রোববার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০৯ এএম

শেয়ার করুন:

সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ

দেশে সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একাধিক আইন ও বিধিমালা কার্যকর আছে। তবে বাস্তবে সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ এবং মানার ক্ষেত্রে মালিক, চালক ও যাত্রী-তিন পক্ষের মধ্যেই অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে জাতীয় মহাসড়ক থেকে শুরু করে আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়ক-প্রায় সর্বত্রই তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, বাড়ছে দুর্ঘটনা ও ভোগান্তি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ। কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগে শিথিলতা এবং তদারকির ঘাটতির কারণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না।


বিজ্ঞাপন


জাতীয় মহাসড়কের মূল বৈশিষ্ট্য হলো দ্রুতগতিতে ও বাধাহীনভাবে যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যেই গত কয়েক দশকে দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হাটবাজার, অবৈধ স্থাপনা, বাস ও ট্রাক স্ট্যান্ড এবং যত্রতত্র পার্কিং। ফলে মহাসড়কের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

২০২১ সালের মহাসড়ক আইনে সড়কের দুই পাশে ১০ মিটারের মধ্যে স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়। অন্যদিকে ২০২৩ সালের হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইনের আওতায় স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে হাটবাজার স্থাপনের সুযোগ থাকায় দুই আইনের মধ্যে এক ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। ফলে উচ্ছেদ অভিযানের পরও অল্প সময়ের মধ্যেই মহাসড়কের পাশে পুনরায় গড়ে উঠছে অবৈধ স্থাপনা।

হাইওয়ে পুলিশের তথ্যে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন মহাসড়কের পাশে বহু স্থায়ী ও অস্থায়ী হাটবাজার রয়েছে। এসব বাজারকে ঘিরে ছোট যানবাহনের চলাচল, যত্রতত্র পারাপার এবং পণ্য ওঠানামার কারণে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৫ হাজার ৪৮০ জন, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সড়কে শৃঙ্খলার অভাবই এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।

সড়ক পরিবহন আইনে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, লাইসেন্সবিহীন চালকের গাড়ি চালানো, নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠানামা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে এসব অপরাধ প্রায় নিয়মিত ঘটছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো অনেক গণপরিবহনে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন করা হয় না এবং নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

সড়কের নানা অব্যবস্থাপনায় প্রতিনিয়ত ঝরছে মানুষের প্রাণ। কারো হচ্ছে অঙ্গহানি। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১৫ দিনে (১৪ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ) দেশে ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২ হাজারের বেশি মানুষ। নিহতের মধ্যে নারী ৪৬, শিশু ৬৭।

road-1
বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সড়কে ফেরেনি শৃঙ্খলা।

সংগঠনটির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এবারের ঈদযাত্রায় ১৪৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১১৬ জন, যা মোট নিহতের ৩৮.৯২ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৮.৩৩ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ৪৭ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ১৫.৭৭ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৩৬ জন, অর্থাৎ ১২.০৮ শতাংশ।

এই সময়ে ১১টি নৌ-পথ দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত, ২৩ আহত এবং দুইজন নিখোঁজ রয়েছেন। ২৯টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ৪১ জন নিহত এবং ২০৯ জন আহত হয়েছেন।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর কঠোর শাস্তির বিধান রেখে যে সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল, তা মানুষের মধ্যে আশা তৈরি করেছিল। কিন্তু পরে পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের দাবির মুখে আইনটির বিভিন্ন ধারা শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়ায় আইন প্রয়োগের গতি কমে গেছে। ফলে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, মহাসড়কে তিন চাকার যান, ব্যাটারিচালিত রিকশা, নসিমন ও করিমনের মতো অনুমোদনহীন যান চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে এসব যান এখনো চলাচল করছে। একইভাবে অনেক মোটরসাইকেল চালক হেলমেট ব্যবহার করেন না, লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালান এবং একাধিক আরোহী নিয়ে চলাচল করেন। এসব অনিয়ম দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সড়কে যাত্রী এবং চালকদের আইনের প্রতি অবহেলা হেয়ালিপনায় পরিণত হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশের পক্ষেও তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চালকরা ট্রাফিক পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে যায়।

এছাড়া মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, বিকল যানবাহন ফেলে রাখা, অতিরিক্ত পণ্যবাহী ট্রাকের চাপ এবং বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট খানাখন্দ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে ঈদ মৌসুমে এসব সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয় যাত্রীদের।

road
গণপরিবহন ব্যবস্থায় পরিবর্তন না আসায় প্রতিবছর সড়কে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে মহাসড়কসংলগ্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, আইনের মধ্যে থাকা অসামঞ্জস্য দূর করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল বন্ধ করা এবং লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে মালিক, চালক ও যাত্রী-সব পক্ষকে আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

যেসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেশি ঘটে

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও আচরণগত কারণ কাজ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের বিষয়গুলো দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ-

১. ত্রুটিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল

২. অতিরিক্ত ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো

৩. চালকদের অদক্ষতা, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা

৪. চালকদের নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো ও কর্মঘণ্টা না থাকা

৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল

৬. তরুণ ও যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা

৭. সাধারণ মানুষের মধ্যে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও আইন না মানার প্রবণতা

৮. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও তদারকির ঘাটতি

৯. বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

১০. গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও অনিয়ম

সংশ্লিষ্টদের মতে, কার্যকর নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। অন্যথায় আইন থাকলেও তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, আর নিরাপদ সড়কের লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে।

নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদ পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে হলে কমপক্ষে তিন বছর মেয়াদি একটি টেকসই ও সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই পরিকল্পনার অধীনে রেলপথ সংস্কার এবং সম্প্রসারণ করে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে সড়ক পথের মানুষকে ট্রেনমুখী করতে হবে। নৌ-পরিবহন উন্নত ও জনবান্ধব করতে হবে। বিআরটিসির রুট বিস্তৃত করে বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

এদিকে বুয়েটের দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক (এআরআই) পরিচালক শামসুল হক বলেন, আমাদের পরিবহন খাত অনেক সমস্যার জর্জরিত। এটাকে আমাদের সমাধান করতেই হবে। জনগণের জন্য জনবান্ধব একটা পরিবহন ব্যবস্থা দিতে হবে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন লন্ডনে ছিলেন, গণপরিবহনটা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। দেশের সংকট মোকাবেলায় তিনি কাজ করবেন। ইতোমধ্যে সরকার নগরের দূর করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

এমআর/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর