রোববার, ২১ এপ্রিল, ২০২৪, ঢাকা

ইসরায়েলি বর্বরতার চূড়ান্ত রূপ দেখেছে বিশ্ব

আবুল কাশেম
প্রকাশিত: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৯:৫৬ এএম

শেয়ার করুন:

ইসরায়েলি বর্বরতার চূড়ান্ত রূপ দেখেছে বিশ্ব
বিধ্বস্ত গাজা। ছবি: এএফপি

৭ অক্টোবর, ২০২৩, শনিবার। সকাল সাড়ে ৬টা। গাজা থেকে ইসরায়েলের সীমান্ত শহরগুলোতে একযোগে হামলা চালায় হামাসসহ অন্তত পাঁচটি সশস্ত্র ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী। আক্রমণের মুখে ঘুম ঘুম চোখে প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত ছিল ইসরায়েলি নিরাপত্তাবাহিনী। এতদিন ধরে চলে আসা নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতেই ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’ পরিচালনা করে হামাস।

সকাল শেষ হতেই বিশ্ব মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। হামাস জানায়, মাত্র ২০ মিনিটে ইসরায়েলে নিক্ষেপ করা হয়েছে ৫ হাজার রকেট। আর ইসরায়েল স্বীকার করে অন্তত ৩ হাজার রকেট ছোড়া হয়েছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা বলয় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বলে মনে করা হতো। কিন্তু চারদিক থেকে অবরুদ্ধ গাজার একটি বাহিনীর এমন হামলায় ভীত হয়ে যায় তারা।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন: হামাসের শক্তি দেখে অবাক সেনারা: ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞ

ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামাসের ওইদিনের নজিরবিহীন হামলায় ১৪০০ জন নিহত হয়েছে বলে ইসরায়েল প্রথমে জানিয়েছিল। পরে নিহতের সংখ্যা ১২০০ বলে জানায় তারা। এখন হিসাব আরও সংশোধন করে ওই হামলায় নিহতের সংখ্যা ১১৪৭ জন আর আহত ৮৭৩০ বলে জানিয়েছে।

নিহদের মধ্যে বেশিরভাগ বেসামরিক হিসেবে ইসরায়েল উল্লেখ করলেও হামাস জানিয়েছে, তাদের হাতে নিহত ইসরায়েলিদের সবাই নিরাপত্তাকর্মী। আর সাধারণ মানুষদের ইসরায়েলি বাহিনীই হত্যা করেছে।

হঠাৎ এমন আক্রমণে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে ইসরায়েল সরকার। কোনদিকে কী হচ্ছে, কীভাবে এমনটি ঘটেছে, ইসরায়েলি বাহিনীই বা কি করবে— কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি তারা। হামাসের এই হামলা ঠেকাতে মোসাদসহ সব গোয়েন্দা বাহিনী যে ব্যর্থ তা স্বীকার করে ইসরায়েল। কয়েক ঘণ্টা পর গাজায় পাল্টা হামলা শুরু করে ইসরায়েল।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন: উত্তর গাজায় ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে ৭০ শতাংশ ইসরায়েলি সেনা!

৭ অক্টোবর থেকে কার্যত গাজার বেশিরভাগ এলাকা গুড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। স্থল, আকাশ ও জলপথে তীব্র আক্রমণ করছে দখলদার ইসরায়েল। এখন পর্যন্ত গাজায় ২০ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। বলা বাহুল্য, তাদের প্রায় সবাই বেসামরিক ফিলিস্তিনি। নিহতদের মধ্যে ৮ হাজারের বেশি শিশু এবং বাকিদের বেশিরভাগই নারী।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজার সম্ভাব্য ২৪ লাখ মানুষের বেশিরভাগই বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সর্বাত্মক অবরোধের কারণে লাখ লাখ মানুষ নানামুখী সংকটের মুখোমুখী হয়েছে। খাবার নেই, পানি নেই। তীব্র শীতে সামান্য বাসস্থানটুকুও নেই। যেটুকু সাহায্য মিশরের রাফাহ ক্রসিং দিয়ে প্রবেশ করছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

gaza1
ছবি: এএফপি

ইসরায়েলের নাকের ডগায় হয়েছিল হামাসের মহড়া

বিবিসি নিউজের বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর প্রাণঘাতি হামলায় হামাসের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল পাঁচটি সশস্ত্র ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী। ২০২০ সাল থেকে সামরিক মহড়ায় একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরই তারা এই হামলা চালায়।

