শুক্রবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৫, ঢাকা

ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন ‘লুটপাট’

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১০:১২ পিএম

শেয়ার করুন:

loading/img
  • খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা
  • এক বছরে বেড়েছে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা
  • বিতরণকৃত ঋণের ১০০ টাকার ২০ টাকাই ‘হরিলুট’

দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর অবস্থায় রেখে গেছে পতিত শেখ হাসিনা সরকার। বিগত ১৬ বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাংক খাত। এ সময় ব্যাংকিং সেক্টরে লুটেরা গোষ্ঠীর লুটপাটের তথ্য আড়াল করে রাখা হয়েছিল। নামে-বেনামে নেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ অনেক আগেই খেলাপি হয়ে পড়েছিল। অবলোপন ও বারবার পুনঃতফসিলকরণের মাধ্যমে এসবকে নিয়মিত দেখানো হচ্ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকাশিত হচ্ছে লুটপাটের প্রকৃত চিত্র। বর্তমানে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটির কাছাকাছি চলে গেছে। লুটপাটের উদ্দেশে দেওয়া এসব ঋণের অধিকাংশই বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনতে না পারলে ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়ানো অনেক কঠিন হবে। এই খাতে যেন নতুন করে আর লুটপাট না হয় সেদিকে কঠিন দৃষ্টি রাখতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ১১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। এর মধ্য খেলাপি ঋণ পরিণত হয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ২০ দশমিক ২ শতাংশ। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকে মোট বিতরণ করা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা বেড়েছে। এই হার আগের প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) থেকে কিছুটা বেড়ে ৪২ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে এই হার ১৫ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে।

খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ উপলক্ষে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘খেলাপি ঋণ বেড়েছে। আগেই বলেছিলাম, খেলাপি ঋণ বাড়বে। তবে এখনো খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে বা চাড়ায় পৌঁছায়নি। ব্যাংক থেকে আমানতকারীদের টাকা পেতে কোনো সমস্যা হবে না। ব্যাংক থাকুক বা না থাকুক আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন। কোনো ব্যাংক দুর্বল থাকবেনা। প্রয়োজনে এক ব্যাংকের সাথে অন্য ব্যাংক মার্জ বা একীভূত করা হবে। দুর্বল ব্যাংকগুলো সবল করার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে রেজুলেশন এক্ট খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। সেটা পাস এবং বাস্তবায়ন হলে ব্যাংক খাতে পুরোপুরি স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। ওইসময় মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৮২১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। তার আগে জুন প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।


বিজ্ঞাপন


তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। ওই সময়ের মোট ঋণের যা ৯ শতাংশ। এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এক লাখ ৯৯ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন মানলেই তা করা সম্ভব। খেলাপকারীদের সম্পদ বিক্রি করে খেলাপি ঋণের একটা বড় অংশ আদায় করা সম্ভব। যে কথা গভর্নরও কিছুদিন আগে বলেছেন। খেলাপি ঋণের বড় অংশ শরিয়াহ ব্যাংকগুলোতে। অথচ শরিয়াহ ব্যাংকগুলোতে খেলাপির বিষয়ে কঠোর পলিসি আছে। আমরা যদি পলিসি কার্যকর করার নজির স্থাপন করতে পারি তাহলে খেলাপিতার সংস্কৃতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতাসীন হয় তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এখন ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয়বার ক্ষমতা নেওয়ার সময়ও খেলাপি ঋণ ছিল ৫০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৫১ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা হয়। তৃতীয় দফায় ক্ষমতা নেওয়ার সময় ২০১৮ সালের শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা।

সম্প্রতি অর্থনীতির অবস্থা মূল্যায়নে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন বলছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় যা ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই অর্থ গত ৫ বছরে দেশের জাতীয় বাজেটের চেয়ে বেশি। এ সময়ে প্রতিবছর পাচার হয়েছে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অর্থ পাচারের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) রিপোর্টের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এত বড় অংকের খেলাপি ঋণ উদ্ধার করতে না পারলে ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যাবে। যারা এসব ঋণ নিয়েছে প্রয়োজনে তাদের অ্যাসেট বিক্রি করে হলেও টাকা আদায় করতে হবে। আর যে টাকা পাচার হয়েছে আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় নিয়ে এই টাকা উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে। এখন আমাদের কাছে যা যা অস্ত্র আছে সবগুলাই ইউজ করতে হবে।’

অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ইতোপূর্বে যারা এসব টাকা নিয়েছে তারা ফেরৎ দেওয়ার জন্য নেয় নাই। তারা এটা ভোগ করার জন্য নিয়েছে। আগে কখনও পাচার হওয়া টাকা উদ্ধার হয়েছে এই ধরনের কোনো দৃষ্টান্ত নাই। তারপরও বাংলাদেশ ব্যাংককে চেষ্টা করতে হবে। এসবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

টিএই/এমএইচটি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন