- জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বদলে গেছে রাজনীতির মাঠ
- ফেরারি-কারাবন্দী নেতাকর্মীরা ঘরে ফেরায় স্বস্তি
- ভোটারের কাছে ছুটলেও ভোটের দিনক্ষণ নিয়ে আছে শঙ্কা
- নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র হলে মাঠে নামার হুশিয়ারি নেতাদের
দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের গত দেড়যুগ কেটেছে অনেকটা দৌড়ের ওপর। ঈদ উৎসব থেকে পারিবারিক আয়োজন কোথাও অংশগ্রহণের সুযোগ পাননি দলটির বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী। কখনো ফেরারি জীবন, কখনোবা কারাগারের চার দেয়ালে বন্দি থাকতে হয়েছে সক্রিয় নেতাকর্মীদের। কিন্তু গত ৫ আগস্টের পর সেই দৃশ্য বদলে গেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে টানা চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে থাকা আওয়ামী লীগের পতনের পর স্বস্তি ফিরেছে দলটির রাজনীতির মাঠে। দীর্ঘ ১৬ বছর যাদের ঈদে আনন্দ বলতে কিছুই ছিল না তারাও এখন ফুরফুরে মেজাজে।
বিজ্ঞাপন
তবে তৃনমূলের নেতাকর্মীরা ঘরে ফিরলেও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মাঝে স্বস্তির ঈদেও নানা শঙ্কা ভর করেছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে এখনো নির্বাচনি রোডম্যাপ না আসা, ছাত্রদের হাতে গড়া নতুন রাজনৈতিক দলের গতিপ্রকৃতি নিয়ে শঙ্কা আছে শীর্ষ নেতাদের মাঝে।
যদিও প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী জুনের মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হতে পারে। আর এটা ধরে এগুতে চাচ্ছেন বিএনপির প্রার্থীরা। যে কারণে সাবেক একাধিকবারের সংসদ সদস্য, একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে দলের চিঠি পাওয়া নেতা এবং একেবারে প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহীরা নিজ নিজ এলাকায় কাজ শুরু করেছেন।
আরও পড়ুন
রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি ফখরুলের
জানা গেছে, বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগ ঢাকায় ঈদ করলেও তুলনামূলক তরুণ ও প্রার্থী হতে আগ্রহীরা রমজানে মাসে এলাকায় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলে যেন নির্বাচন করতে বেগ পেতে না হয়, সে কারণে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন অনেকে।
বিজ্ঞাপন
বিগত নির্বাচনে ঝিনাইদহ-৩ আসনের (মহেশপুর-কোটচাঁদপুর) থেকে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন বিএনপির সহ তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আমিরুজ্জামান খান শিমুল। এবার চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়ার জন্য মাঠ তৈরি করছেন।
ঢাকা মেইলকে আমিরুজ্জামান খান শিমুল বলেন, ‘দল কাকে মনোনয়ন দেবে সেটা হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত। তবে বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে তৃনমূলের নেতাকর্মীদের সুখ-দুঃখে কাছে থাকার চেষ্টা করেছি। এখনো নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছি।’
বিএনপি চেয়ারপারসনের একজন উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নির্বাচন সরকারকে দিতেই হবে। কিন্তু কবে দেবে সেটা পরিষ্কার না হওয়ায় নানা ধরণের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। যে কারণে ৫ আগস্টের পর স্বস্তি ফিরলেও রাজনীতি অনিশ্চয়তা বাড়ছে।’
বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতাও রাজনীতির মাঠে চাপে রাখার চেষ্টার অভিযোগ প্রকাশ্যে বলছেন। তাদের কণ্ঠে নির্বাচনকে ঘিরে নানা শঙ্কার কথাও উঠে আসছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বিএনপির অনেক এমপি-নেতাকর্মীকে গুম-খুনের মধ্য দিয়ে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল শেখ হাসিনা। কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ১৬ বছর মাথা উঁচু করে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার নেতৃত্বে আপসহীন আন্দোলন করেছে বিএনপি। এখন আবার বিএনপিকে নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কিন্তু কোনো ষড়যন্ত্রই বিএনপির ক্ষতি করতে পারবে না। কারণ বিএনপি জনগণের কল্যাণে কাজ করে।’
নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বিএনপি এখনো রাস্তায় নামেনি। জনগণের স্বার্থ বিঘ্ন হলে বিএনপি আবারও মাঠে নামবে। জনগণকে ভোট থেকে বঞ্চিত করতে নানা ষড়যন্ত্র হচ্ছে, বিএনপি তা হতে দেবে না।’
কে কোথায় ঈদ করবেন বিএনপি নেতারা
অর্ধযুগের বেশি সময় পর পরিবারের সঙ্গে লন্ডনে এবার ঈদ করবেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, দুই পুত্রবধূ ও নাতনিদের সঙ্গে ঈদ করবেন তিনি।
ঈদের দিন বিএনপি চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিএনপির সিনিয়র নেতারা ভার্চুয়ালি শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। এছাড়া ঈদের দিন সকালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মাজারে ফাতেহা পাঠ ও দোয়া করবেন দলের সিনিয়র নেতারা।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকায় ঈদ করবেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান ও সালাউদ্দিন আহমেদ ঢাকায় ঈদ করবেন। এর মধ্যে সালাউদ্দিন আহমেদের নিজ এলাকা কক্সবাজারে যাওয়ার কথা রয়েছে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান ও অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন লন্ডনে ঈদ করবেন। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঢাকায় ঈদ করবেন।
এছাড়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান ও আবদুল আউয়াল মিন্টু ঢাকায়, বরকত উল্লাহ বুলু নোয়াখালী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ঢাকায় এবং নির্বাহী কমিটির সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু নাটোরে নিজ এলাকায় ঈদ করবেন। যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন নরসিংদীতে, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি লক্ষ্মীপুরে ঈদ করবেন।
যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স ময়মনসিংহে ও আব্দুস সালাম আজাদ মুন্সীগঞ্জের নিজ নির্বাচনি এলাকায় ঈদ করবেন। ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল গাজীপুরের নিজ নির্বাচনি এলাকায়, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল খুলনার নিজ নির্বাচনি এলাকায় ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীম সিরাজগঞ্জের নিজ নির্বাচনি এলাকায় ঈদ করবেন।
কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সহ-সম্পাদক, বিএফইউজের মহাসচিব ও বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সদস্য সচিব কাদের গনি চৌধুরী চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে নিজ নির্বাচনী এলাকায় ঈদ করবেন।
কেন্দ্রীয় সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু নাটোরে নিজ নির্বাচনি এলাকায় ঈদ করবেন। কেন্দ্রীয় নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল নিজ এলাকা জামালপুরের মেলান্দহে ঈদ করবেন। নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ নিজ এলাকা বরিশালে আছেন, ঈদের দিন ঢাকায় থাকবেন। সহ-অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সুমন ও নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল বিদেশে রয়েছেন, প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন ঢাকায় ঈদ করবেন।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক ও সদস্য সচিব মোস্তফা জামান ঢাকার নিজ এলাকায় ঈদ করবেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ও সদস্য সচিব তানভির আহমেদ রবিন ঢাকায় ঈদ করবেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রায় ১৭ বছর পর বিএনপি নেতাকর্মীরা তাদের পরিবারের সঙ্গে নির্ভয়ে ঈদ কাটাবেন, এটা অত্যন্ত স্বস্তির খবর।
দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে রমজানে এবং ঈদকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করা হবে। রমজানজুড়ে ইফতার পার্টিসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেছি। চেষ্টা করেছি সাধ্যের মধ্যে অসহায়, খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে। এই ধারা অব্যাহত থাকবে।’
বিইউ/এমএইচটি