রোববার, ২১ এপ্রিল, ২০২৪, ঢাকা

তায়েফ: যেখানে এখনো অশ্রু ঝরে

হারুন জামিল, তায়েফ থেকে 
প্রকাশিত: ১৯ মার্চ ২০২৩, ১২:৪৬ পিএম

শেয়ার করুন:

তায়েফ: যেখানে এখনো অশ্রু ঝরে

পবিত্র নগরী মক্কা থেকে তায়েফের দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার। সমতল থেকে এই পার্বত্য উপত্যকা ছয় হাজার ফুট উচ্চতায়। আবহাওয়া উঞ্চ। সবুজে আচ্ছাদিত তায়েফ নগরী প্রাচীনকাল থেকেই সমৃদ্ধ। এখানে ফসল ফলে। চাষাবাদ হয়। মক্কার অধিবাসীদের সাথে তায়েফবাসীর সম্পর্ক ঐতিহাসিক। মূলত পাহাড়ঘেরা তায়েফ থেকে মক্কার ফল ফসল ও খাদ্য চাহিদা মেটে বহু বছর আগে থেকেই। এখনো সৌদি আরবের ৩০ শতাংশ খাদ্য চাহিদা তায়েফ থেকেই পূর্ণ হয়। মক্কায় যখন তাপমাত্রা ৪০-৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে তায়েফে তখন ২৫-২৬ ডিগ্রি থাকে। শনিবার (১৮ মার্চ)  সেখানে তাপমাত্রা ছিল ১৮-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

তায়েফের সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাথে হেজাজের লোকদের পরিচিতিও পুরাতন। এই তায়েফের বনু সাকিফ গোত্রের হালিমাতুস সাদিয়া ছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা.-এর দুধমাতা। ইতিহাসখ্যাত তায়েফ নগরী তার অবস্থান সৌন্দর্য ও নানাবিধ কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তা সত্ত্বেও নবীজীর সা. সাথে তায়েফবাসীর নির্মম আচরণের ঘটনা ইতিহাসে ভিন্ন অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে। প্রত্যেক মুসলমানের হৃদয়কে যা আজও ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়।

সিরাতে ইবনে হিশাম, আর রাহিকুল মাখতুমসহ একাধিক সিরাতগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, হজরত খাদিজা রা. এবং আবু তালিবের মৃত্যুর পর মহানবী সা.-এর ওপর মক্কার কোরাইশদের অত্যাচার বৃদ্ধি পায়। তিনি অধিক দুঃখকষ্ট ও মনোবেদনা অনুভব করতে থাকেন। এ অবস্থায় তিনি মক্কার বাইরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর লক্ষ্যে নবুয়তের দশম বছরের শাওয়াল মাসে তায়েফ গমন করেন। মহানবী সা.-এর তায়েফকে দাওয়াতের জন্য বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, এখানকার বনু সাকিফ গোত্রে মহানবী সা. দুধপান করেন এবং তায়েফ সর্দারদের একজন কোরাইশ গোত্রে বিয়ে করেছিলেন। দুধের আত্মীয় ও গোত্রীয় সম্পর্কের কারণে মহানবী সা. তাদের কাছ থেকে সদাচার প্রত্যাশা করেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, তায়েফবাসী তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করবে। কিন্তু তারা চূড়ান্ত পর্যায়ের দুর্ব্যবহার ও অত্যাচার করেছিল।

আরও পড়ুন: জাবালে নুর: আজও দীপ্তিময়

নবীজী সা. তায়েফ গমনকালে তাঁর সঙ্গে ছিলেন আজাদকৃত গোলাম ও পালকপুত্র জায়িদ বিন হারিসা রা.। তায়েফে ১০ দিন তিনি গোপনে, প্রকাশ্যে, একাকী ও সামগ্রিকভাবে দাওয়াত দেন। তিনি তাদের কোরআন তেলাওয়াত করে শোনান এবং ইসলাম ও মুসলমানের পক্ষে সাহায্য কামনা করেন। কিন্তু তারা মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা.-এর সাথে চূড়ান্ত পর্যায়ের দুর্ব্যবহার ও অত্যাচার করেছিল।


বিজ্ঞাপন


ইতিহাস থেকে জানা যায়, আমর ইবনে উমায়েরের তিন ছেলে আবদে ইয়ালিল, মাসউদ ও হাবিব ছিল বনু সাকিফের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। মহানবী সা. তাদের কাছে গেলে তাদের একজন বলে, ‘আল্লাহ যদি তোমাকে রাসুল হিসেবে পাঠিয়ে থাকেন, তবে তিনি কাবা ঘরের গেলাফ খুলে ফেলুন।’ আরেকজন বলল, ‘আল্লাহ কি রাসুল বানানোর জন্য তোমাকে ছাড়া আর কাউকে পেলেন না?’ অন্যজন বলল, ‘আমি তোমার সঙ্গে কোনো কথাই বলব না। তুমি যদি তোমার দাবি অনুসারে সত্য রাসুল হও তাহলে তোমার কথার প্রতিবাদ করা বিপজ্জনক। আর তুমি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকো তাহলে তোমার সঙ্গে আমার কথা বলাই অনুচিত। তাদের কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সা. বের হয়ে এলেন এবং তাদের অনুরোধ করলেন তারা যেন এসব কথা প্রচার না করে। কিন্তু তারা তা প্রকাশ করল এবং সাধারণ মানুষদের মহানবী সা.-এর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলল।

আরও পড়ুন: ক্ষুদ্র দেশ, শক্তিশালী অর্থনীতি

এই লোকগুলো মহানবী সা.-কে তায়েফ ত্যাগের নির্দেশ দেয় এবং ফেরার সময় উচ্ছৃঙ্খল বালকদের লেলিয়ে দেয়। তারা নবীজি সা.-এর দিকে পাথর নিক্ষেপ করে এবং গালাগাল করে। তাদের উন্মত্ত আচরণে রাসুলুল্লাহর সা. শরীরের রক্তে তাঁর জুতা ভরে যায়।

এ সময় রাসুলুল্লাহর সা. সাথে থাকা হজরত জায়িদ রা. অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন। তিনি মহানবী সা.-এর জন্য ঢালস্বরূপ হয়ে যান। যে দিক থেকে পাথর ছোড়া হচ্ছিল তিনি সেদিক থেকে তাঁকে আগলে রাখছিলেন। ফলে তার মাথার কয়েক জায়গায় কেটে যায়। কষ্টে রাসুলুলুল্লাহ সা. মাটিতে বসে পড়লে পাষণ্ড মানুষগুলো হাত ধরে উঠিয়ে দিত এবং সামনে চলতে বলত। আর সামনে পা বাড়ালেই পাথর নিক্ষেপ করত।

নবীজির ঐতিহাসিক দোয়া: তায়েফবাসীর নির্মমতায় ক্ষতবিক্ষত মহানবী সা. ও তাঁর সাথী স্থানীয় একটি দ্রাক্ষাকুঞ্জে আশ্রয় নেন। এ আঙ্গুর বাগানে আশ্রয় নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দুর্বৃত্তরা মহানবী সা.-এর পিছু নিয়েছিল। বাগানের রক্ষী আদ্দাস রাসুলে করিম সা.কে আঙ্গুরের শরবত পান করান। এরপর নবীজি সা. সেখানে একটি দোয়া করেন। যা ‘দোয়ায়ে মুস্তাদয়িফিন’ (অসহায় মানুষের দোয়া) নামে পরিচিত। সে দোয়ায় তিনি বলেন, ‘হে আল্লাহ!  আমি আপনার কাছেই ফরিয়াদ জানাই আমার দুর্বলতার, আমার নিঃস্বতার এবং মানুষের কাছে আমার মূল্যহীনতার। আপনি দয়ালুদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু। অসহায় ও দুর্বলদের প্রতিপালক তো আপনিই! আপনি আমারও প্রতিপালক। আপনি কার হাতে আমাকে সমর্পন করেছেন। অনাত্মীয় রুক্ষ চেহারাওয়ালাদের কাছে অথবা এমন শত্রুর কাছে , যারা আমার ও আমার কাজের ওপর প্রবল। আপনি যদি আমার ওপর অসন্তুষ্ট না হন তবে এরপরও আমি কোনো কিছুর পরোয়া করি না। তবে আপনার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও ক্ষমা আমার জন্য অধিক প্রশস্ত। হে আল্লাহ, আমি আপনার সত্তার নূরের আশ্রয় প্রার্থী, যা দিয়ে সমগ্র আঁধার আলোকিত হয়ে যায় এবং দীন ও দুনিয়ার সবকিছু পরিশুদ্ধ হয়ে যায়। আপনি আমার ওপর কি অভিশাপ অবতীর্ণ করবেন বা ক্রোধান্বিত হবেন যে অবস্থায় আমি আপনার সন্তুষ্টি কামনা করি। সব শক্তি ও ক্ষমতা শুধু আপনারই। আপনার শক্তি ছাড়া কোনো শক্তি নেই।’

বর্ণিত আছে, এ সময় আল্লাহ তায়েফের পাহাড়ের ফেরেশতাদের পাঠান। তারা মহানবী সা.-এর কাছে দুই পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত তায়েফের অধিবাসীদের পিষে ফেলার অনুমতি চান। কিন্তু মহানবী সা. তা দিতে অস্বীকার করেন এবং বলেন- আমি আশা করি, তাদের বংশধরদের মধ্যে এমন লোক জন্ম নেবে যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।

জিনদের ইসলাম গ্রহণ: তায়েফ ত্যাগের পর মহানবী সা. নাখলা নামক স্থানে কয়েক দিন অবস্থান করেন। সেখানে আল্লাহ তায়ালা জিনদের দুটি দলকে তাঁর কাছে পাঠান। সুরা কাহাফের ২৯-৩১ আয়াতে ও সুরা জিনের প্রথম ১৫ আয়াতে তাদের কথা বলা হয়েছে। মানুষের ইসলাম বিমুখতার বিপরীতে জিনদের ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর প্রিয়নবীকে সান্ত্বনা দেন। নাখলা থেকে নবীজি সা. হেরা গুহায় আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তিনি আখনাস ইবনে শুরাইক, সুহাইল ইবনে আমর ও মুতয়িম ইবনে আদির কাছে পর্যায়ক্রমে আশ্রয়ের প্রত্যাশায় পয়গাম পাঠান। প্রথম দুজন নিজেদের অপারগতা প্রকাশ করলেও মুতয়িম আশ্রয় দিতে সম্মত হন। তিনি, তাঁর সন্তান ও গোত্রের লোকেরা অস্ত্রসজ্জিত হয়ে মহানবী সা.-কে নিরাপত্তা দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন। আশ্রয় প্রদানের শর্ত ছিল কোরাইশদের ভেতর ইসলাম প্রচার করা যাবে না। মক্কার বাইরের বিভিন্ন মেলা, হাজিদের মধ্যে ইসলাম প্রচার করা যাবে।

আরও পড়ুন: নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর মালদ্বীপ

মহানবী সা. মুতয়িম ইবনে আদির এ অবদানের কথা স্মরণ করে বদর যুদ্ধের বন্দিদের ব্যাপারে বলেন, আজ যদি মুতয়িম ইবনে আদি বেঁচে থাকত এবং এসব বন্দির ব্যাপারে সুপারিশ করত তবে আমি সবাইকে মুক্ত করে দিতাম। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত, আয়েশা রা. রাসুলুল্লাহ সা.-কে জিজ্ঞাসা করেন, উহুদের চেয়ে কঠিন কোনো দিন কি আপনার জীবনে এসেছে? রাসুলুল্লাহ সা. তখন তায়েফের দিনগুলোর কথা উল্লেখ করেন।

তায়েফ নগরীর অদূরে আদ্দাসের সেই আঙ্গুর বাগানের চিহ্ন আজও আছে। সেখানে সৌদি আরবের হেরিটেজ বিভাগ একটি মসজিদ নির্মাণ করেছে। অনতিদূরে হজরত আলীর রা. নির্মিত একটি  মসজিদ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সা. এর চাচাতো ভাই বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের হাতেগড়া তায়েফের কেন্দ্রীয় মসজিদটিও সেকালের সাক্ষী হয়ে আছে। এ মসজিদ চত্বরেই হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের কবর রয়েছে। আর রয়েছে সৌদি আরব সরকারের নির্মাণকৃত বিশাল একটি লাইব্রেরি।

হেরিটেজ বিভাগ নবীজীর সা. সময়কালীন একটি ছোট্ট মসজিদকেও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। তায়েফ নগরীর উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে ঘোর সন্ধ্যায় নেমে আসার সময়টাতে ভাবছিলাম কত রক্তাক্ত পিচ্ছিল বন্ধুর পথ পেরিয়ে ইসলাম দিকে দিকে আজ ছড়িয়ে পড়েছে।

জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর