সোমবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৪, ঢাকা

কুশতেপা খাল: তালেবানের মেগা প্রজেক্টে বদলে যাচ্ছে আফগানিস্তান

আবুল কাশেম
প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর ২০২৩, ০৩:২৬ পিএম

শেয়ার করুন:

কুশতেপা খাল: তালেবানের মেগা প্রজেক্টে বদলে যাচ্ছে আফগানিস্তান
তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ- ছবি সংগৃহীত, কুশতেপা খাল নির্মাণের ছবি- ওয়াশিংটন পোস্ট

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে আফগানিস্তান শাসন করছে তালেবান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা নানা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অর্থনৈতিক অবস্থা ফেরানোর চেষ্টা করছে তারা। সম্প্রতি আফগানিস্তানের যে প্রকল্প বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে, সেটি হলো কুশতেপা খাল। নদীর পানি মরুভূমির ভেতর দিয়ে নিয়ে সেচের ব্যবস্থা করতে ২৮৫ কিলোমিটর দীর্ঘ এই খাল খনন করা হচ্ছে। এটি নির্মিত হচ্ছে বিদেশিদের কোনো প্রকার সাহায্য ছাড়াই।

এ নিয়ে সম্প্রতি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রকল্পের বিষয়ে তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে।


বিজ্ঞাপন


সকালের সূর্য তখনও কুঁচকে যাওয়া গমের ক্ষেত দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল। গ্রামবাসীরা ইতোমধ্যেই জলশূন্য আরেকটি দিনের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। গ্রামের কূপে সঞ্চিত বৃষ্টির পানি ৩০ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। একজন কৃষক আতঙ্কিত হয়ে বলেন, ভূগর্ভস্থ পানি পাম্প দিয়ে ওঠেনি। এছাড়া কয়েক দশক আগে হিন্দুকুশ থেকে গলিত তুষারে পরিপূর্ণ খালগুলোও বসন্তে শুকিয়ে যায়।

Qosh-Tepa-canal-1
ছবি: ওয়াশিংটন পোস্ট

গ্রামপ্রধান মোহাম্মদ ইশফাক বলেন, আর মাত্র দুই বছর পর অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের কাছে যদি পানি আসে তাহলে সবকিছু সমাধান হয়ে যাবে।

আফগানিস্তানের দখল নেওয়ার দুই বছর পর তালেবান প্রথম বড় অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রথম ধাপে ১১৫ মাইল লম্বা (১৮৫ কিলোমিটার) কুশতেপা খাল খননের তত্ত্বাবধান করছে। এটি উত্তর আফগানিস্তানের শুকনো সমভূমিজুড়ে আমু দরিয়া নদীর ২০ শতাংশ পানি নিয়ে যাবে। এমনভাবেই এটি ডিজাইন করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


খালটি জোজজান প্রদেশের বিভিন্ন গ্রামের জন্য গেম চেঞ্জার হবে। দেশটির অন্যান্য জায়গার মতো এখানকার বাসিন্দারাও ক্রমবর্ধমান খাদ্য ঘাটতি, চার দশকের যুদ্ধ, টানা তিন মৌসুমের তীব্র খরায় ধ্বংস হয়ে গেছে। আফগানিস্তান জুড়ে গড় তাপমাত্রা গত ৭০ বছরে ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে (৩.২ ডিগ্রি ফারেনহাইট), বা বিশ্বব্যাপী গড় তাপমাত্রার দ্বিগুণ।

ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, খালটি সম্পন্ন হলে এটি সাড়ে পাঁচ লাখ হেক্টর (২১০০ বর্গ মাইল) মরুভূমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে আফগানিস্তানের আবাদযোগ্য জমি এক তৃতিয়াংশ বেড়ে যাবে। এমনকি প্রকল্পের সঠিক প্রয়োগ ও কার্যকর হলে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে সংকটের চরম সীমায় থাকা আফগানিস্তান।

আফগান কর্মকর্তা ও গবেষকদের মতে, ১৯৮০ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের (এনডিসি) প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী জাবিবুল্লাহ মিরি বলেন, 'এটি দেশের প্রতিটি বাড়িতে প্রভাব ফেলতে পারে'।

Qosh-Tepa-canal-2
ছবি: ওয়াশিংটন পোস্ট

তবে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন তালেবান সরকারের জন্য এমন বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের বিষয়। এটিতে উতরে গেলে তালেবান নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারবে। নিজেদের ভাবমূর্তির প্রমাণ দিতে এই প্রকল্পকে মাধ্যম হিসেবে নিয়েছে তালেবান সরকার।

খালের প্রকল্পটি প্রথম আফগান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ দাউদ খানের অধীনে ১৯৭০ এর দশকে ধারণা করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আশরাফ গনির অধীনে ২০২১ সালে নির্মাণ শুরু হয়েছিল। ২০২১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর এই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেয়ায় মনোনিবেশ করে। প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন দেয় তালেবান সরকার, যা আফগানিস্তানের বার্ষিক কর আয়ের প্রায় এক চতুর্থাংশ।

 

প্রায় ৬ হাজার কর্মী দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা প্রকল্পে কাজ করছেন। ১০০ মিটার প্রশস্ত এবং ৮ মিটার গভীর খালটি খনন করতে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি।

 

সিনিয়র তালেবান নেতা ও আফগানিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী আব্দুল গনি বারাদার গত মার্চ মাসে প্রকল্পের বেশ কয়েকটি সাইট পরিদর্শন করেন। তখন তিনি বলেন, 'আল্লাহর প্রশংসা, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে চলছে। যেকোনো মূল্যে এটি সম্পন্ন করা হবে।

পূর্ববর্তী আফগান সরকারের সাবেক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ফয়েজী পানি ও সীমান্ত সমস্যা দেখাশুনা করতেন। তিনি তালেবানের এই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকার পশ্চিমা সমর্থন নিয়ে যা করতে পারিনি, আমরা এখন সেটি করতে পারি।

Qosh-Tepa-canal-3
শুকনো ক্ষেতে নামাজরত এক আফগান- ওয়াশিংটন পোস্ট

এনডিসি কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক সাহায্যে নয়, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ কয়লা খনি থেকে আয়ের মাধ্যমে খালটি নির্মাণ ও অর্থায়ন করা হবে। তবে বিদেশি আফগান বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে কেবল মেগা-খাল নির্মাণের ক্ষেত্রেই নয়- এটি পরিচালনার ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।

জার্মানির ফেডারেল ওয়াটারওয়েজ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একজন পানি সম্পদ প্রকৌশলী এবং গবেষক নজিবুল্লাহ সাদিদ বলেন, খাল নির্মাণের পর এটি পরিচালনা ও মেরামতে প্রচুর পরিমাণে ব্যয় করতে হবে।

 

আফগান কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন সাদিদ। তিনি দেখেছেন তাদের মধ্যে কম্পিউটার বা আধুনিক শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, আমি মনে করি না খাল কর্তৃপক্ষের বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন কর্মচারী আছে। আপনাকে ডিজাইনের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হতে হবে।

 

আমু দরিয়া নদীর পানি প্রবাহে এই খাল যুক্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রতিবেশী উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। এরই মধ্যে দেশ দুটি কাবুলে প্রতিনিধি পাঠিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

মোহাম্মদ ফয়েজী বলেন, আফগানিস্তান অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জর্জরিত। এছাড়া দীর্ঘকাল ধরে আন্তঃসীমান্ত পানি সম্পদের সঠিক পাওনা নিয়ে সংগ্রাম করছে। ইরান, উজবেকিস্তান এবং তুর্কমেনিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের ন্যায্য অংশের চেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে।

Qosh-Tepa-canal-4
ছবি: ওয়াশিংটন পোস্ট

একটি বিবৃতিতে আফগান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র আব্দুল কাহার বালখি স্বীকার করেছেন যে, খালটি পরিচালনা করা এবং পানির বিরোধ একটি বড় সমস্যা। তবে সেগুলো সমাধান করা হবে বলেও জানান তিনি।

এরই মধ্যে খালের নির্মাণ কাজ ১০০ মাইল পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রকল্প আফগানিস্তানের ভবিষ্যত বদলে দেবে বলে আশা বিশেষজ্ঞদের।

একনজরে কুশতেপা প্রজেক্ট
কুশতেপা খাল আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে মেগা প্রজেক্ট। আমু দরিয়া নদীর পানি সেচ এর জন্য সরবরাহ করতে এ প্রজেক্ট। সম্পূর্ণ দৈর্ঘ ২৮৫ কিলোমিটার হবে। প্রথম ফেজের ১০০ কিলোমিটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। খালটি ১০০ মিটার প্রশস্ত এবং ৮ মিটার গভীর।

afghanistan
কুশতেপা খালের চিত্র। ছবি: সংগৃহীত

কোনো প্রকার বিদেশি সাহায্য ছাড়াই এই প্রকল্প নির্মাণ করছে তালেবান। এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১৮০ মিলিয়ন ডলার।

একে

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর