শীত মৌসুম শেষ হতে না হতে কিছুটা বেড়েছিল সবজির দাম। তবু অস্বস্তি জাগেনি ক্রেতাদের মনে। সেই স্বস্তি বিরাজ করছে এখনও। কিন্তু দফায় দফায় আলোচনা ও কঠোর নজরদারির পরও ভোগাচ্ছে চাল-তেলসহ মাছ-মুরগির দাম।
শুক্রবার (২১ মার্চ) বিকেলে এমন তথ্য জানিয়েছেন ক্রেতারা। ক্রেতাদের দাবি, কর্পোরেট সিন্ডিকেটের কারণে চাল-তেল ও মাছ-মুরগির বাজারে অস্বস্তি বিরাজ করছে। স্বস্তি ফেরাতে প্রশাসনের অতিদ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কঠোর পদক্ষেপের কথা বলেছেন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু। তিনি বলেন, কর্পোরেট সিন্ডিকেটের বিষয়ে প্রশাসন অবগত। একটু সদিচ্ছা নিয়ে ব্যবস্থা নিলে দেশের ক্রেতা সাধারণ স্বস্তিতে বাঁচতে পারত।
ক্যাবের তথ্যমতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঠিক পদক্ষেপে গত দেড় দশকের মধ্যে পানির দরে বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ। দুই সপ্তাহ আগে কেজি প্রতি ৩০-৪০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া দেশি পেঁয়াজ এখন ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। একই সময়ে ১০-১৫ টাকা কমেছে আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজের দাম। কেজি প্রতি ৪০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে পণ্যটি।
এছাড়া কেজিতে ১০ টাকা কমেছে ছোলা ও খেসারির দাম। রমজানে ইফতারির অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে খ্যাত ছোলা ৮৫ টাকা দরে। পেঁয়াজু তৈরির প্রধান উপকরণ খেসারি ডাল ৯৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে খাতুনগঞ্জে। অন্যদিকে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি (৩৭.৩২ কেজি) ৭০ টাকা কমেছে চিনির দাম। বর্তমানে মণপ্রতি ৪ হাজার ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে পণ্যটি।
সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, বাজারে একদিকে পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে ভোগ্যপণ্যের। আবার রমজান শেষের দিকে হওয়ায় চাহিদাও কমছে। তাই দামও কমতির দিকে। ছোলা, খেসারি, পেঁয়াজ, চিনি ইত্যাদি সব পণ্যের দামই কমতির দিকে।
বিজ্ঞাপন
কমেছে সবজির দামও
পবিত্র রমজান শুরুর পর আরও কমেছে সবজির দাম। করলা-ঢেঁড়স-পটল বাদ দিয়ে গত দুই সপ্তাহে দাম কমেছে টমেটো, শিম, কাঁচা মরিচ, বেগুন, শসা, মিষ্টি কুমড়াসহ আরও কয়েকটি সবজির। নগরীর অক্সিজেন, আতুরার ডিপো, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বিবিরহাট, কর্ণফুলী কমপ্লেক্স, কাজীর দেউড়ি, চকবাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে জানা গেছে এসব তথ্য।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গেল দুই সপ্তাহের ব্যবধানে নগরে ৫ থেকে ১০ টাকা দাম কমেছে টমেটো, শিম, কাঁচা মরিচ, বেগুন, শসা, মিষ্টি কুমড়া, লাউ ও গাজরের। নগরে এসব সবজির মধ্যে টমেটো ১০-১৫, শিম ৪০, কাঁচা মরিচ ৪৫-৫০, বেগুন (ছোট) ৩০-৪০, বড় বেগুন ৭০-৮০ টাকা। শসা ৫০-৬০, মিষ্টি কুমড়া, গাজর ও লাউ ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে চড়া দাম বারোমাসি সবজির। বারোমাসি সবজির মধ্যে করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, ঢেড়স ৫০ থেকে ৬০, পটল ৭০, বরবটি ৬০, পেঁপে ৫০, চিচিঙ্গা ৩০ থেকে ৪০, আলু ২৫ থেকে ৩৫, প্রতি হালি লেবু ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ভোগাচ্ছে মুরগির দাম
সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ফের ১৫ টাকা বেড়েছে ব্রয়লার মুরগির দাম। গত সপ্তাহে ১৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া আমিষজাত পণ্যটি শুক্রবার সকাল থেকে চট্টগ্রামের সবকটি বাজারে বিক্রয় হচ্ছে ২০৫ টাকা কেজি দরে। কক মুরগির কেজিও ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়। এর বাইরে ২০ টাকা বেড়েছে সোনালি মুরগির দাম। নগরে ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে সোনালি মুরগি। আর ৬০০ টাকা কেজি দরে দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে।
বাড়তি দাম গরুর মাংসেরও। ৭৫০ থেকে ৯৫০ টাকা কেজি দরে পণ্যটি বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। মাছের মধ্যে তেলাপিয়া ১৮০-২২০, ছোট সাইজের পাঙাশ ১৭০ থেকে ১৮০ ও বড় সাইজ ২০০ থেকে ২২০ টাকা। পাবদা ৩২০-৩৫০, রুই ৩০০-৩২০, কাতল ৩০০, পোয়া ২৬০, লইট্টা ১৩০-১৭০ এবং মৃগেল ২২০-২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
অস্বস্তি বাড়ছে চালে
চট্টগ্রাম মহানগরের পাইকারি চালের বাজার পাহাড়তলী ও কর্নেলহাটে সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়ে মোটা চাল ৫৪-৫৫, পাইজাম ৫৫-৫৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিআর-২৮ বা মাঝারি চাল কেজিতে ৩-৪ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬৪-৬৫ টাকায়। সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে চিকন চালের; সপ্তাহের ব্যবধানে ৫ টাকা বেড়ে ৮৪ টাকা হয়েছে। উচ্চাভিলাষী চাল হিসেবে খ্যাত কাটারি ও নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৯১-৯৫ টাকা পর্যন্ত।
কড়া কথায়ও কাজ হয়নি তেলে
সরকারের কঠোর হুঁশিয়ারি ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কড়া নজরদারিতেও বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সয়াবিন তেল। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের বোতলের গায়ে ১৭৫ টাকা সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য থাকলেও তা বিক্রি হচ্ছে ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকায়।
দুই লিটার বোতল ৩৫২ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা থাকলেও কিনতে হচ্ছে ৩৬৫-৩৭০ টাকায়। একইভাবে পাঁচ লিটারের তেল বিক্রি হচ্ছে ৮৮০ থেকে ৯০০ টাকায়। যা ২৮ থেকে ৪৮ টাকা বেশি। আর খোলা বাজারে সয়াবিন তেলের দাম ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও তা পাওয়া এখন লটারিতে পুরস্কার জেতার মতো।
প্রশাসন ঢিল দেওয়ায় বাজার অশান্ত
চট্টগ্রামের অলংকার বাজারে শাহরিয়ার নামে একজন ক্রেতা বলেন, সবাই ব্যবসা করতে চায়। কিন্তু চাল-তেল নিয়ে বাজারের ব্যবসায়ীরা ভাবছে মানুষের ওপর জুলুম করা টাকা দিয়ে তারা বেহেশতে যাবে। প্রশাসন যদি ঢিল দেয়, বাজার এরকম অশান্ত থাকবেই।
নগরীর বহদ্দরহাটে জাহাঙ্গীর আলম নামে এক ক্রেতা বলেন, আমরাও ব্যবসা করি। আমাদের দোকানে দোকানে প্রশাসন অভিযান চালায়। সব দোকানে চালান দেখাতে হয়। আমাদের মতো বিলাসী পণ্যের দোকানের জন্য যদি এত আইন থাকে; নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানে থাকবে না কেন?
তৌহিদুল ইসলাম নামে এক ক্রেতার সঙ্গে কথা হয় নগরীর কর্নেলহাট বাজারে। তিনি বলেন, এবার সবজির দাম নিয়ে মানুষ সন্তুষ্ট। কিন্তু চাল-তেলের দাম কমাতে ব্যর্থ হলে বুঝতে হবে দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। তাই সরকারকে কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।
বেশি দাম বলতে লজ্জা লাগে বিক্রেতার
চট্টগ্রামের উত্তর কাট্টলী এলাকার দোকানি উজ্জ্বল দাস বলেন, আমরা খুচরা ব্যবসায়ী। আমাদেরটা হলো দুই থেকে পাঁচ টাকার ব্যবসা। আমরা কমে পেলে কমে বিক্রি করতে চাই। পাড়া প্রতিবেশীদের বেশি দাম বলতেও লজ্জা লাগে আমাদের। এছাড়া আমাদের কাস্টমার ধরে রাখতে হয়। কোনো দোকানে এক-দুই টাকা কম পেলেও কাস্টমার চলে যায়। বড় বড় ব্যবসায়ীদের না দমালে বাজার ঠিক রাখা সম্ভব হবে না।
নজরদারি বাড়াবে ভোক্তা অধিকার
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য মন্ত্রণালয়ের কড়া নির্দেশনা আছে। আমরাও নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছি। খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীর পাশাপাশি উৎপাদক পর্যায়েও আমরা অভিযান চালাচ্ছি। প্রয়োজনে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।
আইকে/এফএ