মক্কার পূর্বদিকে পাহাড়ঘেরা শহর তায়েফ। ইসলামের ইতিহাসে এই শহরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনের এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়। নবুয়তের দশম বছরে মক্কার বাইরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার আশায় তিনি তায়েফে যান। সঙ্গে ছিলেন জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.)।
কিন্তু সাকিফ গোত্রের নেতারা তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেননি। তাঁরা শহরের লোকদেরও তাঁর বিরুদ্ধে উসকে দেন। একপর্যায়ে পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে তায়েফ ছাড়তে হয় নবীজি (স.)-কে।
কঠিন সেই সফরের স্মৃতি আজও তায়েফের নানা স্থান ও স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিছু স্থান স্থানীয় ঐতিহ্যে তাঁর সফরের স্মৃতি বহন করছে, কিছু স্থাপনার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে তাঁর সফরের সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। ফলে তায়েফের এসব স্থানকে বুঝতে হলে ঐতিহাসিক বর্ণনা ও স্থানীয় ঐতিহ্য - দুটিকেই পাশাপাশি দেখতে হয়।
মসজিদে আদ্দাস
তায়েফের সঙ্গে নবীজি (স.)-এর স্মৃতির কথা উঠলে মসজিদে আদ্দাসের নাম বিশেষভাবে আসে। সৌদিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ওয়াদি ওয়াজ এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদের নাম আদ্দাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তায়েফবাসীর প্রত্যাখ্যানের পর নবীজি (স.) একটি বাগানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বাগানের মালিক উতবা ও শায়বা ইবনে রাবিয়ার পক্ষ থেকে তাঁদের দাস আদ্দাস তাঁর কাছে আঙুর নিয়ে আসেন। নবীজি (স.) খাবার শুরু করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বললে আদ্দাস বিস্মিত হন। কথোপকথনে যখন নবীজি (স.) নিনাওয়ার নবী ইউনুস (আ.)-এর কথা বলেন, আদ্দাস জানান, তিনি নিনাওয়ারই বাসিন্দা।
আরও পড়ুন: তায়েফের বেদনার স্মৃতি: নবীজির (স.) ধৈর্য ও ক্ষমার অনন্য দৃষ্টান্ত
এই সাক্ষাতের ঘটনা সহিহ বুখারির ৩২৩১ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। মসজিদটির নাম আদ্দাসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তায়েফের এই স্থানটি তাঁর সফরের স্মৃতি বহনকারী স্থান হিসেবে পরিচিত।
তবে বর্তমান মসজিদটি নবীজি (স.)-এর যুগের স্থাপনা নয়। তাই স্থানটির ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং বর্তমান ভবনের বয়স- দুটিকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
মসজিদে কুনতারা
মসজিদে কুনতারাও তায়েফের পরিচিত ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর একটি। স্থানীয় ঐতিহ্যে এর সঙ্গে নবীজি (স.)-এর তায়েফ সফরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
সৌদিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান মসজিদটি ১৮৪৬ সালে নির্মিত। অর্থাৎ এটি নবীজি (স.)-এর সময়কার স্থাপনা নয়। তবে স্থানীয়ভাবে তাঁর তায়েফ সফরের স্মৃতির সঙ্গে স্থানটি যুক্ত হয়ে আছে।
নবীজি (স.) এই নির্দিষ্ট জায়গাতেই বিশ্রাম নিয়েছিলেন-এমন বর্ণনার ক্ষেত্রে তাই ‘প্রচলিত মতে’ বলা অধিক সতর্ক ও যথাযথ।
মসজিদে ইবনে আব্বাস
তায়েফের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা মসজিদে ইবনে আব্বাস। নাম থেকেই বোঝা যায়, এর সঙ্গে বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
সৌদিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কবর রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে মসজিদটির সংস্কার ও সম্প্রসারণ হয়েছে।
এটি নবীজি (স.)-এর তায়েফ সফরের সরাসরি স্মৃতিস্থল হিসেবে নয়, ইবনে আব্বাস (রা.)-এর স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে পরিচিত।
আরও পড়ুন: নবীজির ৭ ক্ষমার দৃষ্টান্ত হৃদয় ছুঁয়ে যায়
মসজিদে মাওকিফ ও সিদরাহ
তায়েফের ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর মধ্যে মসজিদে মাওকিফ বা আল-কুউ এবং মসজিদে সিদরাহর নামও পাওয়া যায়।
স্থানীয় ঐতিহ্যে মাওকিফ মসজিদের সঙ্গে নবীজি (স.)-এর তায়েফ সফরের একটি স্মৃতি যুক্ত আছে। বলা হয়, তিনি সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন বা কোনো সময় সেখানে অবস্থান করেছিলেন। সিদরাহ মসজিদকেও তাঁর সফরের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়।
এসব স্থান তায়েফের ঐতিহাসিক স্মৃতির অংশ হিসেবে পরিচিত। তবে প্রাচীন বর্ণনা ও পরবর্তী স্থানীয় ঐতিহ্যের মধ্যে পার্থক্যটি মনে রাখা ভালো।
‘হালিমা সাদিয়ার বাড়ি’ কতটা নির্ভরযোগ্য?
তায়েফের আশপাশে একটি স্থানকে নবীজি (স.)-এর দুধমা হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর বাড়ি হিসেবে দেখানোর কথাও শোনা যায়।
হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে নবীজি (স.)-এর শৈশব কাটানোর ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে সুপরিচিত। তবে বর্তমানে যে নির্দিষ্ট স্থানটিকে তাঁর বাড়ি হিসেবে দেখানো হয়, সেটির সঙ্গে হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর সম্পর্কের পক্ষে বৈজ্ঞানিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে তথ্য নেই।
সৌদি আরবের তৎকালীন পর্যটন ও জাতীয় ঐতিহ্যবিষয়ক কর্তৃপক্ষের একটি দল কথিত স্থানটি পরিদর্শন করে একই ধরনের সংশয় প্রকাশ করেছিল। তাই স্থানটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখলেও নিশ্চিত ঐতিহাসিক পরিচয় হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত।
‘কাঁটা দেওয়া বৃদ্ধার বাড়ি’ গল্পটি কি তায়েফের?
তায়েফে কখনো কখনো এমন একটি গল্পও প্রচলিত আছে যে এক বৃদ্ধা নবীজি (স.)-এর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে দিতেন। কোনো কোনো স্থানের সঙ্গে এই গল্পের সম্পর্কও দেখানো হয়।
তবে নির্ভরযোগ্য সহিহ হাদিসে এমন ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায় না। তায়েফে নবীজি (স.)-এর ওপর পাথর নিক্ষেপের ঘটনা অবশ্যই ইসলামের ইতিহাসে সুপরিচিত। কিন্তু তার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে প্রচলিত বিভিন্ন গল্প মিশে গেলে মূল ইতিহাসের সঙ্গে জনশ্রুতির পার্থক্য করা কঠিন হয়ে যায়।
তাই তায়েফের কোনো বাড়ি, গাছ বা পাথরকে এমন ঘটনার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দেখার আগে তথ্যের উৎস জানা জরুরি।
তায়েফের সবচেয়ে বড় স্মৃতি
তায়েফের স্মৃতি শুধু কোনো মসজিদ, বাড়ি বা স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই শহরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নবীজি (স.)-এর অসীম ধৈর্য, দাওয়াতের প্রতি অবিচলতা এবং মানুষের জন্য তাঁর গভীর মমতার এক অনন্য অধ্যায়।
তায়েফ থেকে ফিরে আসার পথে পাহাড়ের ফেরেশতা এসে তাঁকে প্রস্তাব দেন, তিনি চাইলে তায়েফবাসীকে দুই পাহাড়ের মাঝে পিষে দেওয়া হবে। কিন্তু নবীজি (স.) তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আশা করেন, তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে যারা আল্লাহর ইবাদত করবে। ঘটনাটি সহিহ বুখারির ৩২৩১ এবং সহিহ মুসলিমের ১৭৯৫ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
যে শহর তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, সেই শহরের মানুষের জন্যও নবীজি (স.) হেদায়েতের আশা ছাড়েননি। পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েও তিনি প্রতিশোধের কথা ভাবেননি, তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কল্যাণের প্রত্যাশা করেছেন। তাই তায়েফের স্মৃতি কষ্টের মধ্যেও দয়া, ধৈর্য ও আশার এক অনন্য শিক্ষা।
তায়েফে আজ নানা স্থান ও স্থাপনা তাঁর সেই সফরের স্মৃতি বহন করে। তবে এসবের চেয়েও গভীর স্মৃতি রয়ে গেছে তাঁর মহান চরিত্রে- নির্যাতনের মুখেও ক্ষমা, কষ্টের মধ্যেও ধৈর্য এবং সব পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর অটুট ভরসা।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি: ৩২৩১; সহিহ মুসলিম: ১৭৯৫; সৌদিপিডিয়া; সৌদি প্রেস এজেন্সি; সউদি গ্যাজেট, ২০১৬




