Dhaka Mail Logo

সাক্ষাৎকার

‘সিটি করপোরেশনকে জবাবদিহিমূলক করাই আমাদের মূল লক্ষ্য’

বোরহান উদ্দিন

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩১ এএম

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে একটি সচল, কার্যকর ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে নানামুখী উদ্যোগের কথা জানালেন বর্তমান প্রশাসন আব্দুস সালাম। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা, মশার উপদ্রব কমানো, জলাবদ্ধতা নিরসন, সড়কবাতি নিশ্চিত করা এবং হকার ও অটোরিকশা ব্যবস্থাপনায় নতুন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। সম্প্রতি নগর ভবনে নিজ দফতরে ঢাকা মেইলের মুখোমুখি হন আব্দুস সালাম। করপোরেশনের বর্তমান কার্যক্রম, রাজস্ব উন্নয়ন, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে তার সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন ঢাকা মেইলের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বোরহান উদ্দিন। 

ঢাকা মেইল: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উন্নয়নে আপনাদের প্রধান অগ্রাধিকার কোনগুলো?
আব্দুস সালাম: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দীর্ঘদিন অনেকটা অবহেলিত অবস্থায় ছিল। প্রতিষ্ঠানটি কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছিল না। তাই দায়িত্ব নেওয়ার পর আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার ছিল সিটি করপোরেশনকে সক্রিয় ও কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। একই সঙ্গে জনগণের দৈনন্দিন নাগরিক সেবাগুলো দ্রুত ও যথাযথভাবে নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।

এর পাশাপাশি নগরবাসীর যেসব মৌলিক নাগরিক সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধান করাও আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। বিশেষ করে মশার উপদ্রব, ড্রেনেজ সমস্যা, জলাবদ্ধতা, সড়কবাতিসহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছি। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রতিটি ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছি, যাতে নগরবাসী এসব সেবার সুফল পান।

c5033ff2-b67d-42c9-a81d-8a4e18bd2f82

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমকে জবাবদিহির আওতায় আনা। আমি আগেই বলেছি, দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটি অনেকটা অভিভাবকহীন ও অকার্যকর অবস্থায় ছিল। এখন আমরা এটিকে একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা করছি। কোথায় কী সমস্যা হচ্ছে, কেন হচ্ছে এবং কীভাবে দ্রুত সমাধান করা যায়-এসব বিষয়ে নজর দেওয়া হচ্ছে।

তবে শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ঢাকা শহরের সব নাগরিক সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। এজন্য নগরবাসীরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে জনগণের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করতেও আমরা কাজ করছি।

সব মিলিয়ে সিটি করপোরেশনকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, দ্রুত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা, মশা, ড্রেনেজ, জলাবদ্ধতা ও সড়কবাতিসহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা কমিয়ে আনা এবং জনগণের অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বাড়ানো-এসব বিষয়কে আমরা প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছি।

ঢাকা মেইল: নাগরিকরা প্রায়ই অভিযোগ করেন যে, সিটি করপোরেশনে আবেদন বা অভিযোগ জানিয়ে সমাধান পাওয়া যায় না।
আব্দুস সালাম: আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি এমন নয়। নাগরিকদের অভিযোগ সরাসরি শুনতে এলাকাভিত্তিক গণশুনানির ব্যবস্থা করেছি। সিটি করপোরেশন কার্যালয়েও যেকোনো নাগরিক এসে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন। পাশাপাশি একটি অ্যাপ চালু করেছি, যার মাধ্যমে নগরের যেকোনো সমস্যার কথা দ্রুত আমাদের জানানো যায়। গণমাধ্যমে কোনো সমস্যা উঠে এলেও আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করি।

সব অভিযোগ হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব হয় না। তবে যেগুলো দ্রুত সমাধান করা সম্ভব, সেগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে করছি। ট্রেড লাইসেন্সের ফি বাড়ানোর প্রস্তাব বন্ধ করেছি, সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কর বাড়ানো হয়নি। নাগরিক সনদ ও জন্মনিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় সেবাগুলোও দ্রুত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। এগুলোর ব্যাপারে কোথাও গাফিলতি থাকলে আমরা ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নিচ্ছি। দীর্ঘদিনের অকার্যকর একটি প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার চেষ্টা করছি।

ঢাকা মেইল: আপনারা ট্যাক্স বাড়াচ্ছেন না অথচ সার্বিক খরচ বাড়ছে। এটি কীভাবে সমন্বয় করছেন?
আব্দুস সালাম: আমি মনে করি, ট্যাক্স বাড়ানোর চেয়ে যারা এখনো ট্যাক্সের আওতায় আসেননি, তাদের সবাইকে ট্যাক্সের আওতায় আনা জরুরি। ঢাকা শহরে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও ফ্ল্যাট রয়েছে, যেগুলো এখনো ট্যাক্সের আওতায় আসেনি। সবাইকে ট্যাক্সের আওতায় আনতে পারলে রাজস্ব বাড়বে, ট্যাক্সের হার বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না।

তবে সিটি করপোরেশনের আয়ের প্রধান উৎস এই ট্যাক্স। এটি দিয়ে নগরবাসীকে প্রয়োজনীয় সব নাগরিক সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের সহযোগিতাও প্রয়োজন। আমি বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও জানিয়েছি।

বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন ১৮টি ওয়ার্ডে এখনো অনেক এলাকায় রাস্তা, ড্রেন ও বিদ্যুৎসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। এসব এলাকার উন্নয়নে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

ঢাকা মেইল: অবকাঠামোগত উন্নয়ন সুবিধাগুলো তো দিতেই হবে।
আব্দুস সালাম: অবশ্যই দিতে হবে। এসব উন্নয়নকাজের জন্যই আমরা সরকারের কাছে সহযোগিতা চাইছি। সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ ও সহায়তা দিলে এসব কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। অনেক জায়গায় নাগরিকরা বলছেন, তারা পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা পাচ্ছেন না, তাহলে কেন ট্যাক্স দেবেন। আমরা তাদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে নাগরিক সেবা ও ট্যাক্স আদায়ের বিষয়গুলোকে যতটা সম্ভব শৃঙ্খলার মধ্যে আনার চেষ্টা করছি।

ঢাকা মেইল: দায়িত্ব নেওয়ার পর সংস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জগুলো কী ছিল? আপনি তো একসময় বেতন দেওয়ার সংকটের কথাও বলেছিলেন…

আব্দুস সালাম: অবশ্যই, এটি বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা ইতিহাসের সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু শুধু রাজস্ব দিয়ে বড় ধরনের উন্নয়নকাজ করা সম্ভব নয়। বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য ব্যয় মেটাতে সরকারও সহযোগিতা করছে।

এর পাশাপাশি জলাবদ্ধতা আমাদের বড় একটি চ্যালেঞ্জ। নিউমার্কেট, ধানমন্ডি, গ্রিন রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়। বিশেষ করে আগে বিডিআরের ভেতর দিয়ে পানি নিষ্কাশন হতো, সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে একটি কার্যকর সমাধানের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চেয়েছি এবং একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, আগামী বছর এর সুফল পাওয়া যাবে।

তবে এরই মধ্যে জলাবদ্ধতা কমাতে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। আগে যেখানে কয়েক দিন বা দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকত, সেখানে এখন পাম্পের মাধ্যমে পানি দ্রুত সরানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অন্তত পানি জমে থাকার সময়টা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি।

ঢাকা মেইল: প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় আপনার মূল কর্মপরিকল্পনা কী?
আব্দুস সালাম: আমাদের কর্মপরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা অনুযায়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ‘গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলা। শহর পরিষ্কার ও সবুজ রাখতে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।

আপনি সকালে ছয়টা থেকে আটটার মধ্যে ঢাকা শহরে ঘুরলে দেখবেন, রাস্তাঘাট অনেকটাই পরিষ্কার থাকে। কিন্তু মানুষ ও দোকানপাট চলাচল শুরু করার পর বিভিন্ন জায়গায় আবার আবর্জনা জমে যায়। তাই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।

আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো যানজট ও রাস্তায় হকারের অব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর রিকশা ও হকারের সংখ্যা বেড়ে রাজধানীর চলাচল ব্যবস্থা অনেকটাই অচল হয়ে পড়েছে। আমরা এ দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে একটি নিয়মের মধ্যে আনতে চাই। হকারদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং তারাও একমত হয়েছেন যে মূল সড়কে কোনো হকার থাকবে না।

ঢাকা মেইল: রাস্তায় কি হকারদের বসতে দেওয়া বা নির্দিষ্ট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল?
আব্দুস সালাম: না, হকারদের সঙ্গে আমাদের এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং তারাও এতে একমত হয়েছেন। যেসব রাস্তা নিয়মিত ব্যবহার হয় না, সেগুলোর কিছু অংশ প্রয়োজনে হকারদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। তবে মূল সড়কে হকার বসতে দেওয়া হবে না।
এছাড়া শুক্রবার ও শনিবার হলিডে মার্কেট চালু থাকবে। নির্দিষ্ট জায়গায় এ ধরনের বাজারের ব্যবস্থা করে হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে, যাতে একই সঙ্গে সড়কের শৃঙ্খলা ও নাগরিকদের চলাচল নিশ্চিত করা যায়।

ঢাকা মেইল: বিশেষ করে গুলিস্তান এলাকায় হকার নিয়ন্ত্রণে যে মার্কিং উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটি সফল হলো না কেন?
আব্দুস সালাম: না, ওই উদ্যোগ বাদ যায়নি। আমরা উদ্যোগটি নিয়েছিলাম, এরপর ঈদ চলে আসায় এবং হকারদের পক্ষ থেকে কিছুটা সময় চাওয়ায় বিষয়টি সাময়িকভাবে পিছিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, তারা দেশেরই মানুষ। বিকল্প ব্যবস্থা না করে তাদের সরিয়ে দিলে তারা কোথায় যাবে এ বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করতে হবে।

তাই আমরা একটি সমন্বিত পরিকল্পনা করছি। যেসব ফুটপাত প্রশস্ত, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী এক পাশে হকারদের জন্য জায়গা দেওয়া হতে পারে। তবে পথচারীদের চলাচল অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শুক্রবার ও শনিবার হলিডে মার্কেট এবং কিছু এলাকায় অফিস সময়ের পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নৈশকালীন মার্কেট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হকারদের একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনা। এজন্য রেজিস্ট্রেশন ও পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করা হবে। কেউ আজ এসে কাল ভ্যান নিয়ে রাস্তায় বসে যেতে পারবেন না। নির্ধারিত আইডি, রেজিস্ট্রেশন ও ভ্যানের নম্বর ছাড়া হকারি করা যাবে না। এ বিষয়ে আমরা দুই সপ্তাহের সময় নিয়েছি। এরই মধ্যে কয়েকদিন চলে গেছে। এই সময়ের মধ্যে সিটি করপোরেশন ও পুলিশ সমন্বিতভাবে হকার ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর ব্যবস্থা করবে।

ঢাকা মেইল: হকারদের মতো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রেও কি কোনো শৃঙ্খলার পরিকল্পনা রয়েছে?
আব্দুস সালাম: অবশ্যই। হকারদের ব্যবস্থাপনার পর অটোরিকশার বিষয়টিকেও আমরা রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনব। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে চারটি জোনে ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি জোনের অটোরিকশা নিজ নিজ জোনের মধ্যেই চলাচল করবে। এক জোনের অটোরিকশা অন্য জোনে যেতে পারবে না।

যেমন, দক্ষিণের অটোরিকশা উত্তরে বা কেরানীগঞ্জের অটোরিকশা ঢাকার এলাকায় এসে চলাচল করতে পারবে না। ঢাকার মধ্যে যারা অটোরিকশা চালাবেন, তাদের অবশ্যই সিটি করপোরেশনের রেজিস্ট্রেশন ও নির্দিষ্ট নম্বর থাকতে হবে। রেজিস্ট্রেশনবিহীন কোনো অটোরিকশা চলাচল করতে দেওয়া হবে না।

ঢাকা মেইল: অটোরিকশার মোটর আমদানি বন্ধ বা ব্যবহারের বিষয়ে কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত রয়েছে কি?
আব্দুস সালাম: মোটর বন্ধের কথা বলছি না, আমরা বলছি যে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরাসরি ব্যবহার করা যাবে না।

ঢাকা মেইল: জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ছাড়া অটোরিকশা চালানো কতটা বাস্তবসম্মত?

আব্দুস সালাম: অবশ্যই বাস্তবসম্মত। এটা করতেই হবে। অটোরিকশাগুলোকে ধীরে ধীরে সোলার বা পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক সিস্টেমে নিয়ে যেতে হবে। এজন্য সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ ও বুয়েট- এই তিনটি প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে কাজ করবে। প্রথমে নির্দিষ্ট কিছু ওয়ার্কশপকে অনুমোদন দেওয়া হবে। আমরা যে নির্দিষ্ট মডেল বা নমুনা দেব, সেই অনুযায়ী অটোরিকশা তৈরি বা রূপান্তর করতে হবে। এরপর বুয়েট সেটি পরীক্ষা করবে। বুয়েটের অনুমোদনের পর সিটি করপোরেশন রেজিস্ট্রেশন ও নির্দিষ্ট নম্বর দেবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় একটি ক্রস-চেক ব্যবস্থা থাকবে এবং ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করার সুযোগ থাকবে না। আমাদের বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। এই অবস্থায় অটোরিকশায় যেভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে চলতে পারে না। তাই পর্যায়ক্রমে এগুলোকে সোলার ও ইলেকট্রিক ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা করছি।

ঢাকা মেইল: অটোরিকশার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপে যাচ্ছেন কি?

আব্দুস সালাম: আগে অটোরিকশার প্রবলেমটা সলভ হোক। পাশাপাশি গণপরিবহনগুলোকে আমরা একটি সুনির্দিষ্ট সিস্টেমের মধ্যে নিয়ে আসি। এগুলো সুশৃঙ্খল করার পর আমরা ব্যক্তিগত গাড়ির বিষয়টি নিয়ে ধাপে ধাপে চিন্তা করব।

ঢাকা মেইল: ঢাকার গণপরিবহনকে এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ বারবার থমকে যায় কেন?
আব্দুস সালাম: গণপরিবহনকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্যে আনতেই হবে। গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না থাকাই ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ। তাই যেখানে-সেখানে বাস পার্কিং করা যাবে না এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামাও বন্ধ করতে হবে।

এ বিষয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও গুলিস্তানের বাস টার্মিনালটি নদীর ওপারে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি। সায়েদাবাদ টার্মিনালটি নগরীর অভ্যন্তরীণ বাসসেবার জন্য থাকবে। আর আন্তঃজেলা বাসগুলোর জন্য টার্মিনাল সরিয়ে কাঁচপুরে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা মেইল: সামনে সিটি করপোরেশন নির্বাচন। প্রার্থী হিসেবে আপনার প্রস্তুতি কেমন?
আব্দুস সালাম: ইনশাআল্লাহ, প্রস্তুতি ভালোই চলছে। নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনগণের সমর্থন ও সাড়া। আমি বিভিন্ন জায়গায় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি এবং তাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। জনগণের সমর্থন নিয়ে আমি আশাবাদী।

ঢাকা মেইল: বিগত প্রশাসনের দুর্নীতির অভিযোগগুলো কি আপনারা খতিয়ে দেখছেন?
আব্দুস সালাম: এগুলো সরাসরি মন্ত্রণালয় দেখভাল করছে।

ঢাকা মেইল: বিরোধী শিবিরের (এনসিপি) অভিযোগ—সিটি করপোরেশনের প্রশাসকরা দাফতরিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে নির্বাচনি প্রচারণায় ব্যবহার করছেন…
আব্দুস সালাম: তারা যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন কী করেছে? প্রায় ১৮ মাস তারাই ক্ষমতায় ছিল। সে সময় তারাও কি তাদের কর্মকাণ্ড প্রচারণায় ব্যবহার করেনি? তাই এটাকে অভিযোগ হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। দেখুন, জনগণ বর্তমান সরকারকে সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই যদি কেউ সরকারকে ব্যর্থ বলে, তাহলে সরকারের পক্ষেও তো প্রশ্ন আসে—তারা কেন ব্যর্থতার দায় নেবে? আমি এখানে যে দায়িত্বে আছি, আমার জায়গায় যদি দলের বাইরের কেউ থাকতেন এবং একইভাবে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতেন, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই সেই কাজের দায় নিতেন।

আমি আমার জায়গা থেকে জনগণকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। মানুষ মূলত সেবা চায়। আমরা সেই সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। জনগণ যদি আমাদের কাজে সন্তুষ্ট হয়, তাহলে নির্বাচনে তারাই আমাদের পক্ষে রায় দেবেন।

ঢাকা মেইল: ঢাকা থেকে মশা কি আদৌ নির্মূল করা সম্ভব?

আব্দুস সালাম: মশা কখনো পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। তবে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করা যাবে না। আমাদের কীটতত্ত্ববিদরা এ কারণে সব ধরনের ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি দেন না। কারণ অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করলে পরিবেশ ও অন্যান্য উপকারী কীটপতঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আমাদের এমনভাবে কাজ করতে হবে, যাতে মশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পরিবেশও সুরক্ষিত থাকে। গত বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপও অনেক কম। গত কয়েক মাস ধরে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি, ফলে মশার উপদ্রব আগের তুলনায় কমেছে।

তবে শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। গতকাল ধানমন্ডিতে একটি যৌথ কর্মসূচিতে গিয়ে দেখেছি, একটি নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে পানিতে মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ ধরনের জায়গায় পানি জমতে না দেওয়া এবং নিজ নিজ এলাকায় পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নাগরিকদের আরও সচেতন হতে হবে।

ঢাকা মেইল: শহরকে ‘গ্রিন সিটি’ করতে বাসাবাড়িতে গাছ লাগানো কি বাধ্যতামূলক করা হবে?
আব্দুস সালাম: শুধু আইন করে গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক করা সম্ভব নয়। এজন্য নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তবে গাছ লাগানোর পাশাপাশি গাছ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশে অনেক জায়গায় বাড়ির ভেতরে গাছ লাগানো যায়, কিন্তু সেটি কাটতে হলে সিটি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। এমনকি ফুটপাত বা রাস্তার কোনো অংশ নিজের ইচ্ছামতো পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। নাগরিকদেরও নিজ নিজ এলাকার পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তার বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হয়। এ ধরনের নিয়ম ঢাকাতেও কার্যকর করতে হবে।

আমি গত পাঁচ মাস ধরে মানুষকে অনুরোধ করে আসছি। কিন্তু শুধু অনুরোধে কাজ হচ্ছে না। তাই এখন থেকে যারা নিয়ম মানবেন না, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে জরিমানা, গ্রেপ্তার বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে এর বিকল্প নেই।

ঢাকা মেইল: কঠোর আইনি প্রয়োগ ছাড়া কি শৃঙ্খলা সম্ভব নয়?

আব্দুস সালাম: আসলে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা ছাড়া উপায় নেই। কারণ একজন নাগরিক নিজেই যদি অপরিচ্ছন্নতা তৈরি করেন, আবার নিজেই পরিচ্ছন্নতার জন্য সিটি করপোরেশনের সমালোচনা করেন, তাহলে তো হবে না। নাগরিকদেরও নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আপনারা সাংবাদিক হিসেবে আমাদের সমালোচনা করবেন, এটা স্বাভাবিক এবং আমি চাইও। তবে যারা নাগরিক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন না, তাদের বিষয়টিও আপনারা তুলে ধরবেন। সিটি করপোরেশন যেমন তার দায়িত্ব পালন করবে, তেমনি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। তাহলেই সব বিষয় ন্যায়সংগত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

ঢাকা মেইল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আব্দুস সালাম: ঢাকা মেইল ও এর পাঠকদেরও ধন্যবাদ।

বিইউ/জেবি