শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

এবারের ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল, দায় কার?

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ২৭ মার্চ ২০২৬, ১১:৩১ পিএম

শেয়ার করুন:

এবারের ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল, দায় কার?
ঈদের ছুটিতে সারাদেশে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার ছবি। - ঢাকা মেইল

 

  • ঈদে দুই শতাধিক মর্মান্তিক মৃত্যু
  • অতিরিক্ত গতি আর অসাবধানতা দায়ী
  • দুর্ঘটনার তথ্য আড়াল করছে সরকারি সংস্থা
  • দুর্ঘটনা রোধে দরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত

ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ ছুটি, বাড়তি প্রস্তুতি এবং নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিতের নানা উদ্যোগের পরও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ঈদের আনন্দ শেষ হওয়ার আগেই সড়ক, রেল ও নৌপথে একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ঈদযাত্রা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি, কিন্তু এরই মধ্যে প্রাথমিক হিসাব সামনে এনে দিয়েছে ভয়াবহ এক চিত্র। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে শত শত মানুষের মৃত্যু দেশের পরিবহনব্যবস্থার ভঙ্গুর বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদকে ঘিরে মানুষের বাড়ি ফেরা ও ফিরে আসার চাপ, নিয়ন্ত্রণহীন পরিবহনব্যবস্থা এবং তদারকির ঘাটতি- সব মিলেই এই প্রাণহানির মিছিলকে আরও দীর্ঘ করেছে।

বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঈদের সময়সীমার মধ্যে ২০০টির বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন কয়েকশ মানুষ। এই সংখ্যা এখনো চূড়ান্ত নয়, কারণ অনেক দুর্ঘটনার তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সংগ্রহ বা যাচাই করা হয়নি। সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠনের হিসাবের মধ্যে পার্থক্যও চোখে পড়ার মতো, যা তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই ইঙ্গিত করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত চিত্র জানতে হলে একটি সমন্বিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি জরুরি, নইলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। 

এবারের ঈদযাত্রায় কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কুমিল্লায় যাত্রীবাহী বাস রেললাইনে উঠে ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে একাধিক প্রাণহানি, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় বাস নদীতে পড়ে বহু মানুষের মৃত্যু এবং রাজধানীর সদরঘাট এলাকায় লঞ্চ দুর্ঘটনা-এসব ঘটনা মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। দুই মাস পর আরেকটি ঈদকে ঘিরে এ ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রতিটি ঘটনাই আলাদা হলেও এগুলোর পেছনে একই ধরনের অব্যবস্থাপনা ও ত্রুটি কাজ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব দুর্ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বড় সংকটের লক্ষণ।

train-accident_20231024_080017144


বিজ্ঞাপন


বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ বেপরোয়া গতি। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতায় চালকরা প্রায়ই ট্রাফিক আইন উপেক্ষা করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪০ থেকে ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনার পেছনে সরাসরি দায়ী অতিরিক্ত গতি। ঈদের সময় এই প্রবণতা আরও বেড়ে যায়, কারণ চালকরা কম সময়ে বেশি ট্রিপ দিতে চান। ফলে সামান্য ভুলও বড় দুর্ঘটনায় পরিণত হয়, যার মূল্য দিতে হয় যাত্রীদের জীবন দিয়ে।

চালকদের কর্মপরিবেশও দুর্ঘটনার বড় একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। অনেক চালক টানা কয়েক ঘণ্টা, কখনো কখনো ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিশ্রাম ছাড়াই গাড়ি চালান। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা কমে যায়, মনোযোগে ঘাটতি দেখা দেয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালকদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও বাধ্যতামূলক বিশ্রাম নিশ্চিত না করলে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

যানবাহনের ফিটনেস নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা ঈদের সময় আরও প্রকট হয়ে ওঠে। অনেক বাস ও ট্রাক নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা ছাড়াই সড়কে চলাচল করে। ব্রেকের সমস্যা, টায়ারের ত্রুটি বা ইঞ্জিনের দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও এসব যানবাহন যাত্রী বহন করছে, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। তদারকির অভাব এবং আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সড়কের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও একটি বড় কারণ। দেশের অনেক মহাসড়ক এখনো আধুনিক মানে উন্নীত হয়নি। কোথাও পর্যাপ্ত লেন নেই, কোথাও রাস্তার অবস্থা খারাপ, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় সাইনবোর্ড বা আলোর ব্যবস্থা নেই। ফলে চালকদের জন্য নিরাপদে গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাতের বেলা এই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

দুর্ঘটনার তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তিও একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সরকারি সংস্থার তথ্যের সঙ্গে বেসরকারি সংগঠনের তথ্যের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যের কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে।

a8735ff9-ecc9-4ed3-a303-0c9577a878f2_20260318_110835885

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক তথ্য ছাড়া কার্যকর নীতি প্রণয়ন সম্ভব নয় এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধের উদ্যোগও ব্যর্থ হতে পারে।

তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে থাকলেও তা কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত হয় না। আবার অনেক দুর্ঘটনা কোনো আনুষ্ঠানিক নথিতে আসে না। ফলে জাতীয় পর্যায়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না, যা নীতিনির্ধারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ঈদের পর কর্মস্থলে ফেরার সময় দুর্ঘটনা বাড়ার প্রবণতা নতুন নয়। প্রতি বছরই দেখা যায়, ঈদের আগে সড়কে যে কড়াকড়ি থাকে, পরে তা অনেকটাই শিথিল হয়ে যায়। এতে করে চালকরা আবারও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নজরদারি শুধু ঈদের আগে নয়, পরেও সমানভাবে বজায় রাখতে হবে।

যাত্রীদের আচরণও অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে গাড়িতে ওঠা, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে বসা বা দাঁড়িয়ে যাত্রা করা এবং ট্রাফিক নিয়ম না মানা-এসব কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। 

দ্রুতগতির বড় যানবাহন ও ধীরগতির ছোট যানবাহনের মিশ্র চলাচলও একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সড়কে বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত যান চলাচল করায় দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এটি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও কার্যকর সমাধান এখনো দেখা যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তার সুপারিশ বাস্তবায়নে গাফিলতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেদন প্রকাশই হয় না, আবার প্রকাশ হলেও তা কার্যকর করা হয় না। ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। পরিবহন খাতে জবাবদিহিতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা বারবার একই ভুল করছেন, যার খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

doulotdia-bus-accedent-69c654d2340b7

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। সিসিটিভি, স্পিড মনিটরিং এবং ডিজিটাল লাইসেন্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সড়ক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করা সম্ভব। এতে করে নিয়ম ভঙ্গকারীদের দ্রুত শনাক্ত করা যাবে। একই সঙ্গে দক্ষ চালক তৈরি এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। চালকদের পেশাগত মানোন্নয়ন ছাড়া দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও বিশ্রামের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিআরটিএর কার্যালয়গুলো যানবাহন ও চালকের লাইসেন্স দেওয়া, ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন, যানবাহনের মালিকানা বদলির মতো সাধারণ সেবাগুলোই ঠিকমতো দিতে পারে না; সেখানে দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ সংস্থাটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। প্রয়োজনীয় ও দক্ষ জনবলের অভাবে বিআরটিএ দুর্ঘটনায় হতাহতের প্রকৃত তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থ হচ্ছে বলেও মনে করছেন তারা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. সামছুল হক বলেন, আমরা যদি সত্যিকার অর্থে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে চাই, তাহলে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী হতে হবে, যার ওপর ভিত্তি করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, কতজন হতাহত হয়, কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়-এগুলো না জেনে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্ভব নয়। 

অধ্যাপক ড. সামছুল হকের মতে, দেশের পরিবহন খাতের দুর্ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এগুলো গভীর ‘সিস্টেমিক’ ব্যর্থতার প্রতিফলন। সড়কের পুরো ব্যবস্থাপনাকে বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক না করলে এ মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয় বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।

দেশে নিয়মিত দুর্ঘটনার তথ্য প্রকাশ করে আসছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংস্থাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে। বিপরীতে বিআরটিএর তথ্যের প্রধান উৎস ‘পুলিশ কেস’।

star_20260326_204059358

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং পরিবহন বিশেষজ্ঞ, বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনাসংক্রান্ত সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যারা তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করবে, সেই পরিবহন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর মধ্যেই অনেক ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য প্রকাশে অনীহা লক্ষ্য করা যায়। সঠিক তথ্য প্রকাশ করাকে অনেকেই নিজেদের জন্য নেতিবাচক হিসেবে দেখেন, যা বাস্তব চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র, যেমন আহত ও নিহতের সঠিক সংখ্যা, বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে নির্ধারণ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয় না।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, দেশের তথ্যভাণ্ডারে মূলত গুরুতর ও বড় ধরনের দুর্ঘটনাগুলোর তথ্যই অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, যেখানে এফআইআর বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কিন্তু ছোট ছোট অসংখ্য দুর্ঘটনা, যেগুলো প্রতিদিনই ঘটছে, সেগুলোর বেশির ভাগই রেকর্ডের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এর ফলে তথ্যভাণ্ডারে এক ধরনের বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং বাস্তবের সঙ্গে পরিসংখ্যানের বড় ফারাক দেখা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পুরো পরিবহন খাতের ইকোসিস্টেমে মৌলিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। দেশের ৫৪ বছরের ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনা ও অসাবধানতার কারণে পরিবহন খাতে নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সড়কের অবস্থা, যানবাহনের মান, চালকের দক্ষতা এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কার্যক্রম-সব ক্ষেত্রেই নানা ধরনের ত্রুটি রয়েছে।

অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনেক ক্ষেত্রেই সামনে আসে না। সাধারণত দায় চাপানো হয় চালক বা পথচারীর ওপর, যেটাকে তিনি ‘লোয়ার টায়ার’ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের উচিত একটি নিরপেক্ষ ও সার্টিফাইড দুর্ঘটনা তদন্ত কমিশন গঠন করা, যেখানে প্রশিক্ষিত ও যোগ্য বিশেষজ্ঞরা থাকবেন। এই কমিশনের সদস্যদের কোনো অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা না করে দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে গিয়ে দ্রুত ও পেশাদারভাবে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে।’

এই বিশ্লেষক বলেন, বিশ্বব্যাপী দুর্ঘটনা তদন্তে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ও সার্টিফাইড ব্যক্তিরাই দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু বাংলাদেশে সেই চর্চা এখনো গড়ে ওঠেনি। নীতিমালা, আইন ও সুপারিশ থাকলেও মূল সমস্যার জায়গা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। সড়ক দুর্ঘটনার মূল রোগটি রাজনৈতিক এবং এর সমাধানও রাজনৈতিক পর্যায় থেকেই আসতে হবে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল চৌধুরী বলেন, ‘সাধারণত ঈদের ছুটির পর কর্মস্থলে ফেরার পথে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বৃদ্ধি পায়। কারণ, ঈদের আগে সরকারের যে নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে কঠোরতা সড়কে থাকে, তা ঈদের পর দেখা যায় না।’ 

Accident_20260322_063743418_(1)_20260322_104510096

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘মানুষকে সচেতন করা এবং সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব সরকারের। তবে এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না হওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আসছে না। দুর্ঘটনার সংখ্যা কম দেখানোর প্রবণতার মধ্য দিয়ে সরকার এক ধরনের দায়মুক্তি নিতে চায়, যা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। দেশে কার্যকর কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিবহন ব্যবস্থাপনা নেই বলেই সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না। একটি সুসংগঠিত পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে যানবাহনের ফিটনেস, চালকের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক তদারকির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট।’

সাইদুর রহমান আরও বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা না হবে, ততক্ষণ সড়ক দুর্ঘটনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে একটি সুশৃঙ্খল ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে, যেখানে প্রতিটি বিষয় নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হবে। সরকারের উচিত এই ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। এর পেছনে কিছু স্বার্থের বিষয়ও কাজ করে। পরিবহন খাতে ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠিত হলে মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে বিদ্যমান অনিয়ম, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে যাবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কিছু অসাধু কর্মকর্তার দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির পথও বন্ধ হবে। এই কারণেই একটি শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা গড়ে না তুলে বর্তমান অব্যবস্থাপনাকে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।’

এএইচ/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর