন ঢাকা মেইলকে জানান, ঈদের দিন সকালে জেলা সদর হাসপাতাল থেকে তাদের এক ব্যক্তির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। পরবর্তী সময় পুলিশ বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারে চুরির অপবাদ এক ঘর থেকে কিছু উৎসুক রাজুকে আটক করে। পিটিয়ে নির্যাতন করে। অভিযুক্ত রাজুর বিরুদ্ধে চুরির মামলা রয়েছে। অনেকেই তার চুরির ঘটনার কারণে ক্ষিপ্ত। হত্যার ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিনিধি/এসএস