শনিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৫, ঢাকা

তারুণ্যের ভাবনায় নারীর এগিয়ে যাওয়া ও প্রতিবন্ধকতা

তানজিদ শুভ্র
প্রকাশিত: ০৮ মার্চ ২০২৫, ০৩:৫৩ পিএম

শেয়ার করুন:

loading/img

“বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”— কাজী নজরুল ইসলামের এই অমর পঙক্তি শুধু কাব্যের সৌন্দর্য নয়, বরং সমাজের এক গভীর সত্যকে তুলে ধরে। মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় নারী ও পুরুষ- উভয়ের অবদান অপরিসীম। তবু ইতিহাসের পাতায়, সমাজের বাস্তবতায় নারীরা অনেকসময় থেকেছেন উপেক্ষিত, বঞ্চিত। 

আন্তর্জাতিক নারী দিবস তাই কেবল উদযাপনের নয়, বরং নতুন করে ভাবার দিন। নারীর ক্ষমতায়ন, সমান অধিকার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা কি এখনো চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে? কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তাদের ভাবনা, স্বপ্ন ও প্রত্যাশার কথা- গ্রন্থনা করেছেন তানজিদ শুভ্র। 


বিজ্ঞাপন


যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য রাখছে

যুগ পাল্টেছে, সময় এগিয়েছে। বর্তমানে পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নারীরা। বর্তমানে সমাজের প্রায় সব খাতেই নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হচ্ছে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের উপস্থিতি শতভাগ। পোশাক শিল্পের কৃতিত্বের সিংহভাগই নারীর। সফল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় অংশই নারী। পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে সরকারি-বেসরকারি ও আধাসরকারী অফিস আদালত, কল-কারখানা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল-ক্লিনিক এবং বড় প্রতিষ্ঠানের মতো আনুষ্ঠানিক কর্মস্থলেও। 

দেশে বর্তমানে ছোট-বড় কয়েক লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার অর্ধেকেরও বেশি নারী। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। ক্ষুদ্রঋণে নারীর অংশগ্রহণ আজ সারা বিশ্বে স্বীকৃত। বাংলাদেশে একজন যে ক্ষুদ্রঋণের ধারণাকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছিলেন, তার নেপথ্যে ছিলো নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ গ্রামীণ অর্থনীতি বিশেষ করে ‘ক্যাশ ইকোনমি’র বড় চালিকাশক্তি। এছাড়া সরকার পরিচালনায়, রাজনীতিতে, প্রশাসনে, সামরিক বাহিনীতে, আইনশৃঙ্খলা বিভাগেও নারীর অবস্থান ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে। নারীর এগিয়ে যাওয়ার অর্থই হলো সমাজ তথা দেশ এগিয়ে যাওয়া। 

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমি বলতে চাই, এভাবে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর এই অগ্রযাত্রা চলতে থাকুক।
লেখক: তাজকিরা হক বেবি, আনন্দমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ময়মনসিংহ


বিজ্ঞাপন


নারীর অগ্রযাত্রা: সংগ্রামের অনির্বাণ শিখা

নারীর এগিয়ে চলার পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ইতিহাস সাক্ষী, নারীকে অবদমিত রাখার জন্য সমাজ তৈরি করেছে অগণিত শৃঙ্খল—অজ্ঞতা, কুসংস্কার, বৈষম্য, শোষণ, সহিংসতা। তবুও নারী থেমে থাকেনি। শত বাধা পেরিয়ে তারা সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ববীক্ষায় নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছে।

জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নারীর লড়াই—শুধু নিজের অধিকারের জন্য নয়, বরং সামগ্রিক মুক্তির জন্য। যোদ্ধা রানী লক্ষ্মীবাই থেকে শুরু করে নেলসন ম্যান্ডেলার সহযোদ্ধা উইনি ম্যান্ডেলা, কিংবা আমাদের বেগম রোকেয়া এবং প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ইত্যাদি—নারী বারবার প্রমাণ করেছে, সংগ্রামই তার অস্তিত্বের ভাষা।

তবুও বৈষম্য রয়ে গেছে—কখনো মজুরিতে, কখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায়, কখনো শারীরিক ও মানসিক স্বাধীনতায়। সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো প্রমাণ করে, নারী এখন আর শুধুই প্রাপকের ভূমিকায় নেই, বরং নেতৃত্বের দাবিদার। জুলাই বিপ্লবসহ নানা গণজাগরণে নারীদের অংশগ্রহণ দেখিয়েছে, তারা কেবল সমতার স্বপ্ন দেখে না, বরং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে শামিল হয়।

নারীর অগ্রযাত্রার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ওপর। প্রয়োজন শিক্ষার বিস্তার, আইনের কঠোর প্রয়োগ, এবং পুরুষতান্ত্রিক গোঁড়ামির অবসান। নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এক বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে, যেখানে নারী কেবল সংগ্রামী নয়, বরং নির্ভয়ে সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রাখতে পারবে।

আজকের নারী দিবস তাই শুধু উদযাপনের নয়, বরং আত্মজিজ্ঞাসার—আমরা কি সত্যিই নারীর অগ্রযাত্রার জন্য প্রস্তুত?
লেখক: শ্রী গৌরাঙ্গ উংকুর সরকার, সরকারি বাঙলা কলেজ, ঢাকা

নারীর অগ্রগতিতে পুরুষ

মা যেমন সন্তান, পরিবার গঠনে ভূমিকা পালন করে থাকে তেমন নারী সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা বোনেরা কিংবা জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের চেতনা দেখলে আমরা তা বুঝতে পারি। বর্তমানে তারা ঘর-সংসার সামলিয়ে হয়ে উঠেছে দেশ সামলানোর চাবিকাঠি। দেশের প্রতিটি সেক্টরে নারীর অবদান অবিস্মরণীয়। যুগে যুগে এমন নজির ছিল। হযরত খাদিজা (রা:) ছিলেন একজন সৎ ব্যবসায়ী। তার কঠোর মনোভাব আর ব্যবসায়ী বিচক্ষণতা থেকে আজ ঘরে ঘরে নারী উদ্যোক্তা।

বেগম রোকেয়ার মতো হাজারো নারী শিক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে নারীর এই অগ্রযাত্রায় দিন দিন বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে পুরুষ। পুরুষের ভয়ংকর রূপের জন্য নারী ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে। তারা যেন হয়ে উঠছে হিংস্র পশুর ন্যায়।  অথচ এরা কারো বোন, মা কিংবা  স্ত্রী। সমাজ সচেতন হওয়ার মূলে নিজেদের সচেতন হওয়া জরুরি। অন্য একজন নারীকে নিজের সম্পর্কের কেউ ভাবা উচিত।  তাহলে হয়ত মনে অনুশোচনা তৈরি হবে। অপরাধ প্রবণতা কমবে। দেশ সমৃদ্ধ হবে।
লেখক: খাদিজা আক্তার সায়মা, সরকারি তোলারাম কলেজ, নারায়ণগঞ্জ

নারীদের অগ্রগতিতে বাধা সমাজের মনোভাব

নারী- এক দামি জাত। সৃষ্টিকর্তা তাদের দিয়েছেন মা হওয়ার সম্মান, এবং এটিই তাদের সবচেয়ে বড় অলংকার। তাই বুঝি পুরুষদের চেয়েও সম্মান প্রাপ্তিতে এগিয়ে নারীরা। সংসার থেকে শুরু করে দেশ পরিচালনা, যুদ্ধের ময়দান, এমনকি মহাকাশেও রয়েছে তাদের বিজয় নিশানা। এতকিছু সত্বেও তারা সমাজে বাধাহীন ভাবে চলতে পারছে তো? নারীদের অগ্রগতিতে প্রধান বাধা হচ্ছে: তাদের প্রতি সমাজের মনোভাব। এক্ষেত্রে সমাজের নারী-পুরুষ উভয়ই দায়ী। 

একদল অল্প বিদ্যা সম্পন্ন পুরুষ ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের রাখতে চায় অসূর্যস্পশ্যা করে। অথচ, মহানবীর যুগে সবচেয়ে ধনী ও বড়ো ব্যবসায়ী ছিলেন একজন নারী। আবার একদল নারী রয়েছে, যারা স্বাধীনতার ভুল সংজ্ঞা মাথায় এঁটে নেমে পড়েছে নারী স্বাধীনতার নামে শালীনতার বিরুদ্ধে; যেটির ফল সম্বন্ধে কেউই অনবগত নন। 

তবে অবশ্যই কিছু সংখ্যক নারীদের যথোপযুক্ত পদক্ষেপ বেশ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে নারীদের অগ্রগতিতে অসামান্য ভূমিকা রাখছে, যা অনস্বীকার্য। অতএব দেশ ও জাতির উন্নয়নে নারীদের ঘরে বন্দি রাখাও যাবে না, স্বাধীনতার ভুল ব্যাখ্যা দেওয়াও যাবে না। আনতে হবে সমাজের মরীচিকাময় মস্তিষ্কে পরিবর্তনের ছোঁয়া।
লেখক: হিমেল আহমেদ, শহীদ বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাজারীবাগ, ঢাকা

বৈষম্য দূর করে নারী-পুরুষ সমানতালে এগিয়ে যেতে হবে

একুশ শতকে এসেও কমছে না নারীর প্রতি বৈষম্য, অত্যাচার, নিপীড়ন ও ধর্ষণ। বিশ্বের নানা প্রান্তে ধর্ষণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। প্রতি দিনেই পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে ধর্ষণের খবর। সম্প্রতি দেশের নানা জায়গায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ধর্ষণের খবর পাওয়া গেল। নারীর প্রতি অত্যাচার নিপীড়ন আরও একটি চিত্র ফুটে ওঠে বাসা বাড়ির কাজের নারীদের ওপর। 

প্রায়শই দেখা যায় গৃহকর্তা পরিচারিকাকে নির্যাতন করছে, এমন কি ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটেছে সেখানে। এছাড়াও রাস্তাঘাটে বখাটে ছেলেদের দ্বারা ইভটিজিং এর শিকার হচ্ছে নারীরা। এমনকি বখাটেদের দ্বারা ঘটছে এসিড নিক্ষেপের মতো মানবতা বিরোধী ঘৃণ্য কাজ।

একটি জাতির অর্ধেক নারী এবং অর্ধেক পুরুষ। নারী জাতিকে পিছনে ফেলে শুধু পুরুষ দ্বারা কখনোই উন্নতির চূড়ায় পৌঁছানো সম্ভব না। তাই নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করে নারী ও পুরুষ সমানতালে এগিয়ে যেতে হবে তবেই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব। 

নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করে অত্যাচার নিপীড়ন দূর করতে সরকারকে হতে হবে কঠোর। করতে হবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ। পাশাপাশি নারী-পুরুষ সবাইকে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে উৎসাহী করতে হবে। তবেই দূর হবে নারীর প্রতি বৈষম্য, তলানিতে নেমে আসবে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ। নারী দিবসে এইটাই প্রতিজ্ঞা হোক- আর নয় নারী নির্যাতন ও আর নয় যৌন হেনস্থা।
লেখক: তাহমিদুল হাসান আকন্দ, তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

এনএম

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এই ক্যাটাগরির আরও খবর


News Hub