আরাফা: নামের অর্থ ও ঐতিহাসিক পরিচয়
মক্কা থেকে প্রায় ২০-২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে তায়েফের পথে অবস্থিত এক বিশাল মরু সমতলভূমির নাম আরাফাত। তিন দিক থেকে পাহাড়বেষ্টিত এই ময়দানের মাঝে রয়েছে বিখ্যাত জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়। ‘আরাফাহ’ শব্দের শাব্দিক অর্থ পরিচয় লাভ করা, জানা, স্বীকার করা। প্রচলিত মত হলো- এই ময়দানে হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.) দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পরস্পরকে চিনতে ও একত্রিত হতে পেরেছিলেন। সেই স্মৃতি থেকেই স্থানটির নাম হয় ‘আরাফাত’।
বিজ্ঞাপন
উকুফে আরাফা: হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন
হজের তিনটি ফরজের একটি হলো উকুফে আরাফা- অর্থাৎ আরাফার ময়দানে অবস্থান করা। এটি হজের মৌলিক রুকন। এই রুকন আদায় না হলে পুরো হজই বাতিল বলে গণ্য হবে।
আলহাজ্জু আরাফাহ- হজ মানেই আরাফা।
-মুসনাদে আহমদ: ৪/৩৩৫; নাসায়ি: ৩০১৯
হজরত আবদুর রহমান ইবন ইয়ামুর (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (স.) হজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাকারীদের বলেছিলেন- ‘আরাফাই হজ। অতএব যে ব্যক্তি আরাফার রাত পেয়েছে মুজাদলিফার রাতের পূর্বে, তার হজ পূর্ণ হয়েছে। (নাসায়ি: ৩০১৯)
বিজ্ঞাপন
আরাফায় কখন পৌঁছাবেন এবং কতক্ষণ থাকতে হবে?
পৌঁছানোর সময়
৯ জিলহজ ফজরের নামাজের পর মিনা থেকে একনিষ্ঠ তাওবার নিয়তে আরাফাতের উদ্দেশে রওনা হওয়া সুন্নত।
অবস্থানের বাধ্যতামূলক সময়
ফরজ পালনের জন্য ন্যূনতম যা করতে হবে: ৯ জিলহজ সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার পর (জোহরের ওয়াক্ত থেকে) সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের নির্ধারিত সীমানার ভেতরে অবস্থান করা।
৯ জিলহজ সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার আগে থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত
আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম ফরজ কাজ।
-ফিকহ বিশেষজ্ঞদের বরাতে
আরও পড়ুন: হাজিদের সুস্থতায় করণীয়
সর্বোত্তম আমলের সময়
জোহর ও আছরের নামাজ একত্রে কসর করে পড়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই সময়টুকু আরাফায় দোয়ার সর্বোত্তম সময়।
গুরুত্বপূর্ণ: সূর্যাস্তের আগে আরাফা ত্যাগ করবেন না। রাসুলুল্লাহ (স.) সূর্যাস্তের পরে মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন- এটি মুশরিকদের পুরনো আচার থেকে মুসলমানদের পার্থক্য করার জন্য।
আরাফায় অবস্থানের সীমানা: একটি জরুরি বিষয়
অনেক হাজি মনে করেন আরাফা মানে জাবালে রহমতের পাহাড়। এটি ভুল ধারণা। জাবালে রহমত আরাফার ময়দানের একটি অংশ মাত্র। আরাফা আসলে একটি বিস্তৃত সমতল এলাকা। এর যেকোনো জায়গায় (তাঁবুতেও) অবস্থান করলেই ফরজ আদায় হবে।
সতর্কতা: উরানা উপত্যকা আরাফার সীমানার বাইরে! আরাফার পরিসীমা নির্ধারণ করে চারপাশে পিলার স্থাপন করা আছে। সীমানার বাইরে অবস্থান করলে হজ আদায় হবে না। উরানা উপত্যকায় অবস্থান করবেন না; এটি আরাফার বাইরে।
মসজিদে নামিরার কাছে অবস্থান করা মোস্তাহাব (উত্তম), তবে সেখানে জায়গা না পেলে সীমানার ভেতরে যেকোনো স্থানে অবস্থান করতে পারবেন। খুতবা শোনাও জরুরি নয়; জরুরি হলো সীমানার ভেতরে অবস্থান। (মুসলিম)
আরাফার দিনের নামাজ: কসর ও জমা
- এদিন জোহর ও আছরের নামাজ একসাথে (জমা তাকদিম) ও কসর করে আদায় করা হয়। অর্থাৎ জোহর ২ রাকাত + আছর ২ রাকাত মোট ৪ রাকাত একটানা পড়বেন।
- জোহরের আজানের আগেই গোসল করে নেওয়া সুন্নত।
- মসজিদে নামিরায় খুতবা শোনার সুযোগ হলে শুনুন- এটি সুন্নত। তবে বাধ্যতামূলক নয়।
আরও পড়ুন: ৮ জিলহজ মিনায় অবস্থানের গুরুত্ব
আরাফার দিনের মর্যাদা ও ফজিলত
১. বছরের শ্রেষ্ঠ দিন
সর্বোত্তম দিন হলো আরাফার দিন। (সহিহ ইবনে হিব্বান- হজরত জাবের (রা.) বর্ণিত)
২. জাহান্নাম থেকে সর্বাধিক মুক্তির দিন
এমন কোনো দিন নেই যেদিন আরাফার দিনের তুলনায় অধিক সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। আল্লাহ সেদিন বান্দাদের নিকটবর্তী হন এবং আরাফাতবাসীদের নিয়ে আসমানবাসীদের কাছে গর্ব করেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান- হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত)
৩. হাজির জন্য রোজা রাখা মাকরুহ
অ-হাজিদের জন্য এই দিনে রোজা রাখলে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ হয়। তবে হাজিদের জন্য এদিন রোজা রাখা মাকরুহ। রাসুলুল্লাহ (স.) বিদায় হজে রোজা রাখেননি, বরং সবার সামনে দুধ পান করেছিলেন। মুসলিম: ১১৬৩
আরাফার ময়দানে করণীয় আমলসমূহ
১. কেবলামুখী হয়ে দোয়া
কেবলার দিকে মুখ করে দুই হাত উঁচু করে বিনয় ও ভক্তিসহকারে দোয়া করুন। চোখের পানি ফেলুন। হৃদয়ের গভীর থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও মনের আকাঙ্ক্ষা জানান।
২. জিকির, তালবিয়া ও ইস্তেগফার
বেশি বেশি তালবিয়া পড়ুন: ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।’ ইস্তেগফার ও তাসবিহ পড়ুন। দরুদ শরিফ পড়ুন।
৩. কোরআন তেলাওয়াত
আরাফাতে কোরআন তেলাওয়াত ও রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা সর্বোত্তম আমলগুলোর অন্যতম।
আরও পড়ুন: মিনায় নামাজ ও রাতযাপনের বিধান
আরাফার শ্রেষ্ঠ দোয়া: হাদিসের দলিলসহ
রাসুলুল্লাহ (স.) আরাফার ময়দানে সবচেয়ে বেশি যে দোয়াটি পড়েছেন-
لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদির।
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই। প্রশংসাও তাঁর। তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। তিরমিজি: ৩৫৮৫; আহমদ: ৬৯৬১
উত্তম দোয়া হলো আরাফা দিবসের দোয়া। আর আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীগণের সর্বোত্তম কথা হলো- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু...’। (তিরমিজি: ৩৫৮৫)
দোয়া করার পদ্ধতি
- দোয়া শুরুর আগে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণাবলির বর্ণনা করুন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করুন।
- রাসুলুল্লাহ (স.) সাধারণত দোয়া তিনবার করতেন, কিন্তু আরাফার ময়দানে তিনি তা আরও বেশি বার পুনরাবৃত্তি করতেন।
- দুই হাত উত্তোলন করে কান্নাভরা মনে আল্লাহর কাছে নিজের সব প্রার্থনা জানান।
আরাফা থেকে কখন রওনা হবেন?
- সূর্যাস্তের পর মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা হবেন। সূর্যাস্তের আগে আরাফা ত্যাগ করা যাবে না।
মুশরিক ও পৌত্তলিকরা সূর্যাস্তের আগে আরাফা থেকে রওনা হতো। আমাদের আদর্শ তাদের থেকে ভিন্ন। -বায়হাকি: আস-সুনানুল কুবরা: ৫/১২৫, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর বক্তব্য
- আরাফা ত্যাগের পর গন্তব্য মুজদালিফা। পথে তালবিয়া পড়তে থাকুন।
গুরুত্বপূর্ণ মাসয়ালা: আরাফায় মাগরিব পড়া যাবে না
সূর্যাস্তের পর আরাফায় মাগরিবের আজান হলেও সেখানে মাগরিবের নামাজ পড়া যাবে না। মাগরিব আরাফায় পড়লে হজের সুন্নত পরিপন্থী হবে। মাগরিব ও এশা- এই দুই ওয়াক্তের নামাজ একত্রে মুজদালিফায় পৌঁছে পড়তে হবে।
রাসুলুল্লাহ (স.) মুজদালিফায় পৌঁছে মাগরিব ৩ রাকাত ও এশা ২ রাকাত কসর করে একই আজান ও দুটি ইকামতে পরপর আদায় করেছিলেন। এটি হজের সুন্নত এবং হাম্বলি, শাফেয়ি ও হানাফি সকল মাজহাবেই স্বীকৃত। -সহিহ মুসলিম: ১২১৮; বুখারি: ১৬৭৩

আরাফা: কেয়ামতের হাশরের স্মরণ
আরাফার ময়দান বিচার দিবসের হাশরের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যেখানে বিশ্বের কোটি মানুষ একত্রিত হয়ে ইহরামের এক পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকেন- এটি সেই মহা সমাবেশের প্রতিকৃতি। সেই দিন আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদের সামনে বলবেন- ‘আমার বান্দাদের দেখো- তারা এলোমেলো চুলে, ধূলিমলিন অবস্থায় দূর দেশ থেকে এসেছে। তারা আমার রহমত আশা করে, অথচ আমার আজাব দেখেনি।’- সহিহ ইবনে হিব্বান
আল্লাহ সকল হাজির হজ কবুল করুন এবং আরাফার ময়দানে তাদের দোয়া মঞ্জুর করুন। আমিন।




