দেশের সড়ক পরিবহনব্যবস্থা এখনো বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেছে বলে মনে করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তার মতে, এই খাতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো—যাদের নিয়ন্ত্রণ করার কথা, সেই মালিক-শ্রমিক গোষ্ঠীর প্রভাবেই উল্টো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো পরিচালিত হচ্ছে। ফলে আইন প্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়ছে, বাড়ছে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা। টেকসই সমাধান হিসেবে তিনি জোর দিচ্ছেন গবেষণা, প্রযুক্তি ব্যবহার ও কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থার ওপর। সড়ক পরিবহনে ‘মাফিয়াতন্ত্রের’ প্রভাব, নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবস্থাকেই মূল সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। ঢাকা মেইলের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে মোজাম্মেল হক চৌধুরী এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক তারিক আবেদীন ইমন।
ঢাকা মেইল: বাংলাদেশের বর্তমান সড়ক পরিবহনব্যবস্থাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মোজাম্মেল হক: সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে, বাংলাদেশের সড়ক পরিবহনব্যবস্থা এখনো একটি সুসংগঠিত, বৈজ্ঞানিক ও তথ্যনির্ভর কাঠামোর মধ্যে দাঁড়াতে পারেনি। আমরা এখনো জানি না কোন ডেটার ভিত্তিতে রুট নির্ধারণ হচ্ছে, যানবাহনের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে বা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো মডেল আমরা অনুসরণ করছি না, আবার নিজেরাও কার্যকর কোনো দেশীয় মডেল তৈরি করতে পারিনি। ফলে পুরো খাতটি অনেকটাই অভ্যাসনির্ভর ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলছে।
ঢাকা মেইল: এই খাতের প্রধান দুর্বলতা কী বলে মনে করেন?
মোজাম্মেল হক: সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো শাসনব্যবস্থার ভাঙন। যাদের নিয়ন্ত্রণ করার কথা—যেমন বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো—তারা বাস্তবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রভাব এতটাই বেশি যে, তারা উল্টো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকেই নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে আইন প্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একটি ‘ক্যাপচারড রেগুলেটরি সিস্টেম’ তৈরি হয়। এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও স্বার্থের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে। মালিক-শ্রমিক সংগঠনের অনেক নেতা সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দেখে যে, প্রভাবশালীরা আইনের বাইরে অবস্থান করছে, তখন তারাও কার্যকরভাবে আইন প্রয়োগে অনীহা দেখায়।
ঢাকা মেইল: সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের বর্তমান ব্যবস্থায় কী কী ঘাটতি রয়েছে?
মোজাম্মেল হক: সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো প্রযুক্তির ব্যবহার ও গবেষণার অভাব। উন্নত দেশে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেম, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ক্যামেরা মনিটরিংসহ নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো লাইসেন্স প্রদান, ফিটনেস পরীক্ষা কিংবা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই অনেকাংশে ম্যানুয়াল ও পুরনো পদ্ধতিনির্ভর। ফলে সিস্টেমটি আধুনিক চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
ঢাকা মেইল: ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার অবস্থা কীভাবে দেখছেন?
মোজাম্মেল হক: এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাস্তায় বের হলেই দেখা যায় অনেক যানবাহন দৃশ্যতই ফিটনেসবিহীন অবস্থায় চলছে। চালকদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও কঠোরতা না থাকায় অনেকে যথাযথ দক্ষতা ছাড়াই লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।
ঢাকা মেইল: সড়ক অবকাঠামোর ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা বেশি চোখে পড়ে?
মোজাম্মেল হক: অবকাঠামোগত সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো মৌলিক সমস্যা। অনেক সড়কে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা নেই, রোড মার্কিং নেই, সাইনেজ দুর্বল। অথচ এগুলো খুব কম খরচে করা সম্ভব। আমরা বড় বড় প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছি, কিন্তু এই ছোট কিন্তু কার্যকর উদ্যোগগুলো উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
ঢাকা মেইল: ঢাকা শহরের গণপরিবহনব্যবস্থার মান এত খারাপ কেন?
মোজাম্মেল হক: এর মূল কারণ নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা। একই রুটে অসংখ্য বাস, প্রতিযোগিতামূলক যাত্রী তোলার প্রবণতা, স্টপেজে শৃঙ্খলার অভাব—সব মিলিয়ে একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর পেছনেও মালিক-শ্রমিক গোষ্ঠীর প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা দায়ী। আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করছি না। উন্নত দেশগুলো এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করে গতি ও নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য। কিন্তু আমাদের দেশে একই রাস্তায় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলছে, লেন শৃঙ্খলা মানা হচ্ছে না, নিরাপত্তাব্যবস্থাও দুর্বল। ফলে কাঙ্ক্ষিত গতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না।
ঢাকা মেইল: মালিক-শ্রমিকদের প্রভাব কতটা গুরুতর সমস্যা?
মোজাম্মেল হক: এটি অত্যন্ত গুরুতর। যখন তারা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তখন তারা আইনের তোয়াক্কা করে না। এই প্রভাব শুধু প্রশাসনেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো সিস্টেমকে প্রভাবিত করে। চালকরাও বুঝে যায় যে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—ফলে তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এখানে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী রয়েছে যারা পরিবহন খাতের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তারা ভাড়া নির্ধারণ, রুট নিয়ন্ত্রণ, এমনকি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। এর ফলে একটি অস্বচ্ছ ও অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে সাধারণ যাত্রীদের স্বার্থ উপেক্ষিত থাকে।
ঢাকা মেইল: ঢাকা শহরে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য আপনার প্রধান পরামর্শ কী?
মোজাম্মেল হক: একটি নির্দিষ্ট করিডোরে ডেডিকেটেড বাস লেন চালু করা যেতে পারে। এটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে। সীমিতসংখ্যক উন্নতমানের বাস, নির্ধারিত স্টপেজ এবং ডিজিটাল ভাড়াব্যবস্থার মাধ্যমে একটি আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। ধরুন, আমাদের যে চিটাগাং রোড থেকে বিমানবন্দর সড়কটি আছে, এটাই যদি সরকারিভাবে কিছু বাস দিয়ে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া হয় এবং ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তবে এই মডেল দেখে বাকি সড়কগুলোতেও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে এটি অত্যন্ত কার্যকর হবে। আমরা দেখেছি মেট্রোরেলের কারণে নির্দিষ্ট এলাকায় যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একইভাবে একটি করিডোরভিত্তিক বাসব্যবস্থা চালু করা গেলে ঢাকার যানজট ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
ঢাকা মেইল: ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা বেশি হওয়ার কারণ ও এর প্রতিকার কী?
মোজাম্মেল হক: ঈদের সময় স্বল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াতের কারণে সড়কব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশে এই চাপ সামাল দেওয়ার মতো প্রযুক্তি, পরিকল্পনা ও মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অদক্ষ চালকদের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। দীর্ঘমেয়াদে রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে হবে। এর জন্য গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, যাতে মানুষ ঢাকামুখী না হয়। পাশাপাশি একটি সমন্বিত ও টেকসই পরিবহন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং মালিক-শ্রমিক প্রভাবমুক্ত একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা। যখন এই প্রভাব কমে, তখনই কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরে আসে। এর পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং নজরদারি জোরদার করতে হবে।
টিএই/জেবি










