শীতের শুরুতেই নিউমোনিয়ার প্রকোপ, হাসপাতালে বাড়ছে ভিড়

প্রকাশিত: ১৯ নভেম্বর ২০২২, ১১:১৫ পিএম
শীতের শুরুতেই নিউমোনিয়ার প্রকোপ, হাসপাতালে বাড়ছে ভিড়

গাজীপুরের আব্দুল হাকিম। ৩০ দিন আগে ছেলে সন্তানের বাবা হয়েছেন। পরিবারে খুশির রেশ না কাটেতেই হঠাৎ বৃহস্পতিবার সকালে তার শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। আনন্দের ঘরে যেন বিষাদের ছায়া নেমে আসে। শিশুটির শরীরে তীব্র জ্বর। কিছুক্ষণ পর শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। দ্রুত জেলা শহরের এক চিকিৎসকের চেম্বারে নেন শিশুটিকে। কিন্তু চিকিৎসক তাকে ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। দেরি না করে ছুটে আসেন ঢাকায়। বৃহস্পতিবার সাতসকালে অসুস্থ শিশুটিকে ভর্তি করেন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে। ভর্তির পরপরই দেয়া হয় অক্সিজেন। পরে চিকিৎসকের জানতে পারেন, তার শিশুসন্তান নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। সঠিক সময়ে না আনা হলে বাঁচানো কঠিন হতো। এখনও শিশুটির চিকিৎসা চলছে।

দিনাজপুরের নাসরিন আক্তারের স্বামী ঢাকায় চাকরি করেন। গ্রামে দুই সন্তানকে নিয়ে একাই থাকেন তিনি। গত মঙ্গলবার হঠাৎ তার সাত বছরের কন্যাশিশু রাহা অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। দ্রুত তিনি মেয়েকে নিয়ে ছুটেন জেলা শহরে। ভর্তি করেন একটি প্রাইভেট হাসপাতালে। পরে চিকিৎসকের কাছে জানতে পারেন তার মেয়ে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত।

শুধু আব্দুল ও নাসরিনের সন্তানই নয়, শীতের শুরুতেই শীতজনিত রোগ ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। গত এক সপ্তাহে ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়াও দেশের জেলা সদর ও প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে কয়েক হাজার শিশু ও নবজাতককে ভর্তি করা হয়েছে। এদের অনেকেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত।

চিকিৎসকরা বলছেন, এ বছর বেশি হারে রোগী ভর্তি হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে নির্দিষ্ট সিটে কুলানো যাচ্ছে না। ফলে একই বেডে দুইটি, এমনকি তিনটি করে শিশুকে রেখেও চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এতে হিমশিম খাচ্ছেন নার্স ও চিকিৎসকরা।

তারা আরও বলছেন, এবার ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। বিশেষ করে নবজাতক ও দুই থেকে তিন বছর বয়সী শিশুর সংখ্যাই বেশি।

ঢাকার হাসপাতালগুলোতে এখন প্রতিদিন ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রথম দিকে জ্বর আসছে। এরপর শুরু হচ্ছে বমি ও পাতলা পায়খানা। এরই মধ্যে কয়েকজন শিশু মারা গেছে বলেও জানা গেছে। যদিও তা সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করছেন না।

Hospitalসরেজমিন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাসপাতালগুলোতে এসব রোগে আক্রান্ত রোগী তেমন আসছে না। কিন্তু বিকেল হলেই বাড়ছে ভিড়। অভিভাবকরা বিশেষ করে মা ও বাবারা সন্তানদের নিয়ে ছুটছেন জরুরি বিভাগে।

ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোর পাশাপাশি বরিশাল, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, নোয়াখালী ও টাঙ্গাইল থেকে থেকে রোগী আসছে। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোতে ভিড় বাড়ছে। বিশেষ করে রাত ১২টার পর জরুরি বিভাগ থেকে শিশু ওয়ার্ডে মা, বাবা ও স্বজনদের ছোটাছুটি শুরু হচ্ছে। এতে চিকিৎসক ও নার্সরাও চিকিৎসা সেবা দিতে হিমসিম খাচ্ছেন।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, গত এক সপ্তাহে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। এই হাসপাতালের ৩১৩ ও ৩১৪ নম্বর ওয়ার্ডে কম বেশি প্রতিটি বেডে ডাবল করে রাখা হয়েছে আক্রান্ত শিশুদের। এছাড়াও ডায়রিয়া আক্রান্তদের আলাদাভাবে রাখা হচ্ছে। তারপরও কুলাতে পারছেন না চিকিৎসকরা।

Hospitalময়মনসিংহের ফুলবাড়ি উপজেলা থেকে এসেছেন লাল মিয়া। তার ছেলের ৩ মাস বয়সী শিশুটির হঠাৎ করে জ্বর শুরু হয়। দুইদিন পরই শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। স্থানীয় এক চিকিৎসকের পরামর্শে তিনিও ছুটে এসেছেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে। টানা দুই দিন তার নাতনি সোহানাকে অক্সিজেন দিয়ে রাখতে হয়েছিল। আজ শিশুটি অনেকটা সুস্থ। তবে নাতনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল বলে জানালেন তিনি।

মিরপুরের গৃহিনী রোকসানা আক্তার। দুই দিন ধরে তার মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরছেন। কিন্তু সিট পাচ্ছেন না। অবশেষে সোহরাওয়ার্দীতে ভর্তি করালেও তাকে ডাবল সিটে দেয়া হয়। রোকসানা জানালেন, গত ১৫ নভেম্বর থেকে তার মেয়ের পাতলা পায়খানা শুরু হয়। সাথে ছিল বমিও। প্রথম দিকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু পরে তা বেড়ে চললে ছুটে যান শিশু হাসপাতালে। সেখানে সিট না পেয়ে আরও কয়েক হাসপাতাল গেছেন। কিন্তু কোথাও ভর্তি করাতে পারেননি। অবশেষে এখানে এনেছেন।

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী ও শিশু হাসপাতালে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া আক্রান্ত বেশি শিশু ভর্তি হয়েছে। যদিও চিকিৎসকরা এ নিয়ে মুখ খুলছে না। তবে নার্সরা জানিয়েছেন, তাদের এখন ডিউটি বাড়ছে। ঢাকার আশপাশের নার্সিং কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের কাজের জন্য আনা হচ্ছে।

এ বিষয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক খলিলুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রতি বছরই শীতের শুরুতে ঠাণ্ডা সর্দি-জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। ফলে হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীর চাপ কিছুটা বেড়েছে। একইসঙ্গে নিউমোনিয়াসহ ঠাণ্ডাজনিত বিভিন্ন রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যাও বেড়েছে। গত অক্টোবরে আমাদের এখানে ৫১ জন ভর্তি হয়েছিল। আর চলতি মাসের ১৯ দিনেই ৭৩ জন নিউমোনিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক রোগীই শিশু।

Hospitalপ্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যত রোগীই আসুক আমরা কাউকে ফেরত পাঠাই না। এক্ষেত্রেও সবাইকেই ভর্তি ও চিকিৎসা দেওয়া হবে। সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত।

তবে এটাকে প্রাদুর্ভাব বলতে নারাজ শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, শীতের শুরুতে জ্বর-সর্দি-কাশি বাড়াটা স্বাভাবিক। পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের ঘটনাও বাড়ে। এ বছরও তাই হয়েছে। তবে এটাকে সেইভাবে প্রাদুর্ভাব বলা যায় না। শিশুরা নিউমোনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়। ফলে আমাদের এখানে নিউমোনিয়া নিয়ে রোগী কিছুটা বেড়েছে। তবে আমাদের চিকিৎসা দিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমাদের সকল প্রস্তুতি আছে। আশা করি সামনেও সমস্যা হবে না।

এমআইকে/এমএইচ/জেএম/আইএইচ