সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

‘মাদক কেবল স্বাস্থ্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি'

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩০ জুন ২০২৬, ০১:৩১ পিএম

শেয়ার করুন:

‘মাদক কেবল স্বাস্থ্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি'
সেমিনারে বক্তব্য দিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক।  ছবি: ঢাকা মেইল

মাদক কেবল একজন ব্যক্তির স্বাস্থ্য ধ্বংস করে না, এটি একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, মানবসম্পদ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক। 

মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস উপলক্ষ্যে যুব উন্নয়ন সংসদ আয়োজিত ‘সামাজিক প্রতিরোধ, আইনের কার্যকর প্রয়োগ ও সচেতনতা: মাদকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে যৌথ প্রয়াস’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক বলেন, ‘মাদক প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন বা আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই একটি মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’

অধ্যাপক যুবাইর বলেন, ‘মাদককে শুধু জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এর প্রভাব বহুমাত্রিক। মাদকাসক্তির কারণে দেশের তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ধ্বংস হচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে, অপরাধ বাড়ছে এবং রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে এটি জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও মাদক বিস্তারের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। দেশের পূর্বদিকে রয়েছে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওস নিয়ে গঠিত ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’, যা বিশ্বের অন্যতম বড় মাদক উৎপাদন অঞ্চল। আবার পশ্চিমদিকে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইরান নিয়ে গঠিত ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’, যেটিও আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের বড় কেন্দ্র। এই দুই অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকায় বাংলাদেশ মাদক পাচার, চোরাচালান এবং অবৈধ বাণিজ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করিডোরে পরিণত হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই বাস্তবতায় শুধু দেশের ভেতরে মাদকাসক্তি বাড়ছে না, জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ, সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের বিস্তার এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধের সঙ্গে মাদক ব্যবসার সম্পর্ক দেশের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।’

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক যুবাইর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ৮৩ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদকাসক্ত। এর বড় অংশই তরুণ। এই সংখ্যা দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। মোট মাদকাসক্তদের প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী রয়েছে ৩৬ শতাংশ এবং ৩৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী প্রায় ২০ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি মাদকের শিকার হচ্ছে।

অধ্যাপক যুবাইর আরও বলেন, বর্তমানে ইয়াবা দেশের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায় ১৩ কোটি পিস ইয়াবা জব্দ করেছিল। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই কোটি পিস। আর ২০২৪ সালে জব্দ হয়েছে প্রায় ৯ কোটি ৩৬ লাখ পিস। তবে জব্দের পরিমাণ কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে মাদক পাচার কমেছে। এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানের তীব্রতা কমে যাওয়ার ফলও হতে পারে।

সীমান্তবর্তী এলাকা উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় অনেক পরিবার অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে বিত্তশালী হয়ে উঠছে। দৃশ্যমান কোনো আয়ের উৎস না থাকলেও বাড়ি, গাড়ি ও বিলাসী জীবনযাত্রা তৈরি হচ্ছে। অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, তাদের অনেকেই ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এটি শুধু অবৈধ সম্পদ সৃষ্টি করছে না, একই সঙ্গে সমাজে অপরাধের সংস্কৃতিও বিস্তার করছে।

মাদকের নতুন নতুন ধরন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই শিক্ষক। তিনি বলেন, এখন শুধু গাঁজা, ফেনসিডিল বা ইয়াবার মধ্যে মাদক সীমাবদ্ধ নেই। আইস, এলএসডি, এমডিএমএসহ বিভিন্ন ধরনের সিনথেটিক মাদক দেশে প্রবেশ করছে। এগুলো সহজে বহন করা যায়, অনলাইনে লেনদেন করা সম্ভব এবং অনেক সময় সাধারণ মানুষ এগুলোকে মাদক হিসেবেও শনাক্ত করতে পারেন না। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে।

মাদকাসক্তির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যাপক যুবাইর বলেন, পারিবারিক অশান্তি, সন্তানদের প্রতি অভিভাবকের উদাসীনতা, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, হতাশা, বেকারত্ব এবং খারাপ বন্ধুসঙ্গ তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেকেই কৌতূহল বা শখের বশেও প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে পরে আসক্ত হয়ে পড়ে।

আইন প্রয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন যথেষ্ট শক্তিশালী। ১৯৯০ সালের আইন সংশোধন করে ২০১৮ সালে আরও সমন্বিত আইন করা হয়েছে। সেখানে উৎপাদন, পরিবহন, পাচার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সংকট আইনের প্রয়োগে। অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতি ও প্রভাবশালীদের কারণে আইনের কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হয়।

শুধু আইন দিয়ে কোনো অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয় বলেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, মানুষের চরিত্র গঠন, পারিবারিক শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক প্রতিরোধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ইসলামও ধাপে ধাপে মাদক নিষিদ্ধ করেছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, সমাজ পরিবর্তনে সচেতনতা, শিক্ষা ও মানসিক প্রস্তুতির গুরুত্ব কতটা বেশি। তাই ভয় দেখিয়ে নয়, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হবে।

অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ও রাওয়া ক্লাবের সভাপতি কর্নেল আব্দুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব উন্নয়ন সংসদের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব যোবায়ের, যুব উন্নয়ন সংসদের উপদেষ্টা ড. অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জকসু) সহ-সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম প্রমুখ।

এএইচ/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর