শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

ভারতের তরুণদের আন্দোলন কোন পথে? 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৪ পিএম

শেয়ার করুন:

ভারতের তরুণদের আন্দোলন কোন পথে? 
নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের গাড়ি আটকে দাঁড়িয়ে আছেন বিক্ষোভকারী এক তরুণী: ছবি রয়টার্স

ভারতের রাজনীতিতে নতুন এক অস্বস্তির নাম হয়ে উঠেছে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন। দেশের নির্বাচনব্যবস্থা, ভোটাধিকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় বিতর্কে রূপ নিয়েছে। আন্দোলনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি। আর এই দাবিকে ঘিরেই দিল্লিতে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘাত, ধরপাকড় ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়, চলমান আন্দোলন নরেন্দ্র মোদির সরকারকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে— তরুণদের এই প্রতিবাদ কি নির্বাচনী সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হবে?

বিশ্লেষকরা বলছেন, তরুণদের বিক্ষোভ এবং বিরোধী দলের প্রতি ক্রমবর্ধমান সমর্থন ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদীর জন্য সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে, যেখানে দেশের ১০০ কোটি ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই ৩০ বছরের কম বয়সী। 

ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্দোলনকর্মী যোগেন্দ্র যাদব বলেন, ‘জাতি হঠাৎ করেই তার কণ্ঠ খুঁজে পেয়েছে। আমি বলব না যে এটি মোদী শাসনের পতনের সূচনা, তবে এটি নিশ্চিতভাবেই পতনের সূচনা।’

সিইসি কেন এখনো পদত্যাগ করছেন না?

ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এবং তরুণদের দল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-সহ আন্দোলনকারীদের মূল দাবি দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। কিন্তু রাস্তায় বিক্ষোভের চাপ তৈরি হলেও তার পদত্যাগ নিয়ে কোনো আলোচনাই করছে না মোদি সরকার। 

ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির মতো একই পদ্ধতি ও একই ধরনের সাংবিধানিক ভিত্তিতে পদ থেকে অপসারণ করা যায়। এর জন্য লোকসভায় অন্তত ১০০ জন অথবা রাজ্যসভায় অন্তত ৫০ জন সদস্যের স্বাক্ষরসহ অপসারণ প্রস্তাব জমা দিতে হয়। 

প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কক্ষে মোট সদস্যসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন হয়। 

হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, গত মার্চে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী ‘ইন্ডিয়া জোট’ জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের উদ্যোগ নিয়ে সংসদের দুই কক্ষেই নোটিশ জমা দিয়েছিল। কিন্তু লোকসভার স্পিকার ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সেই নোটিশগুলো গ্রহণ করেননি। অর্থাৎ, বিরোধীদের রাজনৈতিক দাবি থাকলেও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তাদের উদ্যোগ এখন পর্যন্ত বাধার মুখে পড়েছে। 

ভোটার তালিকার বিতর্ক

আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কারণ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (এসআইআর)। 

দেশটির নির্বাচন কমিশনের দাবি- মৃত ভোটার, একাধিকবার নিবন্ধিত ব্যক্তি এবং অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে তালিকা নির্ভুল করাই এসআইআর প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য। কিন্তু বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, যাচাইয়ের নিয়ম এবং প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার শর্তের কারণে বিপুলসংখ্যক প্রকৃত ভোটার তালিকার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে রয়টার্স জানিয়েছে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়া নিয়ে মূল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। 

বিতর্কটি আরও জোরালো হয়েছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর। 

পত্রিকাটির অনুসন্ধান অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি এসআইআর-সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন। বিরোধীরা এই তথ্যকে কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে। 

এ কারণেই আন্দোলন এখন কেবল একজন কর্মকর্তার পদত্যাগের দাবিতে আটকে নেই। ভোটার তালিকা সংশোধন স্থগিত, বাদ পড়া নাম পুনর্বহাল, স্বাধীন তদন্ত এবং নির্বাচনব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিও সামনে এসেছে। 

দমনপীড়ন-ধরপাকড়েও থামছে না প্রতিবাদ

শুক্রবার দিল্লির সেন্ট্রাল পার্কে জাতীয় পতাকা নিয়ে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল তরুণদের দল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে এর আগে জন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনার পর আটক করে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়। তাদের মুক্তি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে নতুন কর্মসূচির ডাক দেন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক।

তবে ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ নামের এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট আগেই দীপকে-কে আটক করা হয়। প্রায় একই সময়ে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরাকেও আটক করে পুলিশ। 

এছাড়াও দিল্লির প্রশাসন সেন্ট্রাল পার্ক দুই দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা এবং কনট প্লেস ও আশপাশের এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা (১৪৪ ধারা) জারি করে।  

dipke

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, সম্ভাব্য জমায়েত নিয়ন্ত্রণে ২৫ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যও মোতায়েন করা হয়েছিল। তবে পুলিশের কঠোর প্রস্তুতি সত্ত্বেও আন্দোলন পুরোপুরি থামেনি। 

দীপকে-নেহা বোরাকে আটকের পরও কনট প্লেস এলাকায় হাজারো মানুষ জাতীয় পতাকা হাতে জড়ো হয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করেন। 

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবি সিং নামে নামে এক আন্দোলনকারী নারী বলেন, ‘আজ যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ না হই—তাহলে আগামীকাল হয়তো আমরা ভারতকে পুরোপুরি একটি ‘পুলিশি রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখব। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এই জাতির গণতন্ত্র বাঁচানোর এটাই হয়তো আমাদের শেষ সুযোগ। আজ যদি আমাদের স্তব্ধ করে দেওয়া হয়, তবে এমন একটি সরকার ক্ষমতায় চলে আসতে পারে, যা আমরা কখনোই চাইনি।’

একসময় সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখা রুবি আরও বলেন, ‘আমরা চাই মোদি যেন ফিরে যান। আমরা মোদির শাসন থেকে মুক্তি চাই। এরা যেভাবে মানুষের ভোট চুরি করেছে এবং আমাদের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের ওপর ব্যাপক কড়াকড়ি চালানো হচ্ছে। কিন্তু আমরা স্লোগান দিতেই থাকব, কারণ লড়াই তো সবে মাত্র শুরু হয়েছে।’

আন্দোলন কোন পথে যেতে পারে?

ভারতের এই অস্থিরতাকে প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, যেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুব-নেতৃত্বাধীন প্রতিবাদ আন্দোলন সরকার পতন ঘটিয়েছে। 

নরেন্দ্র মোদির দল ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের পক্ষ থেকেও একই ধরণের অভিযোগ উঠেছে। 

শুক্রবার উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌতে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আদলে ভারতে সরকার পতনের চেষ্টা করা হচ্ছে। 

rajnath_sing

তিনি বলেন, কংগ্রেস ও তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা তরুণদের শক্তিকে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার না করে রাজনৈতিক সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। চলমান এই আন্দোলন শুধু নির্বাচন কমিশন কিংবা ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নয়; বরং এর পেছনে সরকার পরিবর্তনের বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।

রাজনাথ সিং বলেন, ‘দেশের যুবসমাজকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কেউ কেউ বাংলাদেশের ঘটনার আদলে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাইছে—খোলাখুলিভাবে স্বীকার করছে যে তারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে; অন্যরা নির্লজ্জভাবে সরকার পতনের ডাক দিচ্ছে। এতে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা এবং দেশকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া।’      

এদিকে শুক্রবার অভিজিৎ দীপকে ও নেহা বোরাকে আটকের ঘটনাটি আন্দোলনের জন্য তাৎক্ষণিক ধাক্কা হলেও তা প্রতিবাদ থামিয়ে দিতে পেরেছে—এমন প্রমাণ নেই। বরং দিল্লিতে হাজারো মানুষের সমাবেশ দেখিয়েছে, আন্দোলনের বিষয়টি কয়েকজন নেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তবে আন্দোলন কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তার নির্ভর করবে দাবি আদায়ে ধারাবাহিকতা, সংগঠনগুলোর সমন্বয়, জনসমর্থনের ওপরে।

আন্দোলনকর্মী যোগেন্দ্র যাদব মনে করেন, আন্দোলনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদগুলোকে সমন্বিত কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া। 

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বিরোধী দল, তরুণদের সংগঠন এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন—এমন সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

যাদবের মতে- সিজেপি, আইসা, কংগ্রেসসহ বিরোধী দল এবং সাধারণ নাগরিকেরা একই ইস্যুতে রাস্তায় নামলেও তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও সাংগঠনিক কাঠামো এক নয়। কেউ ভোটাধিকার রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কেউ শিক্ষাব্যবস্থা ও বেকারত্ব নিয়ে ক্ষুব্ধ, আবার কেউ সরাসরি মোদি সরকারের বিরোধিতা করছে। এই ভিন্ন দাবিগুলোকে একটি গ্রহণযোগ্য কর্মসূচিতে ধরে রাখা আন্দোলনের স্থায়িত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের ফেলো রাহুল ভার্মা রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে সতর্ক করেছেন, আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। 

তিনি বলেন, ‘বিজেপির অবস্থান কয়েক মাস আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু এর সরাসরি নির্বাচনী প্রভাব পড়বে কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি’। 

সূত্র: রয়টার্স, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এপি

এমএইচআর

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর