পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন হয়েছে, যাদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তারিখ ঘোষণা না হলেও বছরখানেকের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। তবে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত স্বচ্ছ ভোটার তালিকা। এজন্য বর্তমান কমিশন কোনো ফাঁক-ফোকর না রেখে একটি গ্রহণযোগ্য ভোটার তালিকা করার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ইসি ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এক্ষেত্রে অজ্ঞাত ও দ্বৈত ভোটার এবং রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে শতভাগ নির্ভুল তালিকা তৈরি করতে চায় সাংবিধানিক সংস্থাটি।
তবে নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছ ভোটার তালিকা করতে চাইলেও এ ক্ষেত্রে তাদের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসির এক কর্মকর্তা জানান, ডাটা এন্ট্রি অপারেটরদের অবহেলার কারণে ক্রস ম্যাচের বিড়ম্বনা দেখা দিয়েছে। কেননা, কেউ ভোটার হওয়ার জন্য এলে আঙ্গুলের ছাপ ৬০ শতাংশ না পেলে তা সার্ভারে আপলোডের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তাড়াহুড়োর কারণে সেই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। ফলে অনেকের আঙ্গুলের অসম্পূর্ণ ছাপ অন্যের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। আবার দ্বৈত ভোটার হওয়ার সুযোগও থেকেই যাচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, একদিকে সংশিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে প্রথমবার আঙ্গুল না দিয়ে কেউ যদি ভোটার হন, তাহলে দ্বিতীয়বার আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে ভোটার হতে পারবেন। আবার কেউ প্রথমবার আঙ্গুলের ছাপ দিলেও দ্বিতীয়বার পায়ের আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে ভোটার হওয়ার সুযোগ থেকে যায়। ভোটার তালিকাকে শতভাগ নির্ভুল করতে এই চ্যালেঞ্জটিকেই বড় করে দেখছে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থানা সংস্থাটি।
তবে চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ভোটার তালিকা স্বচ্ছ করার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর।
তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়নে প্রতারণাকারীদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করব। এনআইডিকে পরিষ্কার করতে যত সময় প্রয়োজন হবে আমি ওই সময় পর্যন্ত যুদ্ধ করতে থাকব।
দেশে দ্বৈত ভোটার ৪ লাখ ৮৯ হাজার
ইসির তৈরি এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে বর্তমান দ্বৈত ভোটার রয়েছে চার লাখ ৮৯ হাজার ২৭৮ জন। এ পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কমিটির সভা হয়েছে দুই হাজার ৫২০টি, যেখানে মাত্র ২৫ হাজার ৮২৪ জনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। আর এ সংক্রান্ত মামলা রয়েছে ১৭৯টি।
এ বিষয়ে ইসির এনআইডি অনুবিভাগের আইটি শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, আন-আইডেন্টিফাইড দ্বৈত ভোটার খুঁজে পাওয়া যায় না। এজন্য কেবল অভিযোগ এলেই ব্যবস্থা নেওয়া যায়। অন্যদিকে আইডেন্টিফাইড দ্বৈত ভোটার চিহ্নিত হওয়ার পর আইডি ব্লক করে দিয়ে সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে। তবে এই সংখ্যাও খুবই নগণ্য। সাড়ে চার লাখ ৮৯ হাজার যে সংখ্যার কথা বলা হচ্ছে, সেটা আসলে প্রকৃত সংখ্যা নয়। দিন বা মাস অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সংখ্যা ওঠানামা করবে।
গত বছর এ সংখ্যা ছিল সাড়ে পাঁচ লাখ। এ বছর কিন্তু কমে এসেছে। আগামী বছর কিন্তু আবার বাড়তেও পারে। কেননা, সমস্যার সমাধান করার পরও আমরা সিস্টেমে সংশ্লিষ্ট তথ্য রেখে দিই, যেন ভবিষ্যতে পুনরায় আবেদন করলে ম্যাচ করে। এছাড়া নতুন করে যারা দ্বৈত ভোটার হচ্ছেন বা হওয়ার চেষ্টা করছেন তাদের সংখ্যাও আগের সংখ্যার সঙ্গে যোগ হচ্ছে।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর ঢাকা মেইলকে বলেন, দ্বৈত ভোটারের দুটি বিষয় আমরা করতে পারি। একটি হলো আমরা লক করে দিতে পারি। তারপরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যখন তার প্রয়োজন হবে তখন এলে আমরা একটা রেখে আরেকটি ছেড়ে দিতে পারি। আরেকটি বিষয় হলো, যেহেতু সে দুইবার ভোটার রয়েছে আমরা তার বিরুদ্ধে মামলা করে দিতে পারি। তবে মামলা না করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ সমস্যা সমাধান করা হয়।
নির্বাচনের আগে দ্বৈত ভোটার সমস্যার সমাধান হবে কি- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি তথ্য পেলে এগুলো সমাধান করে ফেলব। দ্বৈত ভোটার থাকবে কাগজে-কলমে, বাস্তবে থাক সেটা আমি চাই না।
ভোটার তালিকায় একটি ভোটও উল্টাপাল্টা থাকলে সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে জানিয়ে তিনি বলেন, চিহ্নিত দ্বৈত ভোটারের সবার আইডি কার্ড লক করা রয়েছে। ফলে তারা ভোটার তালিকায় আসতে পারবে না বা আসার সুযোগও নেই। একটি দ্বৈত ভোটার বা একটি রোহিঙ্গাও যদি ভোটার তালিকায় থাকে তাও আমি বলব, আমার ভোটার তালিকা দূষিত। আর আমি দূষিত ভোটার তালিকা দেব না। শুদ্ধ ভোটার তালিকা প্রস্তুতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ইতোমধ্যে সরকার আগামী ডিসেম্বরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনার কথা বলেছে। আর সে অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন তার প্রাথমিক প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছে। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নির্বাচনের ভোটার তালিকা হালনাগাদ যা শেষ হবে জুনে। সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ যেটির আইন সংশোধনের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য দেওয়া হয়েছে। নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দেওয়ার লক্ষে আবেদন আহ্বান করেছে নির্বাচন কমিশন। এছাড়া পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধনের জন্য বিদ্যমান নিবন্ধিত পর্যবেক্ষক সংস্থার পুনঃমূল্যায়ন কাজ চলমান। এর বাইরে নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, ব্যালট পেপার তৈরির মতো কাজগুলো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর শুরু করা হয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন ইতোমধ্যে বলেছেন, আমরা প্রস্তুতি শুরু করেছি ডিসেম্বরকে টার্গেট করে। আশা করি সবার সহায়তায় অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারব।
সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৩৭ লাখ ৩২ হাজার ২৭৪ জন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ চলমান রয়েছে। এতে আরও প্রায় ৫৭ লাখ ভোটার আগামী জুনে তালিকায় যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ইসি।
এমএইচএইচ/জেবি