গত এক দশকে দেশের স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বর। মাঝে ২০২০-২০২২ তিন বছর ভয়ঙ্কর বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস সামাল দিতে পারলেও এডিস মশা ও ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বরাবরই ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলো। সরকারের নানা উদ্যোগের পরও ২০২৩ সাল ছিল ডেঙ্গুতে বিপর্যয়ের বছর। আবার এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা ও বাস্তবায়নের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে নানা মহলে। ফলে নগরের রোগ ডেঙ্গু ছড়িয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও।
গণমাধ্যম সারাবছরই ছিল ডেঙ্গুর আধিপত্যের খবর। সরকারের আশ্বাস, হাসপাতালের ভয়াবহ চিত্র, একের পর এক মৃত্যু ও আক্রান্তের রেকর্ড ভাঙা গড়ার খেলা চলেছে বছরজুড়ে। একইসঙ্গে স্যালাইন সংকট, হাসপাতালে সিট সংকট, ডাব-স্যালাইনের সিন্ডিকেট, রোগীদের জিম্মি করে ওষুধের দাম বৃদ্ধি, রক্ত ও প্লাটিলেটের জন্য হাহাকারে কেটেছে বছরটি।
রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলা
চলতি বছর ডেঙ্গু অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ঘটেছে চলতি বছরে। এর আগে ২০১৯ সালে সংক্রমণ ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছালেও করোনার তিন বছর সংক্রমণ কিছুটা কম ছিল। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ১০ হাজার ১৪৮ জন, ২০১৯ সালে এক লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন, ২০২০ সালে এক হাজার ৪০৫ জন, ২০২১ সালে ২৮ হাজার ৪২৯ জন এবং ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গু থেকে দ্রুত সেরে উঠতে যেসব ফল খাবেন
ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ
‘যথাসময়ে ব্যবস্থা না নেওয়ায় ডেঙ্গু এবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে’
ডেঙ্গু চিকিৎসায় এত ব্যয় কেন?
ডেঙ্গু মোকাবেলায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
অথচ চলতি বছরের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে তিন লাখ ২০ হাজার ৪৬০ জন। এরমধ্যে মারা গেছেন এক হাজার ৬৯৭ জন। এ সময় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়েছেন তিন লাখ ১৭ হাজার ৬৬২ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিনিয়তই নতুন রেকর্ড হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা।
সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে সেপ্টেম্বরে। ওই মাসে সারা দেশে মোট ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। ৩৯৬ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। যা এযাবৎকালে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড।
এছাড়া মাস ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল ৫৫৬ জন, মারা যায় ৬ জন। ফেব্রুয়ারিতে ১৬৬, মার্চে ১১১, এপ্রিলে ১৪৩, মে মাসে এক হাজার ৩৬, জুনে পাঁচ হাজার ৯৫৬, জুলাইয়ে ৪৩ হাজার ৮৫৪ জন, আগস্টে ৭১ হাজার ৯৭৬ জন, সেপ্টেম্বরে ৭৯ হাজার ৫৯৮, অক্টোবরে ৬৭ হাজার ৭৬৯, নভেম্বরে ৪০ হাজার ৭১৬ এবং ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ পর্যন্ত আট হাজার ৫৬৯ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আর মার্চ ছাড়া প্রতি মাসেই ডেঙ্গুতে মৃত্যু দেখেছে দেশবাসী। জানুয়ারিতে ৬, ফেব্রুয়ারিতে ৩, এপ্রিলে ২, মে মাসে ২, জুন মাসে ৩৪, জুলাইয়ে ২০৪, আগস্টে ৩৪২, সেপ্টেম্বরে ৩৯৬, অক্টোবরে ৩৫৯, নভেম্বরে ২৭৪ এবং ডিসেম্বরে এখন পর্যন্ত ৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

নগরের পাশাপাশি ছড়িয়েছে সারা দেশে
এত বছর ডেঙ্গু মূলত শহরকেন্দ্রিক হলেও চলতি বছরে এটি নতুন মোড় নিয়েছে। এমনকি ২০২৩ সালের আগে ডেঙ্গুতে সর্বাধিক আক্রান্ত হয় ২০১৯ সালে, সে বছরও রোগটি ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক। তবে চলতি বছর ডেঙ্গু ছড়িয়েছে সারা দেশে।
২০২৩ সালে ঢাকার বাইরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ঢাকার রোগীর প্রায় দ্বিগুণ। ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ৯ হাজার ৮১৭ জন। অপরদিকে ঢাকার বাইরে আক্রান্ত হয়েছেন দুই লাখ ১০ হাজার ৪৬০ জন। মৃত্যুর দিকেও কাছাকাছি অবস্থায় ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চল। ডেঙ্গুতে ঢাকায় মৃত্যু হয়েছে ৯৭৭ জনের, আর ঢাকার বাইরে মারা গেছেন ৭২০ জন।
এ অবস্থার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতির কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সঠিক সময় মশা নিধনের উদ্যোগ না নেওয়ায় এ অবস্থা হয়েছে। আর মশা নিধনের যে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে তার কার্যকরিতা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে তাদের।
অপরদিকে রাজধানীর বাইরের চিকিৎসা সেবার প্রস্তুতির বিষয়ে সবসময় আশ্বস্ত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সংক্রমণের শুরুতে ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মুহাম্মদ খুরশীদ আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা সব স্থানেই মনিটরিং করছি। হাসপাতালগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছি। ভিডিওকলের মাধ্যমে সিভিল সার্জন ও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কদের সাথে কথা বলেছি। তাদেরকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করি ঢাকার বাইরেও রোগী ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হবে না। যদিও ডেঙ্গুর মওসুমে রোগীদের রাজধানীমুখী স্রোত থাকায় নানা ধরনের নির্দেশনা প্রদান করতে দেখা যায়।
আরও পড়ুন
সাধারণ জ্বর নাকি ডেঙ্গু, বুঝবেন যেভাবে
ডেঙ্গু চিকিৎসায় ‘লাগামহীন’ খরচে দিশেহারা সাধারণ মানুষ
জ্বর সারলেও ভোগান্তি যায় না ডেঙ্গু রোগীর
ডেঙ্গু হলে কী খেতে হয়?
সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে হিমশিম অবস্থা
চলতি বছরের মাঝামাঝিতে ডেঙ্গু সংক্রমণ সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায়। এতে রাজধানীর ডেঙ্গু ডেডিকেটেড প্রায় সব হাসপাতালেই দেখা দেয় শয্যা সংকট। জুন মাসে মোট আক্রান্ত রোগীর শতকরা ১৮ শতাংশই শুধুমাত্র মুগদা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়, যেখানে তিনটি ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ড স্থাপন করা হয়। এতে ৫০০ শয্যার হাসপাতালটির কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে দেখা যায়। একই অবস্থা ছিল অন্য হাসপাতালোরও।
সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি রোগীর চাপ ছিল বেসরকারি হাসপাতালেও। আগস্ট মাসে রাজধানীর অন্যতম বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেলে কলেজ ও হাসপাতালে রোগী সংখ্যা ডেঙ্গুর প্রভাবে প্রায় তিনি গুণ বেড়ে যায়। তখন হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. আরফানুল ইসলাম ইরফান জানিয়েছিলেন, আমাদের মেডিসিন বিভাগে ৯০ জনের মতো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল। গাইনি ও পেডিয়াট্রিক্স বিভাগেও ডেঙ্গু রোগী রয়েছে। এটি ৫০০ বেডের হাসপাতাল। তবে সব ক্যাপাসিটি ব্যবহার করে আমরা হয়তো ৩০০ থেকে ৩৫০ পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারি। আন্তঃবিভাগে সাধারণ অবস্থায় একশর মতো রোগী সবসময় ভর্তি থাকে। এখন তা বেড়ে তিন গুণ হয়েছে।
ডেডিকেটেড হাসপাতালেই নানা সংকট
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীতে কয়েকটি হাসপাতালকে ডেঙ্গুর জন্য ডেডিকেটেড করে দেওয়া হয়। কিন্তু নানা সংকট থাকায় সেসব হাসপাতালেও ভোগান্তিতে পড়তে হয় রোগীদের। তেমনই একটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কোভিড হাসপাতাল।
রোগীদের অভিযোগ ছিল— হাসপাতালটিতে সেবার মান ভালো হলেও নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের ঘাটতি রয়েছে। ফলে রোগীদের সেবা পেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিশেষ করে ডেঙ্গু সংক্রান্ত বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য রোগীর স্বজনদের দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এমনকি হাসপাতালটির বিরুদ্ধে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ভর্তি না করারও অভিযোগে ওঠে।
আরও পড়ুন
সব জেলাতেই ছড়িয়েছে ডেঙ্গু, সবাই মিলেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে
ডেঙ্গু জ্বর হলে করণীয়
দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে ডেঙ্গু
ডেঙ্গু রোগীকে কেন ও কখন স্টেরয়েড দেবেন?
ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু, সতর্ক হওয়ার তাগিদ
স্যালাইন সংকট ও সিন্ডিকেট
বছরের শেষের দিকে ডেঙ্গু বেড়ে গেলে দেশে স্যালাইন নিয়ে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় হঠাৎ বাজারে স্যালাইনের সংকট দেখা দেয়। রাতারাতি বাজার থেকে উধাও হয়ে যায় স্যালাইন। সরেজমিন রাজধানীর শাহবাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকা ও মগবাজারের বিভিন্ন ফার্মেসি ঘুরে স্যালাইনের তীব্র সংকটের চিত্র দেখা যায়। বিক্রেতারা দাবি করেন, ডেঙ্গুর কারণে চাহিদা বেড়েছে। ফলে গত দুই সপ্তাহ ধরে সরবরাহ নেই। অনেক ক্রেতা কিনতে চাইলেও তারা দিতে পারছেন না। এ সুযোগে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী স্যালাইনের দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বাজারে স্যালাইনের সংকট থাকলেও হাসপাতালে কোনো সংকট নেই।
এ বিষয়ে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ডা. এহসানুল কবির বলেন, ২০২২ সালে ৬০ লাখ ব্যাগ স্যালাইনের চাহিদা ছিল। এখন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চাহিদা ১০ গুণের বেশি বেড়েছে। এ চাহিদা পূরণ করছে বেক্সিমকো, স্কয়ার, একমি, পপুলার, ওরিয়ন, লিব্রা ও অপসোনিন। রেশনিং প্রক্রিয়ায় হাসপাতালগুলোকে স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে।
অপরদিকে স্যালাইন সংকটের কথা অস্বীকার করেছে স্বাস্থ্য প্রশাসন। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে যেন স্যালাইন সংকট না হয়, সেজন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানান অধিদফতরের এমআইএস শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহাদাত হোসেন। যদিও বছর শেষে স্যালাইন আমদানি করে সরকার।

‘লাগামহীন’ খরচে দিশেহারা ডেঙ্গু রোগী
বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টসের ২০২০ সালে পরিচালিত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যক্তি পর্যায়ের ব্যয়ের মাধ্যমে বা আউট অব পকেট খরচ হয়েছে। ডেঙ্গু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র লক্ষ্য করা যায়। সরকারি হাসপাতালে খরচ কিছুটা কম থাকলে বেসরকারি হাসপাতালে লাগামহীন অবস্থা দেখা যায়। ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট ডেঙ্গু শনাক্ত হয় ২৫ বছর বয়সী বিজয়ার। পরে জ্বরের পাশাপাশি ডায়রিয়ার দেখা দেওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ১৮ আগস্ট বিকেলে রামপুরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। সেখানে চিকিৎসা গ্রহণের পর মোটামুটি সুস্থ অবস্থায় ২০ আগস্ট সকালে হাসপাতাল ছাড়েন বিজয়া। এই সময়ে তার মোট ১২ হাজার ২৯২ টাকা হাসপাতাল বিল পরিশোধ করতে হয়।
অপরদিকে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার প্রধান ভরসা সরকারি হাসপাতালেও খরচের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, চলতি বছরে ডেঙ্গু চিকিৎসায় সরকার মোট ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। রোগীপ্রতি গড় ব্যয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। দুঃখজনকভাবে সরকারের এত টাকা ব্যয়ের পরেও ডেঙ্গু চিকিৎসা পেতে ব্যক্তি পর্যায়েও খরচ হচ্ছে রোগীদের।
এমএইচ/




