সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

বাবা বা স্বামী জীবিত থাকলে কি নারীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

শেয়ার করুন:

বাবা বা স্বামী জীবিত থাকলে কি নারীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব?

পবিত্র ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা ত্যাগ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ইসলামি শরিয়তে কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা জাকাতের মতোই ব্যক্তিনির্ভর। অর্থাৎ, বাবা বা স্বামী জীবিত থাকা বা না থাকার ওপর নয়, বরং ব্যক্তির নিজস্ব সামর্থ্যের ওপরই কোরবানির বিধান নির্ভর করে। এ কারণে নারীর কোরবানির হুকুম নিয়ে সমাজে প্রচলিত বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি।

কোরবানির মূলনীতি: ‘সাহেবে নিসাব’ হওয়া

শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে মুসলিম নর-নারীর কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। (আলমুহিতুল বুরহানি: ৮/৪৫৫; ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া: ১৭/৪০৫)

নিসাবের পরিমাণ

সাড়ে ৭ তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ তোলা রূপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য বা অপ্রয়োজনীয় সম্পদ। এ বিধানে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

নারীর ওপর কোরবানির বিধান

কোনো নারীর নিজস্ব মালিকানায় যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে- যেমন স্বর্ণালঙ্কার, সঞ্চিত অর্থ বা জমি, তাহলে তার ওপর কোরবানি স্বতন্ত্রভাবে ওয়াজিব হবে। তিনি অবিবাহিতা হোন বা বিবাহিতা, বাবা বা স্বামী জীবিত থাকুক বা না থাকুক, এই বিধান অপরিবর্তিত। অর্থাৎ, স্বামীর সংসারে বসবাস করলেও স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদের কোরবানি তাকেই আদায় করতে হবে।

আরও পড়ুন: ৫ ভরি স্বর্ণ থাকলে কোরবানি ওয়াজিব হবে?

নিসাব গণনায় স্বর্ণ ও নগদ টাকার সমন্বয়: একটি জরুরি মাসয়ালা

কোরবানির নিসাব নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো নারীর কাছে কেবল স্বর্ণ থাকে এবং অন্যকোনো সম্পদ না থাকে,  তাহলে সাড়ে ৭ তোলা স্বর্ণ পূর্ণ হলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
তবে স্বর্ণের সঙ্গে যদি সামান্য রূপা, নগদ টাকা, প্রাইজ বন্ড বা অন্যান্য সঞ্চয়পত্র কিংবা অপ্রয়োজনীয় কোনো আসবাবপত্র থাকে, তাহলে নিসাব নির্ধারণে রূপার মূল্য (সাড়ে ৫২ তোলা) মানদণ্ড হিসেবে গণ্য হবে।

অর্থাৎ সরাসরি স্বর্ণ বা রুপা থাকা শর্ত নয়, বরং সমমূল্যের প্রয়োজনের অতিরিক্ত নগদ অর্থ বা বাড়ি বা ব্যবসায়িক পণ্য বা অন্যান্য আসবাবপত্র কোরবানির নিসাবের অন্তর্ভুক্ত। (তাবয়িনুল হাকায়েক: ১০/৬) ব্যবসার নিয়তে জমি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, কাপড়-চোপড়, অলংকার, নির্মাণ সামগ্রী, ফার্নিচার, ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী, হার্ডওয়ার সামগ্রী, বইপুস্তক ইত্যাদি কিনলে তা বাণিজ্য-দ্রব্য বলে গণ্য হবে এবং এসবের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ২/৯০; ফতোয়ায়ে শামি: ৬/৩১২)

বর্তমান বাজারদরে সাড়ে ৫২ তোলা রূপার দাম খুব বেশি নয়। তাই অল্প কিছু স্বর্ণের সঙ্গে উল্লেখিত অল্প সম্পদ থাকলেই অনেক নারী ‘সাহেবে নিসাব’ হয়ে যান এবং তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়ে পড়ে- যা অনেকেই সঠিক জ্ঞানের অভাবে উপলব্ধি করেন না। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ৫/২৯৭)

আরও পড়ুন: স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী কোরবানি দিতে পারবে?

বাবা বা স্বামী কি দায়িত্বমুক্ত করবেন?

সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা হলো- পরিবারের একজন কোরবানি দিলেই সবার দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে এ ধারণাকে সঠিক বলা হয়নি। প্রত্যেক ‘সাহেবে নিসাব’ ব্যক্তির ওপর আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৬)

তাই, মেয়ের নিজস্ব নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে বাবা জীবিত থাকলেও মেয়ের কোরবানি পৃথক। স্ত্রীর নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে স্বামী জীবিত থাকলেও স্ত্রীর কোরবানি পৃথক।

পরিবারের পক্ষ থেকে একটি কোরবানি

পরিবারের কর্তা যদি নফল হিসেবে পুরো পরিবারের জন্য একটি কোরবানি করেন, তাহলে সওয়াবের দিক থেকে তা সবার জন্য হতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে পরিবারের অন্য সদস্যদের ওয়াজিব কোরবানির দায়িত্ব আদায় হয় না- যদি তারা স্বতন্ত্রভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন।
তবে স্বামী বা বাবা চাইলে নিজের অর্থ দিয়ে স্ত্রী বা কন্যার পক্ষ থেকে কোরবানি আদায় করতে পারেন। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির (স্ত্রী বা কন্যা) অনুমতি থাকতে হবে। অনুমতি সাপেক্ষে আদায় করলে তা বৈধ হবে। তবে এটি শরিয়তগত বাধ্যবাধকতা নয়; বরং সহযোগিতামূলক ব্যবস্থা।

আরও পড়ুন: কোরবানি না করে আকিকা করা যাবে?

রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘যার সামর্থ্য আছে কিন্তু কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২৩) এখানে ‘সামর্থ্যবান’ শব্দটি নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ইসলামে নারীর স্বতন্ত্র সম্পদের মালিকানা স্বীকৃত হওয়ায়, সামর্থ্য থাকলে ইবাদতের দায়ভারও তার ওপর বর্তায়।

মোটকথা, ইসলামে কোরবানি একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইবাদত, যা সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়- সামর্থ্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত। তাই কোনো নারী যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব; বাবা বা স্বামী জীবিত থাকলেও।

স্বর্ণালঙ্কারের সঙ্গে সামান্য নগদ অর্থ বা সঞ্চয় থাকার কারণে অনেক নারী অজান্তেই এই ওয়াজিব ইবাদতের আওতায় পড়ে যান। অতএব, সম্পর্ক নয়, সামর্থ্যই কোরবানির মূল ভিত্তি; এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানা প্রতিটি মুসলিম নারীর জন্য জরুরি।

দ্রষ্টব্য: ব্যক্তিগত মাসয়ালা বা জটিল পরিস্থিতিতে বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উত্তম।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর