ফ্রান্সে দিনকে দিন বাড়ছে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে ফরাসি ভাষা, শিল্প, সংস্কৃতি ও সভ্যতার সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিষয়টিও। পিছিয়ে নেই উদ্যোক্তা খাতও। যদিও এক দশক আগেও বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এই চিত্র ছিল অনেকটাই বিপরীতে। নানা কারণে ফ্রান্সে অভিবাসী হিসেবে ঠাঁই নিলেও ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহীর সংখ্যা ছিল নিতান্তই হাতেগোনা। বর্তমানে জাতীয়তা অর্জন এবং জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশটির মূলধারায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের অংশগ্রহণ, ইতিবাচক আগামীরই জাল বুনছে। বাংলাদেশি কমিউনিটির অগ্রযাত্রার নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি আলাপ হয়েছে ফরাসি ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফ্রেঞ্চ একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মাদ ফয়সাল আহমেদের সঙ্গে। তিনি প্রশাসনিক কার্যক্রমে সহায়তামূলক প্রতিষ্ঠান এইড পয়েন্টেরও কর্ণধার। প্যারিসে তার কার্যালয়ে এই আলাপের বিপরীতে ছিলেন হাবিবুল্লাহ ফাহাদ।
ফ্রান্সপ্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিষয়টি বর্তমানে অনেক গুরুত্ব পাচ্ছে। আপনি এটিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
এটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তন। একটি দেশে দীর্ঘমেয়াদে সফলভাবে বসবাস করতে হলে শুধু বৈধ কাগজপত্র থাকলেই হয় না, সেই দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, আইন ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণা থাকাও জরুরি। ফরাসি ভাষা জানা একজন অভিবাসীকে কর্মক্ষেত্র, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সামাজিক জীবনে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। আমি মনে করি, নতুন প্রজন্ম এই বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। যা বাংলাদেশি কমিউনিটির ভবিষ্যতের জন্য খুবই আশাব্যঞ্জক।
ফ্রান্সে বাংলাদেশি অভিবাসীরা সাধারণত কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন?
আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ভাষাগত সমস্যা, প্রশাসনিক নিয়ম-কানুন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব, বাসস্থান, চাকরি এবং বিভিন্ন সরকারি প্রক্রিয়া বুঝতে অসুবিধা। অনেক সময় সঠিক তথ্যের অভাবে মানুষ এমন সমস্যায় পড়েন, যা আগে থেকেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। তাই নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সঠিক পরামর্শ পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক বাংলাদেশি এখনো ফরাসি ভাষা শেখার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছেন। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি বিষয়টি শুধু অনীহার কারণে নয়। অনেক অভিবাসী ফ্রান্সে এসে প্রথমে কাজ, পরিবার ও দৈনন্দিন জীবনের নানা দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে ভাষা শেখার জন্য পর্যান্ত সময় দিতে পারেন না। এছাড়া অনেকের কাছে ফরাসি ভাষা কঠিন মনে হয়। কিন্তু সঠিক পদ্ধতিতে, বাস্তব জীবনের প্রয়োজন অনুযায়ী এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে খুব সহজেই ভাষা শেখা সম্ভব।
আপনি বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা নিয়ে কাজ করছেন। এই সেবামূলক পেশায় আসার অনুপ্রেরণা কী ছিল?
এক কথায় বললে, ফরাসি জাতীয়তা আবেদনকে বাংলাদেশিদের মাঝে সহজ করে তোলা। কেননা একটি শক্ত অবস্থানেরর কমিউনিটি তৈরির ক্ষেত্রে জাতীয়তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাছাড়া নিজের অভিজ্ঞতা ও আশপাশের মানুষের সমস্যাগুলো দেখেই এই কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ফ্রান্সের প্রশাসনিক ব্যবস্থা অনেকের কাছে জটিল মনে হয়। বিশেষ করে নতুন অভিবাসীরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না কোথায় কীভাবে আবেদন করতে হবে। মানুষকে সঠিক তথ্য দেওয়া, তাদের সমস্যা সহজ করা এবং প্রয়োজনীয় দিননির্দেশনা দেওয়ার লক্ষ্য থেকেই এইড পয়েন্টের যাত্রা শুরু।
ফরাসি জাতীয়তা (Naturalisation) আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়তার জন্য আপনার প্রতিষ্ঠান বেশ প্রশংসা পেয়েছে। এর পেছনে কী ভূমিকা রেখেছে বেশি?
ফরাসি জাতীয়তার আবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। এখানে শুধু একটি ফর্ম পূরণ করাই যথেষ্ট নয়। আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ভাষাগত যোগ্যতা এবং প্রশাসনিক নিয়মগুলো ভালোভাবে বুঝতে হয়। আমরা প্রতিটি ব্যক্তির পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সঠিক প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করি। স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা এবং সঠিক তথ্য দেওয়ার কারণে মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে।
এইড পয়েন্ট বর্তমানে কী ধরনের সেবা প্রদান করছে?
এইড পয়েন্টে আমরা বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক সহায়তা দিয়ে থাকি। এর মধ্যে রয়েছে ফরাসি জাতীয়তা আবেদন, রেসিডেন্স পারমিস সংক্রান্ত সহায়তা, পরিবার ফ্রান্সে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া, অভিবাসন ফাইল প্রস্তুতি, প্রশাসনিক চিঠিপত্র তৈরি, অনুবাদ সহায়তা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে দিকনির্দেশনা। আমাদের সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে বাংলাদেশিদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের নাগরিকও রয়েছেন। কারণ প্রশাসনিক জটিলতা সব দেশের অভিবাসীদের জন্যই একটি সাধারণ বিষয়।
আপনি কত বছর ধরে ফ্রান্সে বসবাস করছেন?
আমি প্রায় ১০ বছর ধরে ফ্রান্সে বসবাস করছি। এই দীর্ঘ সময়ে ফ্রান্সের সমাজ, সংস্কৃতি, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং অভিবাসীদের বাস্তব সমস্যাগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাই আমাকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এবং তাদের সহযোগিতা করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।
ফ্রান্সে আপনার বসবাসকালীন সময়ে কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন?
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। মানুষ এখন আগের তুলনায় শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের বিষয়ে বেশি সচেতন। সেই সঙ্গে, প্রশাসনিক ব্যবস্থাও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার বেড়েছে এবং নিয়ম-কানুন আরও কাঠামোবদ্ধ হয়েছে। তাই সঠিক তথ্য জানা এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্সে নিয়মিতকরণ (Naturalisation) প্রক্রিয়া আগের তুলনায় কঠোর হয়েছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
ফ্রান্স বর্তমানে অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। ফলে আবেদনকারীদের কাছ থেকে আরও বেশি প্রমাণপত্র এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে যারা নিয়ম মেনে চলেন, কাজ করেন, সমাজে অবদান রাখেন এবং ফরাসি মূল্যবোধকে সম্মান করেন, তাদের জন্য সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্যোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি বিষয়। বাংলাদেশিরা এখন শুধু চাকরির দিকে না ঝুঁকে নিজের ব্যবসা তৈরি করার দিকেও এগিয়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তা হওয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করছেন। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করছেন। এটি ফ্রান্সের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এটি বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য একটি ভালো দিক।
উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা কী কী?
প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, ব্যবসার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে অজ্ঞতা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাব। একজন সফল উদ্যোক্তার জন্য শুধু পরিশ্রম যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সঠিক তথ্য, প্রশিক্ষণ, আর্থিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা।
আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।
আমাদের লক্ষ্য হলো আরও বেশি মানুষকে সঠিক তথ্য ও সহযোগিতা প্রদান করা। যাতে তারা ফ্রান্সে সফলভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। ভবিষ্যতে এইড পয়েন্ট এমন একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। যেখানে অভিবাসীরা প্রশাসনিক সহায়তা, ভাষা শিক্ষা এবং সামাজিক একীভূতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা পাবেন।
প্রতিনিধি/এজেড



