হজ বা ওমরাশেষে সৌদি আরব থেকে ফেরার পথে প্রিয়জনদের জন্য জমজমের পানি নিয়ে আসা পবিত্র ঘর সফরকারীদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত রেওয়াজ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- مَاءُ زَمْزَمَ لِمَا شُرِبَ لَهُ ‘জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, তা-ই পূরণ হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩০৬২) তবে এই পানি বিমানে বহনের ক্ষেত্রে সৌদি সিভিল এভিয়েশন অথরিটির (জিএসিএ) সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে, যা না জানার কারণে প্রতিবছর বিমানবন্দরে হাজারো যাত্রীকে অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
নির্ধারিত পরিমাণের সীমা
সৌদি কর্তৃপক্ষের বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন হজ বা ওমরাযাত্রী সর্বোচ্চ ৫ লিটারের একটি বোতল দেশে নিয়ে আসতে পারবেন। আগে এই সীমা ছিল ১০ লিটার, যা বর্তমানে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। নির্ধারিত পরিমাণের বেশি বহনের চেষ্টা করলে বিমানবন্দরে তা জব্দ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। নতুন নিয়ম না জেনে ১০ লিটারের বোতল কিনে আসা অনেক যাত্রী এ কারণে বিমানবন্দরে বিপাকে পড়েছেন।
ভিসার ধরন অনুযায়ী নিয়ম
হজ ও ওমরা ভিসাধারীদের জন্য জমজমের পানি বহনের সুযোগ নিশ্চিত থাকে। তবে পর্যটন বা ভিজিট ভিসায় আসা যাত্রীদের ক্ষেত্রে এই সুবিধা সাধারণত প্রযোজ্য নয়। কোনো পর্যটক যদি ‘নুসুক’ অ্যাপের মাধ্যমে ওমরার বিশেষ অনুমতি নিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি পানি বহন করতে পারবেন কি না- সে বিষয়ে ভ্রমণের আগেই সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের কাছ থেকে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
বিজ্ঞাপন
বোতল ও প্যাকেজিংয়ের শর্ত
বোতলের ধরন নিয়েও নির্ধারিত নিয়ম রয়েছে। মক্কা থেকে নিজে পানি ভরে বা সাধারণ বোতলে প্যাক করে আনা অনুমতির আওতার বাইরে। পানি অবশ্যই ‘কিং আবদুল্লাহ জমজম প্রজেক্ট’ থেকে সরবরাহকৃত, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিলগালা এবং প্লাস্টিক মোড়ানো অফিসিয়াল বোতলে হতে হবে। জেদ্দা, মদিনা বা তায়েফ বিমানবন্দরের নির্ধারিত কাউন্টার থেকে এই বোতল সংগ্রহ করা যায়।

চেকড লাগেজে রাখা যাবে না
এটি সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তির জায়গা। জিএসিএ’র নীতিমালা অনুযায়ী, চেকড লাগেজের ভেতরে জমজমের পানিসহ যেকোনো তরল বহনে বিধিনিষেধ রয়েছে। অনেক যাত্রী সুটকেসের ভেতরে ছোট ছোট বোতলে পানি ভরে নেওয়ার চেষ্টা করেন; স্ক্যানিংয়ে ধরা পড়লে তা জব্দ হয়, পাশাপাশি লাগেজের কাপড় ও মালামাল ভিজে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। ৫ লিটারের বোতলটি বিমানবন্দরের নির্দিষ্ট কাউন্টারে আলাদাভাবে চেক-ইন করাতে হবে।
বিমানবন্দরভেদে পার্থক্য
সব বিমানবন্দরে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ থেকে কেবল হজ ও ওমরা ভিসাধারীরা পানি সংগ্রহ ও বহন করতে পারবেন। মদিনার প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ বিমানবন্দর থেকে সকল আন্তর্জাতিক যাত্রী নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পানি বহন করতে পারবেন। রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দর থেকে সৌদি এয়ারলাইন্স, এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, গালফ এয়ারসহ প্রায় সব বড় এয়ারলাইনই ৫ লিটার পানি বিনামূল্যে বহনের সুযোগ দেয়।
আরও পড়ুন: জমজমের পানি পানের পদ্ধতি ও দোয়া
বাংলাদেশি হাজিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সৌদি এয়ারলাইন্স হজযাত্রীদের ক্ষেত্রে সাধারণত নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জমজমের পানি সরবরাহ করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ঢাকা বা চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সরাসরি যাত্রীর হাতে ৫ লিটারের বোতল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তবে ওমরাযাত্রী বা অন্য এয়ারলাইনের যাত্রীদের ক্ষেত্রে সৌদি বিমানবন্দর থেকে নিজ দায়িত্বে বোতল সংগ্রহ ও চেক-ইনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।

যাত্রার আগে যা মনে রাখবেন
বিমানবন্দরে শেষ মুহূর্তের ঝামেলা এড়াতে কয়েকটি বিষয় আগেভাগে নিশ্চিত করা দরকার। অনুমোদিত কেন্দ্র থেকে সিলগালা বোতল সংগ্রহ করতে হবে এবং বিমানবন্দরের নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে প্লাস্টিক র্যাপিং করিয়ে নিতে হবে। বোতলের গায়ে নিজের নাম, পাসপোর্ট নম্বর ও ফ্লাইট নম্বর লিখে রাখলে হারিয়ে গেলে সহজে শনাক্ত করা যাবে। হজ মৌসুমে নির্ধারিত কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন পড়ে- তাই সৌদি আরব ছাড়ার অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগেই প্রক্রিয়াটি সেরে নেওয়া উচিত।
নিয়মাবলি সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয় এবং এয়ারলাইনভেদেও তারতম্য থাকে। তাই ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের প্রকাশিত নীতিমালা ও সৌদি কর্তৃপক্ষের বর্তমান নির্দেশনা যাচাই করে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।
তথ্যসূত্র: জিএসিএ; সৌদি হজ ও ওমরা মন্ত্রণালয়; কিং আব্দুল্লাহ জমজম ওয়াটার প্রজেক্ট; সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের প্রকাশিত সর্বশেষ নির্দেশিকা




