২০২৪ সালের ডিসেম্বরে লেনদেন ২৩১৬ কোটি টাকা
২০২৩ সালের একই সময়ে লেনদেন ছিল ১৫৬৩ কোটি
পাঁচ বছর আগে একই সময়ে লেনদেন ছিল ২৬২ কোটি
দেশে ই-কমার্স খাতের অগ্রযাত্রা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির উন্নয়ন, ইন্টারনেট সংযোগের সহজলভ্যতা, স্মার্টফোন ব্যবহারের বিস্তার এবং ক্রেতাদের অনলাইন কেনাকাটার প্রতি আগ্রহ ই-কমার্স খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে করোনা মহামারির পর থেকে মানুষ অনলাইনে কেনাকাটার দিকে বেশি ঝুঁকছে, যা ই-কমার্স ব্যবসার ব্যাপক প্রসারে সাহায্য করেছে।
বিজ্ঞাপন
বিগত কয়েক বছরে দেশে হাজারো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যেখানে বেশিরভাগই পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, প্রসাধনী, খাদ্যপণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী এবং স্বাস্থ্যসেবা পণ্য বিক্রি করছে। শুধু বড় বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নয়, ফেসবুকভিত্তিক ছোটখাট অনলাইন ব্যবসাও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যা ‘এফ-কমার্স’ নামে পরিচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশে চার লাখের বেশি এফ-কমার্স ব্যবসা সক্রিয় রয়েছে এবং এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এতে করে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা ঘরে বসেই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন, যা কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ই-কমার্সের লেনদেনের পরিমাণ প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ই-কমার্স লেনদেন ছিল দুই হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। যা এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৩ সালে ডিসেম্বরে ছিল এক হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। যেখানে মাত্র পাঁচ বছর আগে এই খাতের লেনদেন ছিল ২৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরে এই খাতের লেনদেন বেড়েছে ১০ গুণের বেশি।
ই-কমার্সের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো সহজ লেনদেন ও দ্রুত ডেলিভারি ব্যবস্থা। গ্রাহকরা ঘরে বসেই পছন্দের পণ্য কিনতে পারছেন এবং ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে পারছেন। বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সহজলভ্যতা অনলাইন কেনাকাটাকে আরও সহজ করে তুলেছে। আগে অনেকেই ক্যাশ অন ডেলিভারি পছন্দ করতেন, কিন্তু বর্তমানে ডিজিটাল পেমেন্টের হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে প্রতারণার আশঙ্কাও কমে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আগে বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করতে হতো, যা সময়সাপেক্ষ ছিল। এখন ই-কমার্সের মাধ্যমে সহজেই সবকিছু পাওয়া যাচ্ছে। শুধু পোশাক বা ইলেকট্রনিক্স নয়, এমনকি গ্রোসারি সামগ্রীও ঘরে বসে অর্ডার করা যায়, যা সত্যিই সময় বাঁচায়।’
ই-কমার্সের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো নানা রকম ছাড় ও অফার। বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেস প্রায়ই মূল্যছাড়, ক্যাশব্যাক এবং ডিসকাউন্ট অফার দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। বিশেষ করে উৎসবের মৌসুমে এসব অফারের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়, যা ক্রেতাদের অনলাইন কেনাকাটায় আরও আগ্রহী করে তুলছে। তবে, অনেকেই অভিযোগ করেন যে, কিছু প্রতিষ্ঠান অফারের নামে প্রতারণা করে। অনেকে অর্ডারের চেয়ে নিম্নমানের বা ভিন্ন পণ্য পান, যা ই-কমার্স খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
মগবাজার এলাকার এক ক্রেতা সাবরিনা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি একবার অনলাইনে একটি পোশাক অর্ডার করেছিলাম, কিন্তু যা পেয়েছি, সেটি একেবারেই ভিন্ন এবং নিম্নমানের ছিল। এরপর থেকে নতুন বা অপরিচিত সাইট থেকে কিছু কিনতে ভয় পাই।’
প্রতারণা ঠেকাতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ই-ক্যাব (ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ই-কমার্স খাতের ওপর কঠোর নজরদারি করছে এবং গ্রাহক প্রতারণা রোধে নিয়মিত ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইতোমধ্যে ডিজিটাল কমার্স পরিচালনার জন্য নতুন গাইডলাইনও প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীদের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বাধ্য করা হয়।
ই-কমার্স খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত ডেলিভারিব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তবে, এটি সব সময় বাস্তবায়িত হয় না, বিশেষ করে ঢাকার বাইরের এলাকায়। অনেক সময় দূরবর্তী অঞ্চলে পণ্য পৌঁছাতে তিন থেকে পাঁচ দিন বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। তবে, বিভিন্ন কুরিয়ার কোম্পানি এখন ই-কমার্সের জন্য বিশেষ সেবা চালু করেছে, যাতে গ্রাহকরা দ্রুত তাদের পণ্য পেতে পারেন।
ই-কমার্স ব্যবসার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘লাইভ সেলিং’। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে অনেকে লাইভে এসে পণ্য বিক্রি করছেন, যা সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এতে ক্রেতারা পণ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে। অনেক উদ্যোক্তা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে সফল হয়েছেন এবং তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছেন।
ই-কমার্স খাতের বিকাশে সরকারের নীতিগত সহায়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি ব্যবসায়ীরা নৈতিকতা মেনে ব্যবসা চালান এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নত করেন, তাহলে বাংলাদেশের ই-কমার্স আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
এ প্রসঙ্গে উদ্যোক্তা সারোয়ার হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি দুই বছর আগে অনলাইনে গয়নার ব্যবসা শুরু করি। প্রথম দিকে শুধু ছবি পোস্ট করতাম, কিন্তু এখন লাইভ সেলিং করি। এতে বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, কারণ ক্রেতারা সরাসরি পণ্য দেখতে পারেন এবং প্রশ্ন করতে পারেন।’
বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত এখন দ্রুত বিকশিত হচ্ছে এবং আগামী কয়েক বছরে এটি আরও বিস্তৃত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ই-কমার্স খাতের বিকাশে সরকারের নীতিগত সহায়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি ব্যবসায়ীরা নৈতিকতা মেনে ব্যবসা চালান এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নত করেন, তাহলে বাংলাদেশের ই-কমার্স আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
টিএই/জেবি