‘স্বাস্থ্যখাতে অর্জন থাকলেও উন্নতি সন্তোষজনক নয়’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২ এপ্রিল ২০২২, ০৪:০৫ পিএম
‘স্বাস্থ্যখাতে অর্জন থাকলেও উন্নতি সন্তোষজনক নয়’

স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের স্বাস্থ্যখাতে অনেক অর্জন থাকলেও উন্নতি সন্তোষজনক নয় বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা। এই খাতে উন্নয়ন করার মতো অনেক জায়গা রয়েছে জানিয়ে তারা বরাদ্দ আরও বাড়ানোর তাগিদ দেন।

আজ শনিবার (২ এপ্রিল) রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ আয়োজিত 'স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর: বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বিকাশ' শীর্ষক প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আলোচকরা এসব কথা বলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান বলেন, ‘স্বাস্থ্যখাত পাকিস্তান সময়ে সবচেয়ে অবহেলিত ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতে কিছুটা উন্নতি হলেও সামগ্রিকভাবে তা সন্তোষজনক নয়। আমাদের এ খাতে বরাদ্দ খুবই কম। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের বরাদ্দ লজ্জাজনক। ফলে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে দক্ষ চিকিৎসক থাকলেও পরিবেশগত সমস্যা আছে। অপরদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে উন্নত পরিবেশ থাকলেও সেবা মূল্য অনেক। এটি দূর করতে না পারলে দেশের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে।’

এসময় তিনি দেশের স্বাস্থ্যখাতের তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করায় আইসিসিডিডিআর’বি, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন এনজিওর প্রশংসা করেন।

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক বলেন, ‘স্বাস্থ্যখাতে আমরা উন্নতি করেছি। আমাদের কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে স্পেশালাইজড হাসপাতাল রয়েছে। অটিজমের বিষয়ে একসময় দেশের মানুষ জানতোই না, কিন্তু এখন বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে এ দিবস পালন করা হচ্ছে। এর কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদের। এটাই স্বাস্থ্যখাতের অগ্রগতি। তবে এখনও অনেক সমস্যা আছে, সেগুলো পার করে হবে।’

স্বাস্থ্যখাতে বরদ্দ বাড়ানো তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই খাতে আমাদের বরাদ্দ জিডিপির দশমিক ৭ ভাগ। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী শতকরা ৫/৬ ভাগ থাকা উচিত। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও এর পরিমাণ বেশি। আমাদের এ দিকটাতে আরও নজর দেওয়া প্রয়োজন। এত কিছুর পরেও আমরা স্বাস্থ্যে অনেক অগ্রগতি সাধন করেছি। করোনাকালে আমরা সব প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে করোনা নিয়ন্ত্রণে এনেছি। আমরা শতকরা ৭০ শতাংশের অধিক মানুষকে টিকা দিয়েছি। সম্প্রতি ল্যানসেট সাময়িকীতে এর প্রশংসা করা হয়েছে। তবে আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে।’

সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সেবা খাতকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জেলাভিত্তিক সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে। বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে অসংখ্য রোগী ভর্তি আছে, যাদের চিকিৎসা জেলা শহরেই সম্ভব। যদি হাসপাতালগুলো পরিষ্কার করা যায়, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নার্সসহ জনবল যদি দিতে পারি তাহলে সেবার মান বাড়বে। রেফারেল সিস্টেম চালু করা খুবই জরুরি। তাছাড়া আসলে এসব সমস্যা সমাধান করা কঠিন। একজন ডিজি রাজধানীতে বসে হাসপাতালগুলো পরিচালনা করবেন, এটা আসলেই সম্ভব নয়।’

দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘বইটিতে স্বাস্থ্যখাতের নানা সাফল্যের পাশাপাশি এর সমস্যা ও প্রতিকারের উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যে মোট ব্যয়ের ১৫ শতাংশ হওয়া দরকার, কিন্তু সেটিতে আমরা একেবারে পিছিয়ে। ফলে সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। আবার হাসপাতালগুলোতে নানা অব্যবস্থাপনা। অনেক দামি দামি জিনিসপত্র কেনা হয়, কিন্তু সেগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না। আছে নিয়োগে অনিয়ম। তারপরও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে দেশের স্বাস্থ্যখাত অনেক এগিয়েছে।’

মতিউর রহমান বলেন, ‘করোনাকালে আমরা খুবই দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। আমাদের অক্সিজেন, আইসিইউ, ভেন্টিলেটরসহ বিভিন্ন দিকে ঘাটতি ছিল। আমরা স্বল্প সময়ে তা মোকাবিলা করে সেবা চালিয়েছি। তবে এ ধারা যেন অব্যাহত থাকে, যন্ত্রপাতিগুলো যেন সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় সে দিকে মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের দেশে প্রয়োজনের সময় কোটি কোটি টাকা দিয়ে যন্ত্রপাতি কেনা হয়। প্রয়োজন শেষে তা বারান্দায় পড়ে থাকে। ফলে আবার প্রয়োজন পড়লে তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। এটি যেন না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক নার্সদের আচরণজনিত অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যায় এদিকে নজর দিতে হবে।’

সিপিডির সম্মানিত ফেলো ও বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের উপদেষ্টা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. রওনক জাহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিডার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ডা. জহিরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের আহ্বায়ক আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী।

এমএইচ/জেবি