জেলা প্রতিনিধি
৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৮ পিএম
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় হয়েছে। এবার এ বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশে। একই সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও। এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯৫০ জন। গত বছর যেখানে পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ হাজার ৬৭৫ জন, সেখানে এবার উভয় সূচকেই বড় পতন হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়- বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। বিপরীতে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান শতভাগ পাসের সাফল্য অর্জন করেছে। ফলাফলে বিভাগভিত্তিক বৈষম্যও স্পষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অকৃতকার্য হয়েছে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ বিভাগের ৪০ হাজার ৪৮৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৩ হাজার ৫০৫ জনই অকৃতকার্য হয়েছে।
অন্যদিকে পুরো বোর্ডের ফল বিপর্যয়ের মধ্যে ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখিয়েছে বরিশাল ক্যাডেট কলেজ। এ প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান বিভাগের ৪১ জন এবং মানবিক বিভাগের পাঁচজনসহ মোট ৪৬ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের এবারের ফলাফলে ১১টি কলেজে পাসের হার শূন্য। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
শূন্য পাসের তালিকায় রয়েছে ভোলার চরমানিকা জালাল আহমেদ কলেজ, লালমোহনের রামাগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও সদর উপজেলার মিদুয়া কলেজ। পটুয়াখালীর গলাচিপার বিপিসি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মির্জাগঞ্জের মজিদবাড়িয়া কলেজ এবং সদর উপজেলার আউলিয়াপুর সাবিনা আক্তার স্কুল অ্যান্ড কলেজের কোনো শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি।
এ ছাড়া পিরোজপুরের নাজিরপুরের দীঘিরজান স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও কদমতলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঝালকাঠির নলছিটির অ্যাডভোকেট এইচআরকে ফাউন্ডেশন কৃষি প্রযুক্তি কলেজ এবং বরগুনার পাথরঘাটার হোগলাপাশা কলেজেও পাসের হার শূন্য।
বোর্ডের সামগ্রিক ফল খারাপ হলেও তিনটি প্রতিষ্ঠান শতভাগ পাসের সাফল্য অর্জন করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ফল করেছে বরিশাল ক্যাডেট কলেজ।
প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৪১ জন এবং মানবিক বিভাগ থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের সবাই জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।
এ ফলাফলের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ এ টি এম মোয়াজ্জেম হোসেন।
একই বোর্ডে একদিকে ১১টি প্রতিষ্ঠানে একজনও পাস না করা এবং অন্যদিকে একটি প্রতিষ্ঠানের ৪৬ জন পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পাওয়ার বিষয়টি শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, পাঠদানের মান ও শিক্ষার্থীদের তদারকির পার্থক্যকে সামনে এনেছে।
গত বছর বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসিতে পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এবার তা কমে হয়েছে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
একইভাবে গত বছর এ বোর্ড থেকে ১ হাজার ৬৭৫ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। এবার সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৫০ জনে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৭২৫ জন।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় দেখা গেছে মানবিক বিভাগে। এ বিভাগে মোট ৪০ হাজার ৪৮৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৩ হাজার ৫০৫ জন অকৃতকার্য হয়েছে।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগেও ফলাফলে বড় ধস নেমেছে। এ বিভাগে পাসের হার ৪০ দশমিক ২৮ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৬২ দশমিক ০৪ শতাংশ।
বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার তুলনামূলক বেশি হলেও গত বছরের চেয়ে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এবার এ বিভাগে পাসের হার ৫৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৭১ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
বিষয়ভিত্তিক ফলাফলেও ইংরেজিতে ব্যাপক ধস চোখে পড়েছে। গত বছর বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। সেখানে এবার তা কমে হয়েছে মাত্র ৫৪ দশমিক ০৮ শতাংশ।
অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ইংরেজিতে ফেল করেছে বলে জানিয়েছেন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজা।
তিনি বলেন, ইংরেজিতে ভালো করতে পারলে সামগ্রিক ফলাফল আরও ভালো হতো। ফলে আগামী দিনে এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভিত্তি শক্ত করার পাশাপাশি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও অনুশীলনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বরিশাল বিভাগে এবার ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ফলাফল অনেকটাই ভালো হয়েছে। ছেলেদের পাসের হার ৩৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ হলেও মেয়েদের পাসের হার ৫২ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
ফলে সামগ্রিক ফলাফলে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার বিষয়টিও ফল বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জেলাভিত্তিক ফলাফলেও বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। বোর্ডের মধ্যে শুধু পিরোজপুর জেলা ৫০ শতাংশের ওপরে পাসের হার ধরে রাখতে পেরেছে।
অন্যদিকে সবচেয়ে কম পাসের হার ঝালকাঠিতে। এ জেলায় পাসের হার ৩৭ দশমিক ০৯ শতাংশ। পটুয়াখালীতে ৩৮ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং ভোলায় ৩৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজা ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে মানসম্মত শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার অভাব এবং শিক্ষক ও অভিভাবকদের অসচেতনতাকে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠ গ্রহণের পাশাপাশি বাড়িতে পড়াশোনার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তার মতে, শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফলের জন্য শুধু পরীক্ষার আগে প্রস্তুতি নিলেই হবে না; সারা বছর নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থেকে পাঠ গ্রহণ এবং বাড়িতে নিয়মিত পড়াশোনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে অভিভাবকদেরও আরও সচেতন হতে হবে।
তবে এবারের ফলাফলকে শুধু নেতিবাচক হিসেবে দেখতে চান না পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। তিনি মনে করেন, এ ফলাফলের একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে।
অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজা বলেন, আগের মতো শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রবণতায় না ভেসে শিক্ষার মানের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের এবারের ফলাফল মেনে নিয়ে আগামী দিনে ভালো করার প্রস্তুতি নিতে হবে।
তার মতে, ভালো ফলাফলের পাশাপাশি একজন শিক্ষার্থী প্রকৃত অর্থে কতটা শিখছে, সেটিই শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতার চেয়ে শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, দক্ষতা ও নিয়মিত অধ্যয়ন নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের এবারের ফলাফল একদিকে যেমন ১১টি কলেজে শূন্য পাসের হার, মানবিক বিভাগে বিপুলসংখ্যক অকৃতকার্য, ইংরেজিতে বড় ধস এবং জেলাভিত্তিক ফলের বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে, তেমনি ক্যাডেট কলেজের শতভাগ জিপিএ-৫ ফল দেখিয়েছে, সঠিক পাঠদান, নিয়মিত অধ্যয়ন ও যথাযথ তদারকি থাকলে শিক্ষার্থীরা ভালো করতে পারে।
শিক্ষাবিদ শাহ সাজেদা বলেন, এবার যেসব প্রতিষ্ঠানের ফল খারাপ হয়েছে, সেগুলোতে বিষয়ভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ করে দুর্বলতা চিহ্নিত করা জরুরি। বিশেষ করে ইংরেজিতে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি ক্লাস, নিয়মিত মূল্যায়ন ও শিক্ষক-অভিভাবকের সমন্বিত তদারকি প্রয়োজন। তাহলেই আগামী পরীক্ষায় বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রতিনিধি/এএম