বছরের পর বছর ধরে এতিমদের নামে সরকারী অনুদান আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে নরসিংদী সদর উপজেলার জামিয়া মোহাম্মদিয়া দারুল উলুম এতিমখানা চরভাসানিয়া মাদরাসার মুহতামিম হাফেজ মাওলানা মুফতি হাবিবুল্লাহ’র বিরুদ্ধে। অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য সরেজমিনে মাদরাসায় গিয়ে অভিযুক্ত মুহতামিম হাবিবুল্লাহর সাথে কথা বলতে চাইলে স্থানীয় এক সাংবাদিক তার হেনস্থার শিকার হন।
এ সময় তিনি দেশের সকল সাংবাদিকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং সাংবাদিকদের গণধোলাই দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। একই সঙ্গে কমিটির কাছে দরখাস্ত দিয়ে, আগে অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে মাদরাসার তথ্য সংগ্রহ করার জন্য হুমকি দেন অন্যান্য শিক্ষকদেরও। বিনা পারমিশনে মাদরাসায় সাংবাদিক ঢুকলে কটিকাটি ভেঙে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই মাদরাসায় তথ্য সংগ্রহের সময় নাগরিক টেলিভিশনের নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি ও মাধবদী থানা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাওন খন্দকার শাহিনের সঙ্গে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিক মাধবদী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, নরসিংদী সদর উপজেলার পাইকারচর ইউনিয়নে অবস্থিত সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সমাজসেবা অধিদপ্তরে ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট প্রাপ্ত মাদরাসা জামিয়া মোহাম্মদিয়া দারুল উলুম এতিমখানা চরভাসানিয়া মাদরাসার দীর্ঘদিন ধরে মুহতামিমের দায়িত্বে রয়েছেন মুফতি হাবিবুল্লাহ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বে থাকার সুবাদে মাদরাসা পরিচালনা কমিটিকে ম্যানেজ করে বিভিন্ন সময় এতিম শিক্ষার্থীদের জন্য আসা সরকারি বরাদ্দ আত্মসাৎ এবং নানা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত শিক্ষক হাবিবুল্লাহ। এর ফলে একাধিকবার এই প্রধান শিক্ষকের অপসারণ চেয়ে তার বিরুদ্ধে স্থানীয় গ্রামবাসী মানববন্ধন ও ঝাড়– মিছিল করলে টনক নড়েনি সংশ্লিষ্টদের।
জানতে চাইলে চরভাসানিয়া গ্রামের হতদরিদ্র মৃত আলাউদ্দিনের ছেলে ভুক্তভোগী আকসানুল্লাহ বলেন, তিনি প্রায় ৭ বছর ধরে এই মাদরাসায় পড়াশোনা করছেন। তার নামে মাদরাসায় একাধিক টাকা বরাদ্দ আসলেও কখনও এক টাকাও তিনি পাননি। অন্য এক শিক্ষার্থী জহিরুদ্দিন জিসান বলেন, তার বাবা নেই, অনেক কষ্টে সংসার চলে তাদের। টাকার অভাবে লেখা-পড়া করতে পারছেন না তিনি। অথচ তার নামে সরকারি বরাদ্দের যে টাকা আসছিল তা মুফতি হাবিবুল্লাহ আত্মসাৎ করে খেয়ে ফেলেছেন, এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
একই গ্রামের হতদরিদ্র বাবা আজীজুল ইসলাম বলেন, তার ছেলে জহিরুল ইসলামকে মাদরাসায় ভর্তি করানোর জন্য তিন হাজার টাকা নিয়েছেন মুফতি হাবিবুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে বরণ-পোষণ দিতে পারি না, তবে তার নামে যে সরকারি টাকা আসতো, তা তাকে কখনও দেওয়া হয়নি। আমরা এর বিচার চাই।’
এতিম শিশুদের জন্য সরকারের যে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়, তা তারা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। অভিযোগ ওঠে, মুফতি হাবিবুল্লাহ সমাজসেবা অফিস থেকে প্রত্যায়ন পত্র নিয়ে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
এ বিষয়ে পাইকারচর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. শাহীন মিয়া বলেন, মুফতি হাবিবুল্লাহ তার কাছ থেকে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের নামে প্রত্যায়ন পত্র স্বাক্ষর নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সরাসরি বিশ্বাসে হুজুরকে প্রত্যায়ন পত্র দিয়েছি, আমি এসব দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই।’
এতিম শিশুদের নামে বরাদ্দ হওয়া হাজার হাজার টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক মুফতি হাবিবুল্লাহ মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং নানা অযুহাত দেখিয়ে পাশ কাটিয়ে যান।
বিভিন্ন মাদরাসায় সমাজসেবা অফিস থেকে মাসে জন প্রতি ২ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা ১৮ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত চলে। তবে জামিয়া মোহাম্মদিয়া দারুল উলুম এতিমখানা চরভাসানিয়া মাদরাসার ১০ জন শিক্ষার্থীর বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে নরসিংদী সদর সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, ‘লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী নিবন্ধিত বেসরকারি এতিমখানাগুলোর শিশুদের প্রতিপালন, চিকিৎসা ও শিক্ষা প্রদানের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়, যা ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট নামে পরিচিত। এতিমদের টাকা আত্মসাৎ করার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সুধিজনরা ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম জানান, ভুক্তভোগী সাংবাদিক থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য থানার এক অফিসারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিনিধি/একেবি