কাতার যেন এক টুকরো ‘স্বর্গ’

প্রকাশিত: ১৭ নভেম্বর ২০২২, ০২:০২ পিএম
কাতার যেন এক টুকরো ‘স্বর্গ’
মরুর বুকে স্বর্গ কাতার

পারস্য উপসাগরের তীরে অবস্থিত দেশ কাতার। একসময় জেলেদের বাস ছিল এখানে। তাদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল মাছ শিকার। সেই দরিদ্র দেশ এখন বিশ্বের শীর্ষ ধনীর একটি। সৃষ্টিকর্তা যেন কাতারকে ভাড় পূর্ণ করে দিয়েছেন। আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজন করে গোটা বিশ্বের নজর কেড়েছে আল থানিদের দেশ। চলুন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শোয়ের আয়োজনকারী দেশটি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আসি।

অবস্থান
আরব উপদ্বীপের পূর্ব উপকূল থেকে উত্তর দিকে প্রসারিত কাতার উপদ্বীপের শুষ্ক মরুর দেশ এটি। কাতারের দক্ষিণে সৌদি আরব এবং পশ্চিমে দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইন। আরব উপদ্বীপের মতো কাতারও একটি উত্তপ্ত ও শুষ্ক মরু এলাকা। পুরো কাতারজুড়ে ভূ-পৃষ্ঠে কোনও জলাশয় নেই। এমন আবহাওয়া ও পরিবেশের কারণে প্রাণী ও উদ্ভিদের সংখ্যাও অনেক কম।

বেশির ভাগ লোক শহরে বিশেষত রাজধানী দোহায় বাস করে। দেশটিতে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল মজুদ রয়েছে। সৃষ্টিকর্তার দেওয়া সম্পদের কারণে দেশটির অর্থনীতি চূড়ায় পৌঁছেছে।

qatar

১৯ শতকের শেষভাগ থেকে আল-থানি গোত্রের লোকেরা কাতার অঞ্চলটিকে একটি আমিরাত হিসেবে শাসন করে আসছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে দেশটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসে। ১৯৭১ সালে এটি পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্তও যেটি একটি তুলনামূলক দরিদ্র দেশ ছিল। ওই সময় দেশটিতে পেট্রোলিয়ামের মজুদ আবিষ্কৃত হয় এবং এগুলো উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে মাথাপিছু আয়ের হিসেবে কাতার বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলির একটি। ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, কাতারিদের মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৪৫ হাজার ডলারের বেশি।

ইতিহাস
প্রাগৌতিহাসিক কাতারে স্থায়ী জনবসতির অস্তিত্ব না পাওয়া গেলেও প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। প্রত্নতত্তবিদ ডে কার্ডির মতে, কাতারে প্রাণের অস্তিত্ব ছিলো। এখানের আবহাওয়া ছিলো বৃষ্টিবহুল, জলপ্রপাত, উচু ঘাস ও স্বচ্ছ পানির নালা ছিলো বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

ইসলাম পূর্ব যুগে কাতার আরব উপ দ্বীপের অন্যান্য দেশের মতোই পারস্যের 'শাসানী' রাজবংশের অধীনস্থ ছিলো। পরবর্তিতে সপ্তম শতকে সমগ্র আরব উপ দ্বীপে ইসলাম প্রসার লাভ করলে এ অঞ্চলও ইসলামের ছায়ায় চলে আসে। এ সময় বনু আমের বিন আবদ উল কায়েস, বনু সা'দ বিন যায়েদ মিনাহ বিন তামিমি নামক বিভিন্ন গোত্রের বসবাস ছিলো। বর্তমান শাসক গোষ্ঠী আল-থানি, আ্ল তামিমিরই একটি শাখা।

আরও পড়ুন: সমকামিতা হারাম, সবার আইন মানতে হবে: কাতার বিশ্বকাপের রাষ্ট্রদূত

মহানবী মুহাম্মদ (স.) ইসলাম দক্ষিণ আরবীয় অঞ্চলে ইসলাম প্রসারে আলা আল হাদরামিকে প্রেরণ করেন ৬২৮ সালে। তখন কাতার অঞ্চলে শাসন করছিলো স্থানীয় বনু তামিম গোত্র। বনু তামিমের গোত্র প্রধান মুনযির বিন সাওয়া আল তামিমি ইসলাম গ্রহণে সম্মত হন এবং পরবর্তীতে অন্যান্য গোত্রে ইসলাম প্রসারে ভূমিকা রাখেন। ইসলামের প্রথম যুগে, কাতারে স্থায়ী বসবাস ছিল।

কাতারের মূল ব্যবসা মাছ শিকারের পাশাপাশি উট ও ঘোড়া পালন-বিক্রয়ও জনপ্রিয়তা লাভ করে। কাতারে এক ধরনের কাপড় তৈরি হত উটের পশম থেকে। এটি প্রসিদ্ধ ছিল। আব্বাসীয় আমলে মুক্তা ব্যবসার উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। কাতারি মুক্তার চাহিদা প্রাচ্যের দেশগুলোয় বেড়ে চলে, চীনেও কাতারি মুক্তার চাহিদা ছিলো।

qatar

আধুনিক কাতারের জন্ম
১৮৬৮ সালে ব্রিটিশ – আল থানি চুক্তির মাধ্যমে জন্ম লাভ করে আধুনিক কাতার। ১৮৬৮ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে লুইস পেলি আল ওয়াকরায় মুহাম্মাদ আল থানি ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে মিলিত হন।

রাজনীতি
কাতারের রাজনীতি একটি পরম রাজতন্ত্র কাঠামোয় পরিচালিত হয়। কাতারের আমির একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধান। বর্তমান আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি ২০১৩ সালে তার পিতা হামাদ বিন খলিফা আল থানির হাত থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। 

১৯৯৫ সাল থেকে দেশটির আমির ছিলেন হামাদ বিন খলিফা আল থানি। ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি দেশটির প্রধানমন্ত্রী আব্দুল্লাহ বিন নাসের বিন খলিফা আল থানি এর পদত্যাগের পর ৬ষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খালিদ বিন খলিফা বিন আব্দুল আজিজ আল থানি।

কাতার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের রাষ্ট্র। সৌদি আরব, ওমান এর পর কাতার অন্যতম রক্ষণশীল রাষ্ট্র। কাতারের নাগরিক সুযোগ সুবিধার মান খুবই উন্নত।

qatar

প্রশাসনিক অঞ্চল
কাতার আটটি পৌরসভায় বিভক্ত হয়েছে
আদ-দাওয়াহ (দোহা)
আল রাইয়ান
আল ওয়াকর‍্যা
আল খোর
আল-শাহানিয়া
উম্মে সালাল
দায়্যান - লুসাইল শহর এখানেই অবস্থিত
আল সামাল

অর্থনীতি
তেল আবিষ্কারের আগে কাতারি অঞ্চলের অর্থনীতি মাছ ধরা এবং মুক্তো শিকারের দিকে মনোনিবেশ করেছিল। ১৯২০ এবং ১৯৩০ এর দশকে জাপানি চাষ করা মুক্তা বিশ্ব বাজারে প্রবর্তনের পর কাতারের মুক্তা শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। 

১৯৪০ সালে কাতারের দুখনে তেল আবিষ্কৃত হয়। এই আবিষ্কার রাজ্যের অর্থনীতিকে বদলে দেয়। এদেশে বৈধ নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান অনেক উচ্চ। দেশটি নাগরিকদের কাছ থেকে কোনো আয়কর গ্রহণ করে না। 

জুন-২০১৩ এর তথ্যানুযায়ী, কাতারে বেকারত্বের হার ছিল ০.১%। কর্পোরেট আইন হুকুম দেয় যে, কাতারি নাগরিকদের যেকোনও উদ্যোগের ৫১% থাকতে হবে।

qatar

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল অনুসারে ২০১৬ সাল পর্যন্ত কাতারের মাথাপিছু চতুর্থ সর্বোচ্চ জিডিপিতে রয়েছে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি করতে বিদেশি শ্রমের উপর প্রচুর নির্ভর করতে হয় কাতারকে। 

কাতারের জনসংখ্যার ৮৬% ই অভিবাসী শ্রমিক। তারা শ্রমশক্তির ৯৪% কাজ করেন। ১৯৪০ সালে শুরু হওয়া পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাস শিল্পের উপর ভিত্তি করে কাতারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় একচেটিয়াভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কাতার ২০১৯ সালে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংস্থা ওপেক থেকে বের হয়ে যায়।

তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের শীর্ষ রফতানিকারী দেশ কাতার। ২০১২ সালে কাতার তৃতীয়বারের মত (মাথাপিছু আয় অনুসারে) শীর্ষ দেশের খেতাব অর্জন করে।

বিশ্বের ৪০টি দেশে কাতার ৪০০বিলিয়ন ডলার বা ৪০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। শুধু যুক্তরাজ্যেই কাতারের বিনিয়োগ ৫৩ বিলিয়ন ডলার।

আরও পড়ুন: নেই নদী, হয় না বৃষ্টিও: যেভাবে পানি পায় কাতার

জনসংখ্যা
২০১৭ সাল পর্যন্ত কাতারের মোট জনসংখ্যা ২৬ লক্ষ ৪১ হাজার ৬৬৯ জন। কাতারের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৪ শতাংশ কাতারের বাসিন্দা। আর বাকি ৮৬ শতাংশ লোকই বিদেশি। তারা বিভিন্ন কাজকর্মের জন্য সেখানে বসবাস করেন। 

পৃথিবীর মধ্যে কাতারই একমাত্র দেশ যেখানে প্রায় ১৫০টি দেশের বেশি লোক বসবাস করে। আরবি ভাষা কাতারের সরকারি ভাষা। এখানকার প্রায় ৫৬% লোক আরবি ভাষাতে কথা বলেন। প্রায় এক-চতুর্থাংশ লোক ফার্সি ভাষায় কথা বলেন। বাকিরা ভারতীয় উপমহাদেশের ও ফিলিপিন দ্বীপপুঞ্জের অন্যান্য ভাষাতে কথা বলেন। আন্তর্জাতিক কাজকর্মে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়।

qatar

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সংগঠন
কাতারে শিক্ষিতের হার প্রায় ৫৮ শতাংশ। কাতারে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা খুবই কম। সেখানে মোট জনসংখ্যার মাত্র ২০ শতাংশ মেয়ে বসবাস করে।

কাতার একটি ইসলামিক রাষ্ট্র হওয়ায় সেখানে কিছু নিয়ম রয়েছে যা সবাইকে মেনে চলতে হয়। যেমন সেখানে মেয়েদের ছোট ছোট পোশাক পড়া একদমই নিষেধ। তাছাড়া পাবলিক প্লেসে মদ্যপান, সেখানে মদ কেনাবেঁচা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। দেশটিতে পর্নোগ্রাফিও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

নিরাপদ দেশ
বিশ্বের দ্বিতীয় নিরাপদ দেশ হল কাতার। নাম্বিউ ক্রাইম ইনডেক্স অনুযায়ী দেশটিতে অপরাধের শতকরা ভাগ ১৪.০৩ শতাংশ। যেমন সুন্দর দেশ তেমনই এখানকার নিরাপদ রাস্তাঘাট। হলিডে ডেস্টিনেশন হিসেবে কাতারকে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ এটি।

জনপ্রিয় খেলা উটের দৌড়
কাতারে উট-দৌড় ভীষণ জনপ্রিয়। প্রতি বছর অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আল শাহানিয়া ক্যামেল রেসিং ট্র্যাকে উট-দৌড় অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত জকি হিসেবে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ব্যবহার করা হত। নিরাপত্তার খাতিরে ২০০৪ সাল থেকে এই নিয়ম বদলে গিয়েছে। এখন রোবোটদের জকি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে রোবটগুলিকে পরিচালনা করেন পশুপালকরা। 

qatar world cup

বিশ্বকাপ আয়োজনে আলোচনার কেন্দ্রে
ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজন করে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে কাতার। নতুন সব স্টেডিয়ামের সঙ্গে জাকজমকপূর্ণ সব আয়োজনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে দেশটি। কাতার বলেছে, এবারের ফিফা বিশ্বকাপে তারা ২২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করছে। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। আর যা কিনা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আয়োজন হতে চলছে। এর বিপরীতে ফিফার হিসেব অনুযায়ী বিশ্বকাপ থেকে আয় হবে আনুমানিক, ৬০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় অঙ্কটা প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা।

আরও পড়ুন: একনজরে কাতার বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচের সময়সূচি

সমালোচনা
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রত্যেককে দেশের নির্ধারিত আইন মেনে চলতে হবে বলে দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে কাতার। ছোট কাপড় পরা, মদপান, বিয়ে বহির্ভূত সঙ্গীকে নিয়ে অবস্থানসহ নানা কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ নিয়েই বিশ্বজুড়ে কাতারের সমালোচনা করছে পশ্চিমা দেশগুলো। 

qatar

আলোর নিচে অন্ধকার
লাখ লাখ কোটি টাকা খরচ করে বিশ্বকাপ উপলক্ষে দেশকে ঢেলে সাজিয়েছে কাতার। এর পুরোটাই প্রায় করেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এসব শ্রমিকদের অনেককে ন্যায্যমূল্য দেওয়া হয়নি। এছাড়া কাজের সময় যথেষ্ঠ নিরাপত্তাও সরবরাহ করা হয়নি। পরিণতিতে প্রাণ দিতে হয়েছে বহু শ্রমিককে। যদিও কাতার শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সূত্র: উইকিপিডিয়া, রয়টার্স, আরব নিউজ, গালফ নিউজ।

একে