এই গোষ্ঠীগুলি গাজায় যে যৌথ মহড়া চালিয়েছিল তার সঙ্গে ইসরায়েলের উপর প্রাণঘাতী হামলার সময় ব্যবহৃত কৌশলের সাদৃশ্য রয়েছে।

আরও পড়ুন: হামাসের শীর্ষ নেতা কারা, শিক্ষাগত যোগ্যতা কতটুকু?

তারা এসব মহড়া চালিয়েছিল এমন স্থানে যেখান থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে ‘সীমানার’ দূরত্ব এক কিলোমিটারেরও কম এবং এই ভিডিও তারা সমাজমাধ্যমেও পোস্ট করে।

এই মহড়ার সময় জিম্মিদের কীভাবে নিজেদের হেফাজতে নেওয়া হবে, কম্পাউন্ডে হামলা চালানোর কৌশল এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা-সহ একাধিক বিষয় তারা অনুশীলন করে। তাদের শেষ মহড়াটি হয়েছিল ৭ অক্টোবরের হামলার মাত্র ২৫ দিন আগে।

gaza3_afp
গাজায় ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। ছবি: এএফপি

 

গাজায় রেকর্ড পরিমাণ বোমা ফেলেছে ইসরায়েল

গাজায় যুদ্ধের প্রথম মাসে ইসরায়েল শত শত বিশালাকার বোমা ফেলেছে। যার অনেকগুলোই বিস্ফোরণস্থল থেকে এক হাজার ফুটেরও বেশি দূরত্বে মানুষ হত্যা বা আহত করতে সক্ষম। সিএনএন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থা ‘সিনথেটাইক’ যুদ্ধের প্রারম্ভিক দিনগুলোর স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানিয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে তারা গাজায় এ পর্যন্ত ১২ মিটার (৪০ ফুট) ব্যাসের ৫০০টিরও বেশি ইমপ্যাক্ট ক্রেটার বা বোমার আঘাতে তৈরি গর্ত দেখতে পায়। যেগুলো সাধারণত দুই হাজার পাউন্ড ওজনের বোমার আঘাতে সৃষ্টি।

আরও পড়ুন: মাটির নিচে ‘অন্য জগৎ’, কতটা বিস্তৃত হামাসের টানেল?

প্রাণঘাতি এই বোমাগুলো ৩৬৫ মিটার (এক হাজার ১৯৮ ফুট) ব্যাসার্ধ পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম। যা ৫৮টি ফুটবল মাঠের সমান। এই বোমাগুলো আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় ইরাকের মসুলে যুক্তরাষ্ট্রের ফেলা বৃহত্তম বোমাটির চেয়েও চারগুণ বড়।

গাজায় ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর জন্য ইসরায়েলের দুই হাজার পাউন্ড ওজনের বোমার মতো ভারী অস্ত্রশস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহারকে দায়ী করছেন অস্ত্র ও যুদ্ধ বিশেষজ্ঞরা।

‘সিআইভিআইসি’র অ্যাডভোকেসি এবং লিগ্যাল ফেলো জন চ্যাপেল বলেন, গাজার মতো এরকম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দুই হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা ব্যবহারের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কয়েক যুগ লেগে যাবে।

আরও পড়ুন: হামাসকে কি সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব?

যুদ্ধের ষষ্ঠ দিনে ইসরায়েলের বিমান বাহিনী এক্সে (সাবেক টুইটার) জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা গাজায় ছয় হাজার বোমা ফেলেছে। অর্থাৎ দিনে গড়ে এক হাজার বোমা ফেলা হয়। পরবর্তীতে ১০ ডিসেম্বর ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানায় যে, তারা গাজার ২২ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে।

এক প্রতিবেদনে এপি জানিয়েছে, মাত্র দুই মাসের সামান্য বেশি সময়ে এই আক্রমণ যতখানি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, সেটি ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সিরিয়ার আলেপ্পো, ইউক্রেনের মারিউপল কিংবা সেই অনুপাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির উপর মিত্রবাহিনীর বোমাবর্ষণকেও ছাড়িয়ে গেছে।

gaza3_aj
গাজায় বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ মানুষ। ছবি: আল জাজিরা

সরাসরি জড়িত যুক্তরাষ্ট্র!

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দফতরের (ওএইচসিএইচআর) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কার্যালয়ের পরিচালক ক্রেইগ মোখিবার। ক্রেইগ মোখিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের বেশিরভাগ অংশকে ‘ভয়াবহ হামলার সাথে পুরোপুরি জড়িত’ বলে অভিযোগ করেছেন।

পদত্যাগপত্রে মোখিবার লেখেন, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় এখন যা চলছে তা পরিষ্কারভাবে গণহত্যা, যাকে আমরা বলতে পারি ‘টেক্সটবুক কেস অব জেনোসাইড’। এ ব্যাপারে সংশয়ে ভোগার কোনো কারণ বা সুযোগ আর কারও নেই। আমাদের চোখের সামনে প্রতিদিন শত শত ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার অপ্রতিরোধ্য শক্তি দিয়ে জাতিসংঘকে ঘিরে ধরেছে এবং তার প্রভাবে ইসরায়েলি লবি ব্যাপক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন: অবরুদ্ধ গাজা কত বড়, কীভাবে জীবন কাটে ফিলিস্তিনিদের?

পদত্যাগপত্রে মোখিবার আরও লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এই ভয়ঙ্কর গণহত্যাকে অকুণ্ঠভাবে সমর্থন করছে। তারা ইসরায়েলকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক, গোয়েন্দা তথ্য এক কথায় সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে। পশ্চিমা কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমগুলো এমনভাবে সংবাদ প্রকাশ করছে, যাতে এ পুরো প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়।

তিনি আরও লেখেন, এই গণহত্যার পর কী হবে, তা আমরা অনুমান করতে পারছি। সেখানে জাতিগত ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদী বসতি স্থাপনকারীরা পুনর্বাসন করার যে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে ইসরায়েল, তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে।

আরও পড়ুন: মন চাইলেই ফিলিস্তিনিদের বন্দী করছে ইসরায়েল, বাদ যাচ্ছে না শিশুও!

এর আগে এক্স-এ করা পোস্টে তিনি বলেন, কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা সরকার যেভাবে ইসরায়েলকে ছাড় দিয়ে যাচ্ছে, তারই ফলাফল এই গণহত্যা।

gaza4_ap
গাজায় মানবতার সংকট ভয়াবহ। ছবি: এপি

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাস

যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তা বাড়াতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ‘গাজা প্রস্তাব’ পাস করা হয়েছে। শুক্রবার (২২ ডিসেম্বর) প্রস্তাবটি পাস হয়। জাতিসংঘের ১৫ সদস্য বিশিষ্ট নিরাপত্তা পরিষদে এই দীর্ঘ বিলম্বিত প্রস্তাবটির পক্ষে ১৩ ভোট পড়ে। বিপক্ষে কোনো ভোট পড়েনি তবে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া ভোট দানে বিরত ছিল।

এই ভোটের কিছুদিন আগে রাশিয়া একটি সংশোধনী প্রস্তাব দিয়েছিল যাতে অবিলম্বে এই যুদ্ধ থামানোর আহ্বান জানানো হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ওই প্রস্তাবে ভেটো দেয়। প্রস্তাবের পক্ষে ছিল দশটি দেশ, বিপক্ষে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। চারটি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। এর আগেও গাজায় যুদ্ধবিরতির একাধিক প্রস্তাব আটকে দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

আরও পড়ুন: হামাসের জনপ্রিয়তা বেড়েছে: মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষণ

চূড়ান্ত ভোটে যুক্তরাষ্ট্র বিরত থাকায় ইসরায়েলের অভ্যন্তরে গাজার আকস্মিক আক্রমণের পর গাজা বিষয়ক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় আমেরিকান ভেটো এড়ানো সম্ভব হয়েছে। প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার পর স্বস্তি প্রকাশ করে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের দূত লিন্ডা টমাস-গ্রীনফিল্ড বলেন, ‘এটা কঠিন বিষয় ছিল, কিন্তু আমরা সেটা করতে পেরেছি।’

তিনি বলেন এই ভোটের ফলে ‘গাজায় মানবিক সংকট লাঘব করা, সেখানে জীবন রক্ষাকারী সহযোগিতা প্রদান করা, গাজা থেকে জিম্মিদের ছাড়িয়ে আনা, নির্দোষ বেসামরিক লোকজন ও মানবিক কর্মীদের সুরক্ষা প্রদান এবং স্থায়ী শান্তির জন্য কাজ করা সম্ভব হবে।’

আরও পড়ুন: হুথিদের হামলার ভয়ে শিপিং কোম্পানিগুলো এখন কী করছে?

তবে নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া প্রস্তাবে গাজায় সহিংসতা বন্ধের কোনো আহ্বান জানানো হয়নি। কারণ সেখানে যুদ্ধবিরতি হলে হামাস আরও শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ পাবে বলে দাবি যুক্তরাষ্ট্রের। তাই এই প্রস্তাব পাস হলেও এটি কতটা ভূমিকা রাখবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

gaza5_ana
ইসরায়েলের চূড়ান্ত বর্বরতা গাজায়। ছবি: আনাদুলু

স্থল অভিযান ব্যর্থ ইসরায়েল

গাজায় হামাসকে নির্মূলে স্থল অভিযান পরিচালনা করছে ইসরায়েল। তবে সেখানে তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা না থাকায় এই অভিযানকে ব্যর্থ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞরা। ইসরায়েলি সামরিক বিশ্লেষক ইয়োভ জিতুন এক নিবন্ধে লিখেছেন যে, হামাসের শক্তি দেখে অবাক হচ্ছে ইসরায়েলি সেনারা।

তিনি লিখেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বুঝতে পেরেছে যে, গাজা উপত্যকায় হামাসকে নির্মূল করা সহজ নয়। ভূমিতে হামাস কতটা শক্তিশালী তা দেখে অবাক হচ্ছে ইসরায়েলি সেনারা। এটি একটি সত্যিকারের সেনাবাহিনী। যা গত বছরগুলোতে তেলআবিবের নাকের ডগায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আরও পড়ুন: হামাস ও পুতিনকে জিততে দেব না: বাইডেন

গাজায় অসংখ্য ইসরায়েলি সৈন্য নিহত হলেও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মিথ্যা বলছেন বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার ল্যাপিড। তিনি বলেন, এখনও নেতানিয়াহু মিথ্যা বলে যাচ্ছেন, যখন ভয়াবহ একটি যুদ্ধে ইসরায়েলি সৈন্যরা প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন।

ইসরায়েলের ওয়াই-নেট নিউজ ওয়েবসাইট বলেছে, গাজার ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা কমপক্ষে পাঁচ হাজার ইসরায়েলি সৈন্যকে আহত করেছে। তাদের মধ্যে অনেকে মারাত্মক আহত হয়ে অক্ষম হয়ে গেছেন।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পুনর্বাসন বিভাগের প্রধান লিমোর লুরিয়া বলেছেন, ‘আমি কখনই এমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি। আমরা যে সব ইসরায়েলি সেনাকে গাজা থেকে আহত অবস্থায় ইসরায়েলে নিয়ে আসি, তাদের ৫৮ শতাংশের বেশির হাত ও পায়ে গুরুতর আঘাত রয়েছে। এসব সেনার হাত-পা কেটে ফেলতে হতে পারে।’

আরও পড়ুন: ‘উত্তর গাজাকে আবর্জনার স্তূপে পরিণত করেছে ইসরায়েল’

গাজায় স্থল অভিযানে অংশ নিয়ে এরই মধ্যে শতাধিক ইসরায়েলি সেনা প্রাণ হারিয়েছে। হামাসকে কোণঠাসা করতে তাদের টানেলে সাগরের পানি ঢুকাচ্ছে ইসরায়েল। তবে সেটি কতটা কাজে দেবে সে বিষয়টি নিশ্চিত নয়। এমনকি এই বিষয়ে হামাসের ক্ষতি হওয়ার তেমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

কতদিন গাজায় অভিযান চালানো হবে এ বিষয়ে ইসরায়েল জানিয়েছে যে, তাদের ধারণা গাজায় হামাসকে নির্মূল করতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে। সুড়ঙ্গে পানি ঢোকানোর ফলে হামাস নেতারা সুড়ঙ্গ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবেন বলে তাদের ধারণা।

gaza_ana
গাজায় রেকর্ড বোমা ফেলেছে ইসরায়েল। ছবি: আনাদুলু

গাজা-যুদ্ধ কি বদলে দিচ্ছে আঞ্চলিক রাজনীতি?

এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো- বিশেষত উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোকে তাদের শাসন ব্যবস্থার প্রতি পশ্চিমাদের সমর্থন ধরে রাখার পাশাপাশি, ইসরায়েলি বর্বরতার বিরুদ্ধে নিজ নাগরিকদের ক্ষোভ প্রশমন করে ভারসাম্য রক্ষা করে চলাকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে।

গত ১১ নভেম্বর সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত হয় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ নিয়ে জরুরি আরব-ইসলামী যৌথ সম্মেলন। শনিবার সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান জানিয়েছেন, এই সম্মেলনের একটি প্রতিনিধি দল বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের রাজধানীতে গিয়ে গাজায় একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পক্ষে কথা বলবে। সেই পদ্ধতি যে খুব একটা কাজে আসেনি তা পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে।

আরব দেশগুলো গাজার বিরুদ্ধে পরিচালিত ইসরায়েলি যুদ্ধকে নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিলেও – ইতোমধ্যেই যেসব দেশ ইসরায়েলের সাথে শান্তিচুক্তি করেছে– নতুন এ সম্পর্ক রক্ষার বিষয়েও তারা সতর্ক থাকছে।

আরও পড়ুন: এক চোখ, পা হারানো দেইফেই আতঙ্কিত ইসরায়েল!

প্রভাবশালী ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাংক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা প্রোগ্রামের সহযোগী ফেলো এলহাম ফাখরো বলেন, ‘ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আলোচনা বন্ধ করে সৌদি আরব তুলনামূলক শক্ত অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু, অন্যান্য যেসব আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে তারা এটি ঝুঁকিগ্রস্ত করতে চাইছে না।’

সৌদি আরব বিভিন্ন দেশকে ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইসরায়েলের এমন নিঃশর্ত সমর্থন– মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আরব শাসকদের সাথে এক পর্যায়ে দূরত্ব তৈরি করবে।

আরও পড়ুন: ১০ ছেলে থাকলে সবাইকে পাঠাতাম, নিহত ফিলিস্তিনি যুবকের মা

ফিলিস্তিনি নীতি নেটওয়ার্ক আল-শাবাকার মার্কিন নীতি বিশেষজ্ঞ তারিক কেনি শাওয়া বলেন, পূর্ব ও পশ্চিমা বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ চলার আজকের দিনের বাস্তবতায় এই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সম্ভাবনা আছে, অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ এসব দেশের সাথে অংশীদারত্ব তৈরি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত মিত্রদের। 

তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের গণহত্যাকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব কতোটা আগ্রহের সাথে সমর্থন দিচ্ছে সেটা প্রত্যক্ষ করছেন আরব নেতারা এবং আরব জনতা। জাতভাই আরবদের প্রতি এই বর্বরতা তাদের চীনের সাথে সম্পর্কোয়নের দিকে ঠেলে দেবে।’

সূত্র: বিবিসি, সিএনএন, আল জাজিরা, টাইম অব ইসরায়েল, আনাদুলু।

একে

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর