মদিনা মুনাওয়ারা। ইসলামের ইতিহাসের এক অনন্য ভূখণ্ড। হিজরতের পর মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) যখন এই শহরে এলেন, তখন সুপেয় পানির সংকট ছিল তীব্র। সেই সংকট মোকাবিলায় কূপ খনন ও পুরনো কূপের সংস্কারে নবীজি (স.) ও সাহাবায়ে কেরাম সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
এই কূপগুলোর মধ্যে কয়েকটি সহিহ হাদিস ও নির্ভরযোগ্য সিরাত গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লিখিত, ফলে ইসলামের ইতিহাসে এদের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে জানা প্রয়োজন, মদিনায় বহু কূপ ছিল এবং সব কূপের সমান দালিলিক মর্যাদা নেই। আধুনিক পর্যটন সাহিত্যে প্রচলিত ‘সাতটি ঐতিহাসিক কূপ’ নামে যে তালিকা দেখা যায়, সেটি মূলত ইতিহাস ও ভূগোলের সমন্বয়; হাদিসের পরিভাষায় ‘সাত’ সংখ্যাটি নির্দিষ্ট নয়।
বিজ্ঞাপন
হাদিস ও সিরাতে সুপ্রমাণিত তিনটি কূপ
১. বীরে রূমা: উসমান (রা.)-এর সদকার কূপ
মদিনার সবচেয়ে সুপরিচিত কূপ। হিজরতের পর পানির সংকটে একজন ইহুদি ব্যক্তি এই কূপের পানি বিক্রি করতেন। নবীজি (স.) ঘোষণা করলেন, ‘যে কেউ এই কূপ কিনে মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করবে, তার জন্য জান্নাতে পুরস্কার।’ হজরত উসমান (রা.) ১২ হাজার দিরহামে কূপটি ক্রয় করে সকলের জন্য উন্মুক্ত করেন। সূত্র: সহিহ বুখারি, কিতাবুল ওসায়া, তিরমিজি: ৩৭০৩)
বর্তমান অবস্থা: সৌদি সরকারের তত্ত্বাবধানে, চারপাশে খেজুর বাগান ও সুরক্ষাপ্রাচীর।

বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: কোরআনের আলোকে প্রিয়নবী (স.): মানবতার জন্য আল্লাহর শ্রেষ্ঠ উপহার
২. বীরে আরিস: আংটির কূপ
মসজিদে কুবার নিকটবর্তী। নবীজি (স.) জীবনের শেষ বছরগুলোতে কূপের পাড়ে বিশ্রাম নিতেন। তাঁর দেওয়া একটি আংটি হজরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে এই কূপে পড়ে হারিয়ে যায়। সূত্র: সহিহ বুখারি: ৫৮৭৮, ৫৮৭৯)
বর্তমান অবস্থা: বিশেষ লোহার বেষ্টনী দিয়ে সুরক্ষিত।
৩. বীরে ঘার্স: গোসলের পানির কূপ
নবীজি (স.) অজুর কাজে ব্যবহার করতেন এবং ইন্তেকালের পর অসিয়তের মাধ্যমে এই কূপের পানিই তাঁকে গোসলের জন্য ব্যবহার করা হয়। সূত্র: ইবনে সাদ ‘তাবাকাতুল কুবরা’, ইমাম সামহুদি ‘ওয়াফা আল-ওয়াফা’
বিশেষত্ব: হাদিস সনদের বিচারে মুরসাল হলেও ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে সুপ্রতিষ্ঠিত।
আরও পড়ুন: নবীজির নির্দেশ পালনে সাহাবিদের ব্যাকুলতা
ইতিহাস গ্রন্থে উল্লিখিত আরও কিছু কূপ
বীরে বুজাআহ: মদিনার আল-আলাকিয়া এলাকায় সুনানে আবু দাউদের হাদিস (নং ৬৭) অনুযায়ী, নবীজি (স.) পানির পবিত্রতা সংক্রান্ত একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। মূলত পানির বিধান বিষয়ক আলোচনার জন্য বিখ্যাত।
বীরহা (আবু তালহার বাগানের কূপ): হজরত আবু তালহা আনসারি (রা.) তাঁর প্রিয় ‘বায়রুহা’ বাগান সদকা করেছেন। এখানে একটি কূপ ছিল। ঐতিহাসিক মানচিত্রে সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে কিছুটা মতভেদ আছে।

বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণ
- সৌদি হেরিটেজ কমিশন ও মদিনা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি কূপগুলোকে জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
- বীরে রূমা ও বীরে আরিস দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
- কূপের ওপর লোহার জালি ও কাঁচের আবরণ স্থাপন করা হয়েছে যাতে গভীরতা ও পানি দেখা যায়।
- পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের কারণে সরাসরি পানি পান নিয়ন্ত্রিত।
আরও পড়ুন: নবীজির দাম্পত্য দর্শন: সুখী পরিবারের সোনালি নীতি
বিশেষ সতর্কতা
মদিনার এই কূপগুলো পরিদর্শন করা হজ বা ওমরার কোনো আবশ্যিক ইবাদত নয়। এগুলো ইসলামের ইতিহাসের মূল্যবান নিদর্শন এবং নবীজি (স.) ও সাহাবিদের জীবনের সাক্ষী। তাই বাড়াবাড়ি বা ভিত্তিহীন ফজিলত বর্ণনা থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।
মদিনার আধুনিক নগরায়নের মধ্যে এই কূপগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ইসলামের প্রাথমিক যুগের সংগ্রামী দিনগুলোর কথা, যখন একটি কূপের পানি ছিল মূল্যবান সম্পদ। ইতিহাসের এই সত্যিকারের সাক্ষীগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকার যোগ্য।
তথ্যসূত্র: বুখারি; মুসলিম; আবু দাউদ; তিরমিজি; তারিখ আল-মদিনা, ইবনে শাব্বাহ; ওয়াফা আল-ওয়াফা, ইমাম সামহুদি; তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সাদ




