রোববার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

সার্ভিস লেনের অভাবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে সড়কে

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৪ এএম

শেয়ার করুন:

সার্ভিস লেনের অভাবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে সড়কে

# অনেক স্থানে সার্ভিস লেন থাকলেও তা ব্যবহার করেন না চালকরা

# গতি বেশি থাকা এবং চালকের অদক্ষতা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ


বিজ্ঞাপন


# নতুন মহাসড়ক নির্মাণের সময় সার্ভিস লেন অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি

# সড়ক-মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রয়োজন

দেশে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতরে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াতের সময় দুর্ঘটনার মাত্রা ছিল উদ্বেগজনক। যাওয়া-আসার পথে সংঘটিত এসব দুর্ঘটনার অনেকগুলো প্রাণহানির মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেছে, যা নতুন করে সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

মহাসড়কে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা হাইওয়ে পুলিশ বলছে, দেশের অনেক সড়কে সার্ভিস লেন না থাকা দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আর যেখানে সার্ভিস লেন আছে, সেখানেও অনেক চালক তা ব্যবহার না করে মূল সড়কেই চলাচল করেন। ফলে স্থানীয় ও দূরপাল্লার যানবাহনের মধ্যে সংঘর্ষের ঝুঁকি বেড়ে যায়।


বিজ্ঞাপন


গত ২২ মার্চ ঈদের পরদিন ভোরে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাস দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে ১২ জন নিহত ও অন্তত ২০ জন আহত হন। তদন্তে রেলওয়ে গেটম্যানের দায়িত্বে অবহেলা, বাসচালকের অদক্ষতা এবং সড়ক বিভাগের ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছে। নির্মাণকাজের ত্রুটিও এতে ভূমিকা রেখেছে বলে জানানো হয়।

একই দিন ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর রামপুর এলাকায় দুটি বাস ও অ্যাম্বুলেন্সের ত্রিমুখী সংঘর্ষে ৩ জন নিহত ও অন্তত ৫ জন আহত হন। তদন্তে জানা যায়, মহাসড়কের একটি লেনে মেরামতকাজ চলায় যানবাহন ধীরগতিতে চলছিল। এ সময় পেছন থেকে একটি বাস অ্যাম্বুলেন্সকে ধাক্কা দেয়। এ নিয়ে দুই চালকের তর্কাতর্কির মধ্যে দ্রুতগতির আরেকটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জটলায় থাকা যানবাহনের ওপর উঠে গেলে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা ঘটে।

হাইওয়ে পুলিশের অপারেশন শাখার ডিআইজি হাবিবুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ যেসব মহাসড়কে সার্ভিস লেন নেই, সেসব সড়কে দুর্ঘটনা তুলনামূলক বেশি হচ্ছে। সার্ভিস লেন মূলত স্থানীয় ও দূরপাল্লার যানবাহনের চলাচল আলাদা রাখতে সহায়তা করে। কিন্তু অনেক চালকই এ নিয়ম মানেন না। এছাড়া প্রতিটি মহাসড়কে নির্ধারিত গতিসীমা উল্লেখ করে সাইনবোর্ড থাকলেও তা অনেকেই উপেক্ষা করেন।

‘যেমন ফরিদপুর অঞ্চলের অধিকাংশ রাস্তায় সার্ভিস লেন আছে। ফলে সেখানে দুর্ঘটনা কম। পাশাপাশি প্রতিটি মহাসড়কে গাড়ির গতি কত হবে সেটি নির্ধারণ করে দিয়ে সাইনবোর্ড দেওয়া থাকে। লেখা থাকে প্রিন্টেড। কিন্তু এই নিয়ম অনেকে মানেন না। ফলে এই প্রতিযোগিতার ফলেও দুর্ঘটনা ঘটছে।’-বলেন হাবিবুর রহমান। এছাড়া অদক্ষ চালক এবং গাড়ির ফিটনেস না থাকাকেও অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

বিভিন্ন সময়ে ফিটনেসবিহীন যান চলাচল বন্ধ, মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ ফুটপাত ও পারাপার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করা হলেও বাস্তবায়ন খুবই সীমিত। মহাসড়কে আলাদা সার্ভিস লেন নির্মাণ, চালকদের প্রশিক্ষণ জোরদার এবং সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবও বহুবার এসেছে। কিন্তু অধিকাংশ উদ্যোগই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরেনি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সরকারের পাশাপাশি পরিবহন মালিক, চালক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সাধারণ জনগণ-সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায় সড়কে এই মৃত্যুমিছিল থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।

shariatpur01

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দেশে সড়ক অবকাঠামো ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে না ওঠায় সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের একটি টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন করে সুষ্ঠু ব্যবস্থার মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি চালক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দক্ষতা উন্নয়নে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি। তাহলে দুর্ঘটনা রোধ করা সহজ হবে। তবে এমন কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই, কোনো কর্মসূচি বাস্তব পর্যায় নাই। এসব কারণে দুর্ঘটনাগুলো রোধ করা যাচ্ছে না।’

সার্ভিস লেন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সার্ভিস লেন মূলত মহাসড়কের পাশ দিয়ে নির্মিত একটি আলাদা পথ, যা স্থানীয় যানবাহনের জন্য নির্ধারিত থাকে। এতে মহাসড়কের মূল লেনে চাপ কমে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাস পায়।

জায়গা সংকটের কারণে সব জায়গায় সার্ভিস লেন নির্মাণ সম্ভব না হলেও নতুন মহাসড়ক পরিকল্পনায় সার্ভিস লেন ও রোড ডিভাইডার অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি বলে মনে করেন সাইদুর রহমান।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘জায়গা সংকটের কারণে সব মহানগরের সার্ভিস রোড নির্মাণ করা সম্ভব না। তাই এখন নতুন মহাসড়ক নির্মাণ করার সময় সার্ভিস রোড থাকতে হবে। রোড ডিভাইডারও থাকতে হবে। মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াতে রোড ডিভাইডার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডিভাইডার না থাকার কারণে ইদানিং মুখোমুখি সংঘর্ষ বেশি হচ্ছে। ওভারটেকিং বেড়ে গেছে। ফলে পেছনে থেকে গাড়ি ধাক্কা দেওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। ওভারটেকিং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এছাড়া সড়ক-মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

এমআইকে/এমআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর