গাছে থেকে পাকা টমেটো জমিতেই পড়ে নষ্ট হচ্ছে। তবে, সেই টমেটো তুলে বাজারজাতকরণের কোনও আগ্রহ নেই কৃষকদের। ফলে জমিতেই নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ টমেটো। শুধু টমেটোই নয়, দাম না থাকায় ইতোপূর্বে ফুলকপি ও বাঁধাকপি খেতের মধ্যেই কেটে বিনষ্ট করেছেন কৃষকরা। এমন চিত্র দেখা গেছে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, একদিকে ক্ষতির পাল্লা ভারী না করতে জমি থেকে টমেটো তোলা হচ্ছে না, অন্যদিকে প্রচণ্ড গরমের কারণে জমিতে টমেটো রাখাও যাচ্ছে না। ফলে পচে গলে নষ্ট হচ্ছে অতি কষ্টের বিপুল পরিমাণ টমেটো। জমি পরিষ্কার করতে মালিকের অনুরোধে অনেকেই মাঠ থেকে টমেটো তুলে নিয়ে যাচ্ছে গরুর খাদ্য হিসেবে।
বিজ্ঞাপন
এক মণ টমেটো বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায়, তার চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে বাজারজাত করতে। এতে বড় অঙ্কের টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
অধিকাংশ কৃষক সার, কীটনাশক ও সেচের টাকা বাকি রেখে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করে থাকে। এ বছর বাজারে টমেটোর দাম পতিত হওয়ায় কৃষকরা পড়েছেন ভীষণ দুশ্চিন্তায়, হতাশায় কাটছে প্রতিটি মুহূর্ত।
গাংনী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের তথ্য মতে, এবছর উপজেলায় প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে টমেটো চাষ করা হয়েছে। বাজারদর এতটাই কম যে, উৎপাদন খরচও ওঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
কাজিপুর গ্রামের কৃষক নাদু আলীর ছেলে কালু দুই বিঘা জমিতে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে টমেটো চাষ করেছিলেন। শেষ সময়ে সেচের জন্য আরও ২০ হাজার টাকা খরচ করেন। ভালো ফলন হলেও বাজারে দাম না থাকায় তিনি এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ হাজার টাকার টমেটো বিক্রি করতে পেরেছেন। পাইকারি ক্রেতারা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না, যার ফলে খেতেই পচে গলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কষ্টের টমেটো। একই কথা জানিয়ে জানিয়েছেন কাজিপুর আলম বাজার এলাকার আয়নাল হকের ছেলে নজরুল ইসলাম, কৃষক কেটু ও সোহরাব হোসেন।
বিজ্ঞাপন
একই পরিস্থিতির মুখোমুখি মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার আরও অনেক কৃষক। উপজেলার বামন্দি গ্রামের রফিকুল ইসলাম জানান, এক একর জমিতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করেও মূলধন ফেরত পাচ্ছেন না তিনি।
সাহারবাটি গ্রামের জাব্বারুল ইসলাম জানান, দুই বিঘা জমির ফসল তুলতেই পারছেন না। এক ক্যারেট (২৫ কেজি) টমেটো খেত থেকে তুলে বাজারে নিতে ৪০ টাকা খরচ হয়, অথচ বাজারে তা বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৫০ টাকায়। লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে অনেক কৃষক টমেটো তোলাই বন্ধ করে দিয়েছেন। বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি টমেটোর দাম ৩-৬ টাকা, খুচরায় ৮-১০ টাকা হলেও তা আদৌ লাভজনক নয়।
তবে সবজি ব্যবসায়ী নাসির উদ্দীন এ পরিস্থিতির জন্য বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সংরক্ষণের অভাবকে দায়ী করছেন। তিনি আশঙ্কা করছেন, যদি যথাযথ উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে কৃষকরা টমেটো চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে, যা সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই কথা জানিয়েছেন সবজি ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলাম, মিজানুর রহমান ও আলম হোসেন।
গাংনী উপজেলা কৃষি অফিসার ইমরান হোসেন জানান, এ বছর উৎপাদন বেশি হয়েছে ফলে টমেটোর দাম কমে গেছে। তাছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা কম এবং বাইরের ক্রেতার অভাবে টমেটোর বাজারদর তলানিতে নেমেছে। তবে রমজান মাসের পর টমেটোর চাহিদা কিছুটা বাড়তে পারে। চাহিদা বাড়লে দামও বৃদ্ধি পাবে। টমেটো চাষে যে সকল কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সরকারি প্রণোদনা আসলে তাদেরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া হবে, এমনটি জানান কৃষি অফিসের ওই কর্মকর্তা।
প্রতিনিধি/একেবি