ক্ষমা মানুষের অন্যতম মহৎ গুণ। বিশেষ করে প্রতিশোধ নেওয়ার সামর্থ্য ও সুযোগ থাকার পরও কাউকে ক্ষমা করা সহজ নয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত আঘাত, অপমান ও নির্যাতনের জবাবে তিনি প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। তাঁর চরিত্রে ক্ষমাশীলতা ছিল একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনেও তাঁকে ক্ষমাশীলতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে- ‘আপনি বিনয় ও ক্ষমার নীতি গ্রহণ করুন এবং লোকদের সৎ কাজের নির্দেশ দিন আর মূর্খদেরকে এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা আরাফ: ১৯৯)
সীরাত ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের বর্ণনায় নবীজি (স.)-এর ক্ষমাশীলতার অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাতটি ঘটনা তুলে ধরা হলো।
১. তায়েফে রক্তাক্ত হয়েও প্রতিশোধ নেননি
তায়েফে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে নবীজি (স.) কঠিন নির্যাতনের শিকার হন। তাঁকে পাথর নিক্ষেপ করে রক্তাক্ত করা হয়। তায়েফ থেকে ফেরার পথে জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে পাহাড়ের ফেরেশতা তাঁর কাছে আসেন। তিনি জানান, নবীজি (স.) চাইলে দুই পাহাড়ের মাঝখানে তায়েফবাসীকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
প্রতিশোধ নেওয়ার এমন সুযোগ পেয়েও নবীজি (স.) তা গ্রহণ করেননি। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ বের করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে।’ (সহিহ বুখারি: ৩২৩১)
যারা তাঁকে রক্তাক্ত করেছিল, তাদের ধ্বংস কামনা না করে তিনি তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হেদায়াতের আশা করেছিলেন। তাঁর এই জবাব ক্ষমাশীলতার পাশাপাশি মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধেরও প্রকাশ।
২. চাদর টেনে দাগ ফেলা বেদুইনের প্রতিও উদারতা
এক বেদুইন নবীজি (স.)-এর চাদর ধরে এত জোরে টান দেন যে, তাঁর ঘাড়ে চাদরের পাড়ের দাগ পড়ে যায়। এরপর লোকটি রূঢ়ভাবে আল্লাহপ্রদত্ত সম্পদ থেকে তাকে কিছু দেওয়ার দাবি করে।
সাহাবিরা এতে ক্ষুব্ধ হলেও নবীজি (স.) তার দিকে ফিরে হাসেন এবং তাকে কিছু দেওয়ার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি: ৫৮০৯)
ব্যক্তিগত অপমানের জবাবে তিনি রাগ বা প্রতিশোধ দেখাননি। ধৈর্য ও উদারতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন।
আরও পড়ুন: জাদুকর লাবিদকেও ক্ষমা করলেন নবীজি (স.)
৩. বিষমিশ্রিত খাবারের পরও তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ নেননি
খায়বরের পর এক ইহুদি নারী নবীজি (স.)-এর জন্য বিষমিশ্রিত ভেড়ার মাংস প্রস্তুত করে। তিনি তা থেকে খান এবং পরে বিষের বিষয়টি প্রকাশ পায়। নারীটিকে তাঁর সামনে আনা হলে তাকে হত্যা করা হবে কি না জানতে চাওয়া হয়। বর্ণনায় এসেছে, নবীজি (স.) বলেন, ‘না।’ (সহিহ বুখারি: ২৬১৭)
নিজের প্রাণনাশের চেষ্টা জানার পরও তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। ব্যক্তিগত ক্ষতির মুখেও তাঁর সংযমের এটি একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
৪. মক্কা বিজয়ের দিন বহু মানুষের জন্য নিরাপত্তা
দীর্ঘদিনের বিরোধ, নির্যাতন ও সংঘাতের পর মক্কা বিজয়ের দিন শহরটি নবীজি (স.)-এর নিয়ন্ত্রণে আসে। তখন তাঁর হাতে ছিল পূর্ণ ক্ষমতা। অতীতের নির্যাতনের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগও ছিল।
কিন্তু তিনি বহু মানুষের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, অস্ত্র রেখে দেবে কিংবা নিজেদের ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে, তারা নিরাপদ থাকবে। (সহিহ মুসলিম: ১৭৮০)
বিজয়ের মুহূর্তে প্রতিশোধের পরিবর্তে নিরাপত্তার ঘোষণা তাঁর সংযম ও মহানুভবতার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
আরও পড়ুন: নবীজির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণাটি কেমন ছিল
৫. অপরাধের পরও ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছিলেন
আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ একসময় নবীজি (স.)-এর লেখার কাজে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি ইসলাম ত্যাগ করে মক্কায় ফিরে যান। মক্কা বিজয়ের সময় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ ছিল।
তিনি হজরত উসমান (রা.)-এর কাছে আশ্রয় নেন। উসমান (রা.) তাঁকে নবীজি (স.)-এর কাছে নিয়ে এসে তাঁর জন্য নিরাপত্তা চান। এরপর নবীজি (স.) তাঁর বাইআত গ্রহণ করেন। (সুনান আবু দাউদ: ৪৩৫৮)
এই ঘটনায় দেখা যায়, অপরাধের পর তওবা করে ফিরে আসার সুযোগও তিনি বন্ধ করেননি। অনুতপ্ত হয়ে ফিরে এলে সংশোধনের পথ উন্মুক্ত রাখাই ছিল তাঁর মহানুভবতার একটি দিক।
৬. তরবারি হাতে শত্রুকে পেয়েও ক্ষমা
একবার দাসুর ইবনুল হারিস নামে এক ব্যক্তি নবীজি (স.)-এর ওপর হামলার সুযোগ খুঁজছিল। একপর্যায়ে নবীজি (স.) একটি গাছের নিচে বিশ্রাম নেওয়ার সময় সে তাঁর কাছে এসে তরবারি উঁচিয়ে বলে, ‘এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে?’
নবীজি (স.) নির্ভীকভাবে জবাব দেন, ‘আল্লাহ।’ এ কথা শুনে দাসুরের হাত থেকে তরবারি পড়ে যায়। নবীজি (স.) তখন তরবারিটি হাতে তুলে নিয়ে তাকে একই প্রশ্ন করেন। অসহায় দাসুর কোনো উত্তর দিতে পারেনি। এরপর নবীজি (স.) তাকে ক্ষমা করে দেন। (সিরাতে মোগলতাই: ৪৯)
ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে চলে আসার পরও প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করার এই ঘটনা তাঁর অসাধারণ সংযমের দৃষ্টান্ত।
৭. নিজের জন্য কখনো প্রতিশোধ নিতেন না
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (স.) নিজের জন্য কখনো কারও কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতেন না। তবে আল্লাহর কোনো বিধান লঙ্ঘিত হলে তিনি সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতেন।’ (সহিহ বুখারি: ৩৫৬০)
এই বর্ণনায় নবীজি (স.)-এর ক্ষমাশীলতার একটি মৌলিক নীতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত রাগ, অপমান বা প্রতিহিংসাকে তিনি ন্যায়বিচারের সঙ্গে মিশতে দিতেন না। তাঁর ব্যক্তিগত আচরণে ক্ষমা ছিল, আর আল্লাহর বিধান ও মানুষের অধিকারের প্রশ্নে ছিল ন্যায়বিচার।
ক্ষমা মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়
নবীজি (স.)-এর ক্ষমাশীলতা কোনো দুর্বলতার পরিচয় ছিল না। ব্যক্তিগত অপমান ও আঘাতের ক্ষেত্রে তিনি বহুবার ক্ষমা ও সংযমের পথ বেছে নিয়েছেন। একই সঙ্গে মানুষের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও আল্লাহর বিধানের প্রশ্নে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তাঁর জীবন থেকে ক্ষমার যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো- ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে নিজেকে দূরে রাখা, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং সম্ভব হলে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া। ক্ষমা তখনই মহৎ হয়ে ওঠে, যখন তা সামর্থ্যহীনতার কারণে নয়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও করা হয়।
আজ সামান্য অপমানেও যখন প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে, সম্পর্ক ভেঙে যায় কিংবা বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন নবীজি (স.)-এর জীবন আমাদের ভিন্ন একটি পথ দেখায়। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করতে পারা দুর্বলতা নয়, অনেক সময় সেটিই প্রকৃত শক্তির পরিচয়।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনান আবু দাউদ ও সিরাতে মোগলতাই



