হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র স্থান মুজদালিফা। আরাফাত ময়দান থেকে ফেরার পর ১০ জিলহজের রাতে হাজিরা এখানে অবস্থান করেন এবং মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর সুন্নাহ অনুসরণে এই রাতটি হাজিদের জন্য ইবাদত, জিকির ও আত্মসমর্পণের বিশেষ সময় হিসেবে বিবেচিত।
মুজদালিফা নামকরণের পেছনে কয়েকটি ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ বলেন, রাতের প্রথম ভাগে হাজিরা এখানে পৌঁছান বলেই এর নাম ‘মুজদালিফা’। আবার কেউ বলেন, এটি ‘নিকটবর্তী হওয়া’ অর্থবোধক আরবি শব্দ থেকে এসেছে, কারণ এখান থেকে হাজিরা ধীরে ধীরে মসজিদুল হারামের দিকে অগ্রসর হন।
বিজ্ঞাপন
আরাফাত ও মিনার মাঝখানে অবস্থিত মুজদালিফা মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে। প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ ৮০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই খোলা প্রান্তরে একসঙ্গে ২০ লাখের বেশি হাজির অবস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। স্থায়ী স্থাপনা না রেখে এর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: হজের পূর্ণাঙ্গ গাইড: নিয়ত থেকে বিদায়ী তাওয়াফ
পবিত্র কোরআনেও মুজদালিফার গুরুত্ব উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তারপর যখন তোমরা আরাফাত থেকে ফিরে আসবে, তখন মাশআরে হারামের কাছে আল্লাহকে স্মরণ করবে।’ (সুরা বাকারা: ১৯৮)
মুজদালিফার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘আল-মাশআর আল-হারাম’ এলাকায় হাজিরা দোয়া, জিকির ও ইবাদতে মশগুল থাকেন। এখানেই মহানবী (স.) রাত্রিযাপন করেছিলেন এবং জামারায় নিক্ষেপের জন্য পাথর সংগ্রহ করেছিলেন।
বিজ্ঞাপন
অতীতে হাজিরা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই মুজদালিফায় রাত কাটাতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌদি সরকার এই স্থানে ব্যাপক উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করেছে। বাদশাহ সালমান ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের তত্ত্বাবধানে পবিত্র স্থানগুলোর উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে।
এর অংশ হিসেবে কিদানা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি ১ লাখ ৭০ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে ‘মাশায়ের পথ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার বর্গমিটার পরিবেশবান্ধব রাবার ফ্লোরিং, যা তাপ ও হাঁটার কষ্ট কমাতে সহায়তা করে। এছাড়া যানবাহন ও গলফ কার্ট চলাচলের আলাদা পথ, বসার স্থান, পানির স্টেশন, মোবাইল চার্জিং ইউনিট, মিস্ট ফ্যান, ছাতা ও নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: হজ করার সময় শয়তানকে পাথর মারতে হয় কেন?
সৌদি আরবের ইসলামবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতি বছর আল-মাশআর আল-হারাম মসজিদে বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এর আওতায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আলো ও সাউন্ড সিস্টেম উন্নয়ন, কার্পেট সরবরাহ এবং নারীদের নামাজের স্থান শতভাগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যাতে হাজিদের যাতায়াত সহজ হয়।
প্রায় ৫ হাজার ৪০ বর্গমিটার আয়তনের এই মসজিদে একসঙ্গে সাড়ে ৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। এখানে আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নজরদারি ক্যামেরা এবং পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা টিমও রয়েছে।
হাজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। আরাফাত থেকে মুজদালিফায় হাজিদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থেকে স্মার্ট ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে।
মুজদালিফা আজও হজের আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য প্রতীক। একই সঙ্গে এটি আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও সেবাব্যবস্থার সমন্বিত উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
আরব নিউজ




