• পরীক্ষকদের গাফলতি দেখছে বোর্ড
• এমন ভুল শূন্যের কোটায় নামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে
বিজ্ঞাপন
• বিষয়টি হালকা করে দেখার সুযোগ নেই: সমাজবিজ্ঞানী
গত নভেম্বরে প্রকাশিত হয় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল। সেখানে অকৃতকার্য হন অনেকে। ১১ শিক্ষাবোর্ডে অকৃতকার্য হওয়া পরীক্ষার্থীদের কেউ কেউ ফল চ্যালেঞ্জ করে পুনর্নিরীক্ষার আবেদন করলে তাদের মধ্যে ১১৩৯ জন পাস করেন। ফেল করা একজন পরীক্ষার্থী জিপিএ ফাইভও পেয়েছেন। শুধু উত্তীর্ণের ঘটনাই নয়, প্রকাশিত ফলাফলে সন্তুষ্ট না হয়ে খাতা চ্যালেঞ্জ করা ৭ হাজার ২০৯ পরীক্ষার্থীর ফলে পরিবর্তনও এসেছে। এর মধ্যে নতুন করে জিপিএ-ফাইভ পেয়েছেন ৬১৫ জন। বাকি পরীক্ষার্থীদের বিভিন্ন গ্রেডে ফল পরিবর্তন হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ করে দেরিতে হলেও পাসের ফল পেয়ে অকৃতকার্য হওয়া পরীক্ষার্থী ও তাদের পরিবারে স্বস্তি ফিরলেও, তাদের ফেল দেখানোর পেছনে দায়ী কারা সেই প্রশ্ন জোরাল হয়ে উঠছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা এইচএসসি ও সমমানের এসব পরীক্ষার্থী প্রথমে প্রত্যাশিত ফলাফল না পেয়ে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। পাশাপাশি সামাজিকভাবে এসব শিক্ষার্থীর পরিবারকে হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়। তাই যাদের ভুলে এমনটা ঘটছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি বোর্ড কর্তৃপক্ষের উচিত এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। অন্যথায় এমনটা ঘটতেই থাকবে।
বিজ্ঞাপন
অবশ্য এ বিষয়ে আন্তঃবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর তপন কুমার সরকার বলছেন, অতীতের ভুলের কারণে এবছর সব পরীক্ষককে সতর্ক করা হয়েছিল। তাই এবার ভুল কম হয়েছে। তারা চেষ্টা করছেন এটা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে।
এদিকে পরীক্ষকদের উদাসীনতায় পরীক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে এমনটা বলা হলেও শিক্ষাবোর্ডের খোদ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা মনে করছেন, ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের বাধ্যবাধ্যকতার কারণে পরীক্ষকদের দ্রুততার সঙ্গে খাতা মূল্যায়ন করতে হয়। এজন্য খাতায় ভুল বেশি হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ শিক্ষাবিদ ড. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বাস করতে চাই কোনো শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষায় অংশ নেয় তখন তার সব বিষয় মূল্যায়নে একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা থাকে। যাতে কোনো ভুল না হয়। কিন্তু ফল প্রকাশের পর যখন বিপুল সংখ্যক রিভিউ আবেদন করা হয় এবং পরবর্তীতে বড় অংশ সর্বোচ্চ রেজাল্টসহ ফেল করা শিক্ষার্থী পাস করে তখন বোর্ডের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়।’
তৌহিদুল হক বলেন, কর্তৃপক্ষ হয়তো এজন্য কিছু পদ্ধতিগত, পরিচালনাগত সংকট বা অসুবিধার কথা বলতে পারেন। কিন্তু তাদের এই ভুল একজন শিক্ষার্থীর কাছে জীবন-মরণের প্রশ্ন। কারণ অপ্রত্যাশিত ফলাফলে তাদের ওপর মনস্তাস্তিক চাপ তৈরি হয়। পরিবারও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়। আমরা চাই এটা শূন্যে নেমে আসুক। চূড়ান্তভাবে ফল ঘোষণার আগে সব ধাপগুলোতে বেশি নজরদারি ও সতর্কতার সঙ্গে দেখভাল করা হোক। কারণ এটি মোটেও হালকা বিষয় নয়। প্রতিবছর এমন সংখ্যা বাড়ায় ভয়েরও কারণও হচ্ছে। আশা করি বোর্ডগুলো কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
কোন বোর্ডে কত জনের ফলে পরিবর্তন এসেছে
গতকাল মঙ্গলবার (২৬ ডিসেম্বর) এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার খাতা পুনর্নিরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে ১১টি শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত পুনর্নিরীক্ষণের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ২ হাজার ২০৮ জন পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৩৬ জন। ফেল থেকে নতুন করে পাস করেছেন ১৪৯ জন।
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে মোট ৯৯৪ জন শিক্ষার্থীর ফলে পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্য ফেল থেকে পাস করেছেন ১৫২ জন। এর মধ্যে নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৭৯ জন।
বরিশাল বোর্ডের ৬ হাজার ২৮৬ শিক্ষার্থী খাতা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তার মধ্যে মোট ফেল থেকে পাস করেছেন ৩৬ শিক্ষার্থী। আর নতুন জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৩ জন।
যশোর শিক্ষাবোর্ডে মোট ৩৩৪ পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে ফেল থেকে পাস করেছেন ২৮ শিক্ষার্থী। আর নতুন জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৩ জন। এই বোর্ড থেকে ফেল করা এক শিক্ষার্থী খাতা চ্যালেঞ্জ করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের ৪৭২ শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে ফেল থেকে পাস করেছেন ২৪ জন। আর নতুন জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৫ জন।
রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের মোট ৩৬৯ শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে ফেল থেকে পাস করেছেন ৩১ জন শিক্ষার্থী। নতুন জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৮ জন।
দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডে মোট ২৯৬ জনের ফলাফল পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে ফেল থেকে পাস করেছেন ৩৯ শিক্ষার্থী। আর নতুন জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩২ জন। বাকিদের বিভিন্ন গ্রেডে ফল পরিবর্তন হয়েছে।
২০১৯ সালে টানা তিন বছর ধারাবাহিক গাফিলতির কারণে ১ হাজার ২৬ পরীক্ষককে শাস্তির আওতায় আনে শিক্ষাবোর্ড। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বোর্ডের আইন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। খাতা মূল্যায়নে কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত হলে ওইসব পরীক্ষকের বেতন-ভাতা বন্ধ, এমনকি চাকরিচ্যুতিরও নজির রয়েছে।
কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে ৭৯৫ জনের ফল পরিবর্তন হয়। যার মধ্যে ৬৩ জন নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন আর ১৩১ জন ফেল থেকে পাস করেছেন। বাকিরা বিভিন্ন গ্রেডে ফল পরিবর্তন হয়েছে।
ময়মনসিংহ শিক্ষাবোর্ডের এবার সবচেয়ে বেশি ৮২১ জনের ফল পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে ফেল থেকে পাস করেছেন ৪৪১ জন এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৬৮ জন।
কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের পুনর্নিরীক্ষণের ফলাফল ২৫২জনের ফল পরিবর্তন হযেছ। এর মধ্যে ফেল থেকে নতুন করে পাশ করেছে ৭৭জন এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪৬ জন।
মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডে মোট ৫ হাজার ৯১৭ ফল পরিবর্তনের আবেদন করেছিল। এর মধ্যে ১৩৬ জনের ফল পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে ফেল থেকে নতুন করে পাস করেছেন ৩১ জন, নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৪ জন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন হওয়া উত্তরপত্রে সব প্রশ্নের সঠিকভাবে নম্বর দেওয়া হয়েছে কি না, প্রাপ্ত নম্বর গণনা ঠিক রয়েছে কি না, প্রাপ্ত নম্বর ওএমআর শিটে উঠানো হয়েছে কি না ও প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী ওএমআর শিটের বৃত্ত ভরাট করা হয়েছে কি না এসব যাচাই করে ফল দেওয়া হয়।
শোকজেও হুঁশ ফিরছে না পরীক্ষকদের!
জানা গেছে, গত এসএসসি পরীক্ষা খাতা মূল্যায়নের গাফেলতির কারণে ৫৭জন পরীক্ষককে কারণ দর্শানো নোটিশ (শোকজ) করে শিক্ষাবোর্ড। একই অভিযোগে শিক্ষা বোর্ডের ৬ পরীক্ষককে শোকজ করা হয়। এরপর সব পরীক্ষককে ডেকে এনে খাতা মূল্যায়নে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে অবশ্য খাতা মূল্যায়নে ভুল কমেছে বলে মনে করেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে টানা তিন বছর ধারাবাহিক গাফিলতির কারণে ১ হাজার ২৬ পরীক্ষককে শাস্তির আওতায় আনে শিক্ষাবোর্ড। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বোর্ডের আইন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। খাতা মূল্যায়নে কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত হলে ওইসব পরীক্ষকের বেতন-ভাতা বন্ধ, এমনকি চাকরিচ্যুতিরও নজির রয়েছে।
বিইউ/এমআর