ঈদ আসে ঈদ যায়, কিন্তু আনন্দ পাওয়া যায় না। তারপরও ঈদের দিনে একটু আনন্দ খোঁজার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ঈদের দিন কাজ থাকলে আনন্দ খোঁজার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। আক্ষেপের সুরে কথাগুলো ঢাকা মেইলকে বলছিলেন ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরী নামের এক বাংলাদেশি নাগরিক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরাতে বসবাস করছেন।
মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) ঈদের দিন তিনি বলেন, ঈদের দিনও আমার কাজ ছিল। তাই সকালে ঈদের নামাজ আদায় করেই কাজে যেতে হয়েছে। তবে কাজে দেরি হয়ে যাবে দেখে আমার এক বন্ধু তার গাড়িতে করে কর্মস্থলে আমাকে দিয়ে আসে।
বিজ্ঞাপন
ঈদ কীভাবে কাটলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের আর ঈদ। ঈদের দিন সকালে আমার বন্ধু ফাহিম তার বাসা থেকে সেমাই, ফিন্নি ও সকালের নাস্তা রান্না করে নিয়ে ঈদগাহে আসে। পরে ঈদের নামাজ শেষে আমার বাসায় যাই। সেখানে সেমাই ও ফিন্নি খেয়ে কাজে চলে যাই। তবে কাজে যেতে দেরি হবে দেখে আমার বন্ধুর গাড়িতে করেই কর্মস্থলে উপস্থিত হয়। সেখানে গিয়ে ঈদের অনুভূতি ভুলে যাই। এভাবেই সারাদিন কেটে গেছে। তারপর রাতে রেস্টুরেন্টে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ডিনার করে ঈদের আনন্দ উপভোগের চেষ্টা করেছি।
শুধু ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরীই নন, তার মতো সব প্রবাসীই হাজারো কষ্ট লুকিয়ে ঈদে আনন্দ খোঁজার চেষ্টা করেন।
চট্টগ্রামের বাসিন্দা কাজী টিএ তাইরিন। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার স্বামী অস্ট্রেলিয়াতে লেখাপড়া করছেন। সেই সুবাধে আমিও অস্ট্রেলিয়াতে বসবাস করছি। গত দুই বছর থেকে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরাতেই ঈদ উদযাপন করছি। কিন্তু এখানে ঈদের কোনো আনন্দ নেই। গতবার ঈদের দিনও আমার কাজ ছিল। তবে এবার ঈদের দিন অনেক কষ্টে ছুটি পেয়েছি। তাই স্বামী ও তার বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গেছি।
কেমন ঈদ কাটলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে ঈদের কোনো আনন্দ নেই। তারপরও সবাই ঈদের দিন একটু আনন্দ খোঁজার চেষ্টা করেন।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার ঈদের পার্থক্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার দাদা বাড়িতে এখনো এক পাতিলে রান্না করা হয়। ঈদ আসলে সবাই গ্রামের বাড়িতে যাই। একসঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করি। এসব বিষয় অনেক বেশি মিস করছি।
কাজী টিএ তাইরিন বলেন, আমি ছোটবেলা থেকে ঢাকায় বসবাস করতাম। ঢাকার ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করি। পরবর্তীতে স্বামীর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়াতে চলে আসি।
এই নারীর স্বামী শাহরিয়ার ফাহিম ঢাকা মেইলকে বলেন, ঈদে দেশের মতো আনন্দ করা যায় না। কাজ ও লেখাপড়ার চাপে পারিবারিক জীবনেও হিমশিম খাচ্ছি। ইচ্ছে থাকার পরও পরিবারকে সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। তারপরও ঈদ আসলে স্ত্রীকে একটু ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।
মজুমদার তুষার নামের আরেক প্রবাসী ঢাকা মেইলকে বলেন, ঈদ করার জন্য ২৯ মার্চ থেকে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ৩১ মার্চ অফিস থেকে ছুটিও নিয়েছিলাম। পরবর্তীতে ওইদিন চাঁদ দেখা যায়নি। তাই আজ ঈদ উদযাপন করছি।
তিনি আরও বলেন, ঈদের দিন অনেকের কাজ থাকে। তাই ঈদের নামাজ শেষেই অনেকেই কাজে চলে যায়। এ জন্য ঈদের অনুভূতি অনেক কম পাওয়া যায়।
আলিদ হাসান নামের এক শিক্ষার্থী ঢাকা মেইলকে বলেন, গত দুই বছর থেকে অস্ট্রেলিয়াতে ঈদ করছি। তবে বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের ছেড়ে ঈদ করতে ভালো লাগে না। তারপরও ঈদ আসলে ঈদ করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, গতবার ঈদে আমি একা ছিলাম। কিন্তু এবার আমার ছোট ভাইও স্টুডেন্ট ভিসায় অস্ট্রেলিয়াতে আসছে। তাই এবার দুই ভাই এক সাথে ঈদের নামাজ পড়েছি। নামাজ শেষে একটু ঘুরাঘুরিও করেছি। তাই একটু ভালো লাগছে।
আবদুল্লাহ আমীর ও আব্দুর রহমান আমীর নামের আরও দুই শিক্ষার্থী ঢাকা মেইলকে বলেন, লেখাপড়ার সুবাদে আমরা অস্ট্রেলিয়াতে বসবাস করি। তাই এখানেই ঈদ করতে হয়। তবে ঈদের দিন সকালে নিজে নিজে ফিন্নি ও সেমাই রান্না করছি। কিন্তু মায়ের রান্নার মতো হয়নি। ঈদের দিন মায়ের হাতে রান্না অনেক মিস করছি।
উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়াতে ফতোয়া কাউন্সিল ও চাঁদ দেখা কমিটি ‘মুনসাইটিং’ অনুসারীরা পৃথক দিনে ঈদ উদযাপন করে থাকেন। ‘মুনসাইটিং’ অনুসারীরা ঐতিহ্যগতভাবে আকাশে সরাসরি চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে। আর ফতোয়া কাউন্সিল চাঁদ দেখা সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ঈদের দিন নির্ধারণ করেন। এই পদ্ধতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বেশ কয়েকটি ফতোয়া পরিষদ অনুসরণ করা হয়। ফতোয়া কাউন্সিলের অনুসারীরা পহেলা মার্চ থেকে রোজা রাখা শুরু করে। তাই তারা ৩০টা রোজা সম্পন্ন করে বিশ্বেরে অন্যান্য দেশের সাথে ৩১ মার্চ ঈদ উদযাপন করেছে। তবে অস্ট্রেলিয়াতে চাঁদ না দেখা যাওয়াতে ‘মুনসাইটিং’ অনুসারীরা আজ (১ এপ্রিল) ঈদ উদযাপন করেছে।
কেআর/এমএইচটি