ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ। আর মুসলমানদের পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঘুরতে পারেন হিমালয় কন্যাখ্যাত উত্তরের প্রবেশদ্বার পঞ্চগড়ের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে। ঈদের ছুটিতে যেতে পারেন পঞ্চগড়ের এই দর্শনীয় স্থানগুলোতে।
জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরত্ব তেঁতুলিয়ার। এই তেঁতুলিয়া উপজেলাতেই আছে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনাময় স্থলবন্দর বাংলাবান্ধা। নিত্যদিন বাংলাবান্ধার জিরো পয়েন্ট (শূন্যরেখা) দেখতে ভিড় লেগে থাকে দর্শনার্থীদের। তেঁতুলিয়া উপজেলা শহরে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত জেলা পরিষদ ডাকবাংলো। এই ডাকবাংলোর পাশ দিয়েই বয়ে গেছে বাংলাদেশ ও ভারতকে বিভক্ত করা মহানন্দা নদী। এই নদীতে শ্রমিকেরা নুড়িপাথর তোলেন।
বিজ্ঞাপন
ডাকবাংলো ও পিকনিক স্পট
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় মহানন্দা নদীর তীরে একটি ঐতিহাসিক ডাকবাংলো রয়েছে এবং তার পাশেই উপজেলা পরিষদ নির্মিত একটি পিকনিক স্পট রয়েছে। জেলা পরিষদ নিয়ন্ত্রিত এই ডাক বাংলোটির নির্মাণ শৈলী অনেকটা ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের। এটি কুচবিহারের রাজা নির্মাণ করেছিলেন বলে জানা যায়। ডাকবাংলো এবং পিকনিক স্পটটি একটি সুউচ্চ গড় বা টিলার উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই এখান থেকে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। উল্লেখ্য পঞ্চগড় বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা। এর প্রায় তিন দিকেই ভারতের সীমানা প্রাচীর বেষ্টিত। অর্থাৎ মহানন্দা নদীর এক পাড়ে বাংলাদেশ আর অন্য পাড়ে ভারতের অবস্থান।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ও সীমান্তের শেষ চিহ্ন ‘জিরোপয়েন্ট’ দেশের অন্যতম চারদেশীয় বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা ইউনিয়নে অবস্থিত। ভারত, নেপাল, ভুটান আর বাংলাদেশ এই চারদেশীয় ব্যবসা-বাণিজ্য আর পর্যটনের অপার সম্ভাবনা তৈরি করেছে বন্দরটি। এ বন্দর হতে নেপালের দূরত্ব মাত্র ৬১ কিলোমিটার, এভারেস্ট শৃঙ্গ ৭৫ কিলোমিটার, ভুটান ৬৪ কিলোমিটার, চীন ২০০ কিলোমিটার, ভারতের দার্জিলিং ৫৪ কিলোমিটার ও শিলিগুড়ি ৮ কিলোমিটার। ২০১৬ এ স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন চালু হওয়ায় প্রতিদিন এ বন্দর দিয়ে যাতায়াত করছে শতশত মানুষ। নিত্যদিন বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্ট দেখতে ভিড় লেগেই রয়েছে পর্যটকদের। এ সীমান্ত দিয়ে নেপাল, ভুটান আর ভারতের দার্জিলিংয়ের পর্যটনস্পটসমূহ দেখতে ভ্রমণ করছে প্রচুর পরিমাণে পর্যটক।
বিজ্ঞাপন
মুক্তাঞ্চল পার্ক
জেলা শহর থেকে তেঁতুলিয়া যাওয়ার পথে সদর উপজেলার অমরখানা এলাকায় পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা মহাসড়কের পাশে চাওয়াই নদের ধারে রয়েছে মুক্তাঞ্চল পার্ক। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধমুক্ত থাকা এই এলাকা মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। স্থানটির স্মৃতি ধরে রাখতে জেলা প্রশাসন সেখানে গড়ে তুলেছে মুক্তাঞ্চল পার্ক। এখানে গেলে পঞ্চগড়ের পাঁচটি গড়ের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন পর্যটকেরা।
সমতলের চা–বাগান
পঞ্চগড়ের অনন্য আরেক দিক হলো এখানকার সমতলের চা–বাগান। দেশে কেবল এখানেই সমতল ভূমিতে চা চাষ করা হয়। জেলার সদর ও তেঁতুলিয়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি দেখা মিলবে চা–বাগানের। এসব চা–বাগানে চা–পাতা তোলার দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। সমতল ভূমির এসব চা–বাগান ঘুরে দিনের একটা সময় কাটিয়ে দিতে পারেন পর্যটকেরা।
পাথর জাদুঘর ‘রক্স মিউজিয়াম
দেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের একটি কক্ষে ১৯৯৭ সালে রকস্ মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠা করেন কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ড. নাজমুল হক। এ মিউজিয়ামে রয়েছে হাজার বছরের নানান আকৃতির পাথরসহ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। প্রত্যেকটি পাথরের পাশে লেখা রয়েছে কোথায় থেকে এবং কারা সংগ্রহ করেছেন এ মূল্যবান প্রত্নসম্পদ। এখানে রয়েছে আগ্নেয় শিলা, পাললিক শিলা, নুড়ি পাথর, সিলিকা নুড়ি ও সিলিকা বালি, হলুদ ও গাঢ় হলুদ বালি, কাঁচবালি, খনিজবালি, লাইমস্টোন, পলি ও কুমোর মাটি এবং কঠিন শিলাসহ আরও অনেক প্রত্নসম্পদ।
মির্জাপুর শাহী মসজিদ
মির্জাপুর শাহী মসজিদটি পঞ্চগড়ের অটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে অবস্থিত। ১৬৫৬ সালে নির্মাণ করা হয় বলে জানা যায়, যা ঢাকার হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত মসজিদের সমসাময়িক। ১৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হাইকোর্ট প্রাঙ্গণের মসজিদ ও মির্জাপুর শাহী মসজিদের নির্মাণ শৈলীতে যথেষ্ট সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। তবে এটি কে নির্মাণ করেছিলেন সে বিষয়ে যথেষ্ট মত পার্থক্য রয়েছে। কেউ বলেন মির্জাপুর গ্রামেরই এক বাসিন্দা এটি নির্মাণ করেছিলেন। আবার কারো মতে দোস্ত মোহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি এটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন। মসজিদটির মধ্যবর্তী দরজার উপরে একটি ফলক রয়েছে, যেখানে ফার্সি ভাষায় এর নির্মাণ সম্পর্কিত তথ্য লেখা আছে। ফলকের ভাষা ও লিপি অনুযায়ী প্রত্নতাত্ত্বিকরা ধারণা করেন, মোঘল সম্রাট শাহ আলমের রাজত্বকালে মসজিদটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদের গায়ে টেরাকোটা ফুল ও লতাপাতার নকশা খোদায় করা আছে, যার একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো সাদৃশ্য নেই। নির্মাণ শৈলীর নিপুণতা, দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য ও তিনটি গম্বুজ এই মসজিদের মূল আকর্ষণ। মসজিদটি এখন বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধিনে রয়েছে। বর্তমানে অনেক দর্শনার্থী এ মসজিদ দেখতে আসেন।
বারো আউলিয়ার মাজার
আটোয়ারী উপজেলার বারো আউলিয়া গ্রামে সুলতানি আমলে ১২ জন আউলিয়ার আগমন ঘটেছিল। এ বারো জন আউলিয়া বর্তমান বারো আউলিয়া গ্রামে দ্বীন প্রচারের কাজ শুরু করেন এবং এখানেই তারা ইন্তেকাল করেন। পরবর্তীতে বারো আউলিয়াগণের সমাধিকে কেন্দ্র করে একটি মাজার গড়ে ওঠে, যা বারো আউলিয়ার মাজার নামে পরিচিত। বারো আউলিয়ার মাজারকে ঘিরে নানা লোক কথা প্রচলিত রয়েছে, যা তাদের অলৌকিক ক্ষমতার প্রকাশ ঘটায়। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার বারো আউলিয়ার মাজার প্রাঙ্গণে ওরসের অয়োজন করা হয়। এই সময় দেশ-বিদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ মাজার জিয়ারতের জন্য ছুটে আসেন।
গোলকধাম মন্দির
গোলকধাম মন্দিরটি দেবীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত শালডাংগা ইউনিয়নের শালডাংগা গ্রামে অবস্থিত একটি প্রাচীন মন্দির। সুন্দর কারুকার্যময় এই মন্দিরটির গায়ের শিলালিপি অনুযায়ী জানা যায়, এটি ১৮৪৬ সালে নির্মাণ করা হয়। মন্দিরটি মূলত গোলক কৃষ্ণ গোস্বামীর স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মাণ করা হয়েছিল। তাই মন্দিরের নামেও তার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। গোলকধাম মন্দিরটি ছয় কোণ বিশিষ্ট একটি স্থাপনা। এর স্থাপত্য কৌশল গ্রিক পদ্ধতির অনুরূপ, যা এখন বিলুপ্ত প্রায়। তাই এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
বদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দির
বদেশ্বরী মন্দিরটি বোদা উপজেলায় অবস্থিত। অনেকে বলেন, এই মন্দিরের বদেশ্বরী নাম থেকেই এই উপজেলার নামকরণ করা হয়েছে। আবার কিছু মানুষের ধারণা, এই অঞ্চলে এক সময় অনেক কাদা হতো আর কাদার সমার্থক শব্দ বোদ থেকেই এসেছে বোদা উপজেলার নাম। হিন্দু পুরাণের স্কন্দ অনুযায়ী, বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের আঘাতে দেবী দুর্গার দেহ ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে দু’টি খণ্ড পড়েছিল বাংলাদেশে; একটি পড়েছিল চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডুতে আর অন্যটি পড়েছিল পঞ্চগড় জেলার বদেশ্বরীতে। সেখানেই চারথশ বা পাঁচথশ বছর পূর্বে একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়। বদেশ্বরীতে অবস্থিত প্রাচীন এই মন্দিরটিই বদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দির। মূলত উপমহাদেশের যেখানে যেখানে দেবী দুর্গার শরীরের খণ্ড পড়েছিল সেই জায়গাটিকে পীঠ বলা হয়। মন্দিরের দেওয়ালে ঝুলানো একটি চার্টে এরকম ৫১টি পীঠ স্থানের উল্লেখ রয়েছে। বদেশ্বরীর এই পীঠে এখনো সংরক্ষিত আছে দেবী দুর্গার গোড়ালি।
ভিতরগড় দুর্গবগরী
ভিতরগড় মধ্য যুগের একটি বিশাল দুর্গনগরী। এটি প্রায় ২৫ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত, যা বাংলাদেশের সব থেকে বড় দুর্গনগরী। এর কিছু অংশ বাংলাদেশের পঞ্চগড়ে আর কিছু অংশ ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত। ভিতরগড় দুর্গের ভেতরে অনেকগুলো প্রত্নস্থল চিহ্নিত করা হয়েছে। এ প্রত্নস্থলসমূহ খালপাড়া, প্রধানপাড়া, ছোট কামাত, চুমানুপাড়া, কমলাপাড়া, সেনপাড়া, পেশকার পাড়া, জমাদার পাড়া, বড় কামাত, মেহনা ভিটা ও সিপাহি পাড়া গ্রামজুড়ে অবস্থিত। এর মধ্যে দীঘি, মন্দির, রাজবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। এছাড়া এখানে বিভিন্ন আসবাবপত্রসহ দেবী মূর্তি পাওয়া গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এর নির্মাণকাল সম্পর্কে অনুমান করেন যে, এটি প্রায় দেড় হাজার বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল।
মহারাজার দীঘি
পঞ্চগড়ের মূল শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে এক সময় পৃথু রাজের রাজপ্রাসাদ ছিল। এর পাশেই এখনো বর্তমান রয়েছে একটি দীঘি, যা মহারাজার দীঘি নামে পরিচিত। রাজা পৃথু এর খননকৃত এই ‘মহারাজার দীঘিটি বিশাল আয়তনের একটি পুকুর বা জলাশয়। পাড়সহ এর আয়তন প্রায় ৮০০*৪০০ গজ। অধিক গভীরতার কারণে দীঘিটির জল অনেক স্বচ্ছ। পৃথু রাজা এক দিন কীচক নামক এক নিম্ন শ্রেণির লোকের দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়। তখন তিনি ধর্ম নাশের ভয়ে উক্ত দীঘিতে আত্মহনন করেছিলেন। প্রতিবছর নববর্ষের সময় ‘মহারাজার দীঘি’র পাড়ে মেলা বসে। উক্ত মেলায় মাঝে মাঝে ভারত থেকেও লোক আসতে দেখা যায়। তবে করোনার কারণ এখন আর মেলা বসে না।
কাঞ্চনজঙ্ঘার দর্শন
বিশেষ করে অক্টোবর ও নভেম্বর মাস এলেই আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে দেখা মেলে হিমালয় পর্বতমালার তৃতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার। তবে পঞ্চগড়ে পর্যটকেরা শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতেই আসেন না, গায়ে মাখেন আগাম শীতের হাওয়া। শীত শীত আবহাওয়ায় দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখেন জেলার আরও কিছু ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান।
প্রতিনিধি/এসএস