images

ইসলাম

ইসলামি ঘটনার নামে প্রচলিত কিছু বানোয়াট কিসসা

ধর্ম ডেস্ক

২৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:০৩ পিএম

নবীজির ওফাতের সময় মালাকুল মাওতের অনুমতি প্রার্থনা
লোকমুখে নবীজির ওফাতের বিষয়ে এ কিচ্ছাটি প্রসিদ্ধ যে, নবীজির ইন্তেকালের সময় মালাকুল মাউত এক গ্রাম্য বেদুঈনের সুরতে আগমন করেন এবং ঘরে প্রবেশের অনুমতি চান। অনুমতি দেওয়া হলে তিনি ঘরে প্রবেশ করেন এবং বলেন, আল্লাহ আমাকে অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন এবং অনুমতি ছাড়া আপনার পবিত্র রুহ কবজ করতে নিষেধ করেছেন। আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে রুহ কবজ করব, অন্যথায় ফিরে যাব। একপর্যায়ে নবীজি অনুমতি দিলে তারপর তাঁর রুহ মোবারক কবজ করেন। এটি নবীজির ওফাত সংক্রান্ত একটি দীর্ঘ জাল বর্ণনার অংশবিশেষ, যা আবদুল মুনঈম নামক এক ব্যক্তি জাল করেছে। ইবনুল জাওজি (রহ) বলেন- هَذَا حَدِيث مَوْضُوع...وَالْمُتَّهَم بِهِ عبد الْمُنعم بن إِدْرِيس ‘এটি একটি জাল বর্ণনা। আবদুল মুনঈম ইবনে ইদরিস নামে এক ব্যক্তি এটা জাল করেছে। জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ) ও ইবনু আররাক (রহ) ইবনুল জাওজি (রহ)-এর সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষণ করেছেন। (কিতাবুল মাওজুআত, ইবনুল জাওজি: ১/৩০১; আললাআলিল মাছনুআহ, সুয়ুতি: ১/২৫৭; তানজিহুশ শরিআহ, ইবনু আররাক: ১/৩৩১)

শাদ্দাদের বেহেশত
সমাজে ‘শাদ্দাদের বেহেশত’ শিরোনামে বিভিন্ন ধরনের কিসসা প্রচলিত আছে। কেউ কিসসাটি এভাবে বলেন— শাদ্দাদ বিশাল রাজত্ব ও ধন-সম্পদের মালিক ছিল। তার কওমের নবী তাকে দাওয়াত দিলে সে বলে, ঈমানের বদলে কী মিলবে? নবী বললেন, জান্নাত। তখন সে ঔদ্ধত্য দেখিয়ে নিজেই জান্নাত বানাতে শুরু করে। ৩০০ বছর ধরে জান্নাত বানায়; তাতে বিভিন্ন ফলের গাছ লাগায়। প্রাসাদ বানায়, নহর খনন করে ইত্যাদি। এরপর সে যখন সৈন্য-সামন্ত নিয়ে তার বানানো বেহেশতের দিকে রওনা হয়, একদিন একরাতের রাস্তা বাকি থাকতেই আল্লাহ তাকে তার সৈন্য-সামন্তসহ ধ্বংস করে দেন।

কেউ বলে, তার বানানো জান্নাত দেখতে যাওয়ার পথে একটি সুন্দর হরিণ দেখতে পায়। হরিণটি শিকার করতে গিয়ে সে একটু দূরে চলে যায়। এ মুহূর্তে মালাকুল মাউত হাজির হন এবং তার রুহ কবজ করেন। সে তার বানানো জান্নাত নিজেও দেখতে পারে না। আবার কেউ বলে, সে তার বানানো বেহেশতে প্রবেশ করার জন্য যখন এক পা দিল, তখন দ্বিতীয় পা রাখার আগেই মালাকুল মাউত তার রুহ কবজ করে ফেলেন। কারো কারো মুখে এ-ও শোনা যায়, এরপর আল্লাহ তাআলা তার ওই জান্নাত জমিনে ধ্বসিয়ে দেন; মাটির সাথে মিশিয়ে দেন। বালুর মধ্যে যে অংশ চিকচিক করে, তা শাদ্দাদের বানানো বেহেশতের ধ্বংসাবশেষ। এছাড়াও শাদ্দাদের বেহেশতকেন্দ্রিক আরো অনেক কথা সমাজে প্রচলিত আছে। তার বেহেশত কীভাবে বানালো, কতজন শ্রমিক লেগেছে, এর দেয়াল কিসের ছিল, ফটক কিসের ছিল, মেঝে কিসের ছিল, ইত্যাদি। 

শাদ্দাদের বেহেশত বানানোর কিসসা একেবারেই অবাস্তব ও কাল্পনিক; নির্ভরযোগ্য কোনো দলিল দ্বারা তা প্রমাণিত নয়। যারা এটি উল্লেখ করেছেন তারা ইসরাঈলি বর্ণনা থেকে তা এনেছেন। এজন্যই ইমাম ইবনে কাসির ও আল্লামা ইবনে খালদুনসহ আরো অনেকেই এ কিসসাকে অবাস্তব ও কাল্পনিক বলে অভিহিত করেছেন। (তাফসিরে ইবনে কাসির: ৪/৮০২-৮০৩; মুকাদ্দামাতু ইবনে খালদুন: ১/১৭; আলইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাওজুআত ফি কুতুবিত তাফসির: ২৮২-২৮৪)

ওয়ায়েস কারনির জন্য নবীজি জুব্বা দিয়েছিলেন
ওয়ায়েস কারনির বিষয়ে আমাদের সমাজে একটি ঘটনা প্রসিদ্ধ আছে যে, রাসুলুল্লাহ (স.) ওমর ও আলী (রা.)-এর কাছে তাঁর একটি জুব্বা রেখে যান এবং তাদেরকে ওসিয়ত করে যান, তারা যেন এ জুব্বা ওয়ায়েস কারনিকে দেন। পরবর্তীতে তাঁরা ওয়ায়েস কারনিকে সেই জুব্বাটি  দেন। এটি একটি ভিত্তিহীন বর্ণনা। কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে এটি পাওয়া যায় না। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় ওমর (রা.)-এর সাথে ওয়ায়েস করনির সাক্ষাতের ঘটনা এসেছে, কিন্তু উপরোক্ত কাহিনির কথা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে পাওয়া যায় না। 

আল্লামা আলি কারি আলহারাবি (রহ) বলেন- وَكَذَا مَا اشْتهرَ بَيْنَهُمْ مِنْ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوْصَى عُمَرَ وَعَلِيًّا بِخِرْقَتِه لأُوَيْسٍ وَأَنَّهُمَا سَلَّمَاهَا إِلَيْهِ...، فَلا أَصْلَ لَهُ ‘মানুষের মাঝে যে কথা প্রসিদ্ধ আছে যে, রাসুলুল্লাহ (স.) ওয়ায়েস কারনিকে তাঁর জুব্বা মুবারক দেওয়ার জন্য ওমর ও আলী রা.-কে ওসিয়ত করে যান এবং তাঁরা সেটি তার হাতে পৌঁছান...- এ বর্ণনার কোনো ভিত্তি নেই। (দ্র. আলমাছনু ফি মারিফাতিল হাদিসিল মাওজু, বর্ণনা ৪৭৫; কাশফুল খাফা, বর্ণনা ২০৩৫; আলআসরারুল মারফ‚আ, বর্ণনা: ৩৫৬)

আরও পড়ুন: মায়ের সেবায় আল্লাহর সন্তুষ্টি

ইদরিস (আ.) জান্নাত দেখতে গিয়ে আর বের না হওয়া
ইদরিস (আ.) সম্পর্কে একটি ঘটনা প্রচলিত আছে যে, তিনি জান্নাত দেখতে গিয়ে আর জান্নাত থেকে বের হননি। ঘটনাটি এরকম- আল্লাহর নবী ইদরিস (আ.) ছিলেন মালাকুল মাউতের (রুহ কবজকারী ফেরেশতার) বন্ধু। ইদরিস (আ.) তাঁর কাছে জান্নাত-জাহান্নাম দেখানোর আবদার জানালেন। তিনি তাঁকে জাহান্নাম দেখালেন। জাহান্নাম দেখে ইদরিস (আ.) এত বেশি ভয় পেলেন যে বেহুঁশ হওয়ার উপক্রম হলেন। তখন মালাকুল মাউত আপন ডানা দিয়ে তাঁকে আগলে নিলেন। তারপর তাঁকে জান্নাত দেখাতে নিয়ে গেলেন। জান্নাত দেখা শেষ হলে মালাকুল মাউত বললেন, দেখা হয়েছে, এবার চলুন। তিনি বললেন, কোথায় যাব। বললেন, যেখান থেকে এসেছেন। তখন ইদরিস (আ.) বললেন, না, জান্নাতে প্রবেশ যখন করেছি, এখান থেকে আর বের হব না। তখন মালাকুল মাউতকে বলা হল, তুমি কি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাওনি? জান্নাতে একবার যে প্রবেশ করে সে আর বের হয় না বা তাকে আর বের করা হয় না। এ বর্ণনাটি ভিত্তিহীন। এ বর্ণনায় ইবরাহিম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে খালেদ আলমিস্সীসী রয়েছে। ইমাম জাহাবি (রহ) এ রাবি সম্পর্কে বলেন, هذا رجل كذاب، قال الحاكم: أحاديثه موضوعة ‘এ ব্যক্তি একজন চরম মিথ্যাবাদী। হাকেম (রহ) বলেছেন, তার বর্ণনাগুলো মওজু ও বানোয়াট। (মিজানুল ইতিদাল, তরজমা নং: ১২৪; লিসানুল মিজান, তরজমা নং: ১৭৮)

একটি দাড়িতে ৭০ জন ফেরেশতা থাকেন
দাড়ির বিষয়ে কিছু মানুষকে বলতে শোনা যায় যে, একটি দাড়িতে সত্তর জন ফেরেশতা থাকেন। কারো একটি দাড়ি ঝরে গেলে বা ছিড়ে গেলে বলে, আহা! তোমার সাথ থেকে ৭০জন ফেরেশতা চলে গেলেন। এটি একেবারেই অমূলক একটি ধারণা। এর কোনো ভিত্তি নেই। কিন্তু দাড়ির বিষয়ে সকলেরই সঠিক ধারণা থাকা উচিত যে- দাড়ি ইসলামের শিআর ও পরিচয়-চিহ্ন হিসেবে গণ্য। দাড়ি লম্বা করা এবং মোচ খাটো করা দ্বীনে তাওহিদের শিক্ষা, যা সকল নবীর শরিয়তে ছিল। দাড়ি লম্বা রাখা ওয়াজিব এবং এক মুষ্ঠি থেকে খাটো করা নাজায়েজ। এ বিষয়ে যত্নবান হওয়া জরুরি।

আরও পড়ুন: দাড়ি রাখা কি শরিয়তের জরুরি হুকুম?

নূহ (আ.)-র কিশতিতে মলত্যাগের ঘটনা
আল্লাহর নবী নূহ (আ.)-এর প্লাবন ও তাঁর কিশতির বিষয় কোরআন মাজিদের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে, যা কমবেশি সকলেরই জানা আছে। কিন্তু এর সাথে এ বিষয়ে সমাজে বিভিন্ন কল্পকাহিনীও প্রচলিত আছে। একটি ঘটনা হলো- আল্লাহ তাআলার আদেশে নূহ (আ.) যখন কিশতি বানালেন তখন তার কওম তা নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করতে লাগল। একপর্যায়ে তারা কিশতিতে মলত্যাগ করতে শুরু করল। একদিন এক কুষ্ঠরোগী তাতে মলত্যাগ করতে গিয়ে ময়লার মধ্যে পড়ে গেল এবং তার কুষ্ঠরোগ ভালো হয়ে গেল। এ ঘটনা যখন এলাকায় জানাজানি হয়ে গেল তখন লোকেরা এসে কিশতি থেকে ময়লা (মল) সংগ্রহ করে তাদের রোগীদের ভাল করতে লাগল, এমনকি তারা শেষপর্যায়ে গিয়ে কিশতি ধুয়ে ধুয়ে এর পানি সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে লাগল- এভাবে কিশতি পরিষ্কার হয়ে গেল। আগেই বলা হয়েছে, এই ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এর কোনো সহিহ সূত্র ও নির্ভরযোগ্য কোনো উদ্ধৃতিও নেই। এটি সম্পূর্ণ মনগড়া একটি কাহিনি। সুতরাং তা বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। 

হাসান বসরি পানির ওপর এবং রাবেয়া বসরি শূণ্যের ওপর নামাজ পড়েন
একটি কাহিনি অনেককে বলতে শোনা যায়- একবার হাসান বসরি (রহ) পানির উপর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়লেন। রাবেয়া বসরিয়্যাহ একথা জানতে পারলেন এবং তিনি শূন্যের উপর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়লেন। হাসান বসরি (রহ) যখন একথা জানতে পারলেন তখন বললেন, রাবেয়ার মাকাম আমার অনেক উপরে। এ কিচ্ছার কোনো ভিত্তি নেই। নির্ভরযোগ্য কোনো ইতিহাসগ্রন্থ বা রাবেয়া বসরিয়্যাহ-এর উপর রচিত কোনো নির্ভরযোগ্য জীবনীগ্রন্থে এ ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় না। তাঁরা অনেক বড় মাপের বুজুর্গ ছিলেন, একথা স্বীকৃত। তাঁরা যুহ্দ ও তাকওয়ায়, দুনিয়াবিমুখতা ও খোদাভীতিতে অনেক অগ্রগামী ছিলেন। কিন্তু এধরনের কাহিনি দিয়ে তাদের বুজুর্গি প্রমাণ করার কী দরকার? একজন পানির উপর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ছেন তা শুনে অপরজন শূন্যের উপর জায়নামাজ বিছিয়ে নামায পড়ছেন; যেন বুজুর্গির পাল্লা চলছে! নাউজুবিল্লাহ। এই গল্পটি তাদের ব্যাপারে মস্তবড় অপবাদ!

আরেকটি বিষয় হল, হাসান বসরি (রহ) ইন্তেকাল করেছেন ১১০ হিজরিতে। আর রাবেয়া বসরির জন্মই হয়েছে ৯৯ অথবা ১০০ হিজরিতে। অর্থাৎ হাসান বসরি (রহ)-এর ইন্তেকালের সময় রাবেয়া বসরিয়্যাহ (রহ)-এর বয়স ছিল সর্বোচ্চ ১১/১২ বছর। সিয়ারু আ‘লামিন নুবালায় (৮/২৪১) যাহাবী রাহ. বলেন, রাবেয়া বসরিয়্যাহ ১৮০ হিজরিতে ইন্তিকাল করেছেন। কথিত আছে, তিনি ৮০ বছর হায়াত পেয়েছেন। সুতরাং এ বিষয়টিও এঘটনার অসারতা প্রমাণ করে।

আরও পড়ুন: হুসাইন (রা.)-এর প্রশ্ন- ‘নানাজি আপনি বড় না আমি বড়?’ গল্পটি বানোয়াট

ওয়ায়েস কারনির দাঁত ভাঙার গল্প
ওয়ায়েস কারনির দাঁত ভাঙার গল্প লোকমুখে খুবই প্রসিদ্ধ। ঘটনাটি এরকম- ওহুদ যুদ্ধে যখন নবী (স.)-এর দানদান মোবারক শহীদ হলো তখন ওয়ায়েস কারনি বিষয়টি জানতে পারলেন এবং যারপরনাই ব্যাথিত হলেন। নবী (স.)-এর প্রতি তার অগাধ ভালবাসা ছিল। এ ঘটনা শুনে তিনি স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন, নবী (স.)-এর দাঁত মোবারক যখন শহীদ হয়েছে তো আমার এ দাঁতের কী অর্থ! তিনি নিজের একটি দাঁত ভেঙে ফেললেন। পরক্ষণে চিন্তা করলেন, আমি যে দাঁত ভেঙেছি নবী (স.)-এর হয়ত এ দাঁত ভাঙেনি অন্য দাঁত। ভেবেই তিনি নিজের আরেকটি দাঁত ভেঙে ফেললেন। এভাবে তিনি নিজের সবগুলো দাঁত ভেঙে ফেললেন।

নবীজির প্রতি উম্মতের ভালবাসা প্রকাশের চূড়ান্ত নজির হিসেবে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে এ ঘটনা বলে থাকেন। কিন্তু এ ঘটনার কোনোই ভিত্তি নেই। মোল্লা আলি কারি (রহ) বলেন, এ ঘটনা প্রমাণিত নয়। (দ্র. আলমা‘দিনুল আদানি, আলবুরহানুল জালি ফি তাহকিকি ইনতিসাবিস সুফিয়্যাতি ইলা আলী, পৃ. ১৬৪-১৬৫) ওয়ায়েস কারনি (উয়াইস আলকারনি) একজন বড় মাপের তাবেয়ি ও বুজুর্গ ছিলেন। ইয়ামানের অধিবাসী ছিলেন। তিনি ৩৭ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। নবী (স.)-এর যুগের হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ তার হয়নি। কিন্তু নবী (স.)-এর প্রতি তার অগাধ ভালবাসা ছিল। তার বৃদ্ধা মা ছিলেন। মায়ের সেবাযত্ন করতেন। নবী (স.) তাকে চিনতেন। হাদিস শরিফে এসেছে, ওমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ইয়ামান থেকে উয়াইস নামে এক ব্যক্তি তোমাদের কাছে আসবে। ইয়ামানে মা ছাড়া তার আর কেউ নেই। তার শ্বেত রোগ ছিল। সে আল্লাহর কাছে দোয়া করলে আল্লাহ তার রোগ ভালো করে দেন, কিন্তু তার শরীরের একটি স্থানে এক দিনার অথবা এক দিরহাম পরিমাণ স্থান সাদাই থেকে যায়। তোমাদের কেউ যদি তার সাক্ষাৎ পায় সে যেন তাকে নিজের জন্য ইস্তেগফার করতে বলে। (সহিহ মুসলিম: ২৫৪২)

ওয়ায়েস কারনির সাথে সাহাবিদের সাক্ষাতের ঘটনাও হাদিস শরিফে এসেছে। কিন্তু কোথাও এমন কিচ্ছার কথা নেই। সহিহ মুসলিমে এসেছে, ওমর (রা.)-এর সাথে ওয়ায়েস কারনির সাক্ষাত হলে তাকে সনাক্ত করার জন্য তিনি নবী (স.)-এর বলে দেয়া সব আলামত জিজ্ঞাসা করেন। এ বর্ণনায় আছে ওমর (রা.) নবীজির কথা অনুযায়ী তাকে নিজের জন্য ইস্তেগফার করতে বলেন, তিনি ওমর (রা.)-এর জন্য ইস্তেগফার করেন। পরবর্তী বছর হজের মৌসুমে ওয়ায়েস কারনি যে এলাকায় বসবাস করছিলেন সেখান থেকে এক ব্যক্তি এলে ওমর (রা.) তার (ওয়ায়েস কারনির) খোঁজ খবর নেন। (দ্র. সহিহ মুসলিম: ২৫৪২)

সুলাইমান (আ.)-এর জিয়াফতের সব খাবার এক মাছ খেয়ে ফেলেছিল
লোকমুখে প্রসিদ্ধ, হজরত সুলাইমান (আ.) একবার আল্লাহকে বললেন, হে আল্লাহ আমি সকল সৃষ্টিজীবকে এক বছর খাওয়াতে চাই। আল্লাহ বললেন, হে সুলাইমান তুমি তা পারবে না। তখন সুলাইমান (আ.) বললেন, আল্লাহ! তাহলে এক সপ্তাহ। আল্লাহ বললেন, তুমি তাও পারবে না। সুলাইমান (আ.) বললেন, তাহলে একদিন। আল্লাহ বললেন, হে সুলাইমান তুমি তাও পারবে না। একপর্যায়ে আল্লাহ একদিনের অনুমতি দিলেন। সুলাইমান (আ.) জ্বিন ও মানুষকে হুকুম করলেন, পৃথিবীতে যত প্রকার খাদ্য শস্য আছে এবং হালাল যত প্রকার প্রাণী আছে সব হাজির করো। তারা তা করল। এরপর বিশাল বিশাল ডেগ তৈরি করা হলো এবং রান্না করা হলো। তারপর বাতাসকে আদেশ করা হলো- সে যেন খাদ্যের উপর দিয়ে সদা প্রবাহিত হতে থাকে যাতে খাবার নষ্ট না হয়। তারপর খাবারগুলো সুবিস্তৃত জমিনে রাখা হলো। যে জমিনে খাবার রাখা হলো তার দৈর্ঘ্য ছিল দুই মাসের পথ। খাবার প্রস্ত্তত শেষ হলে আল্লাহ বললেন, হে সুলাইমান! কোন প্রাণী দিয়ে শুরু করবে? সুলাইমান (আ.) বললেন, সমুদ্রের প্রাণী দিয়ে। তখন আল্লাহ সাগরের একটি বড় মাছকে বললেন, যাও সুলাইমানের জিয়াফত খেয়ে এসো। তখন মাছটি সমুদ্র থেকে মাথা উঠিয়ে বললো, হে (আল্লাহর নবী) সুলাইমান, আপনি নাকি জিয়াফতের ব্যবস্থা করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এই তো খাবার প্রস্ত্তত, তুমি শুরু করো। তখন সে খাওয়া শুরু করল এবং খেতে খেতে খাবারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পৌছে গেল। সব খাবার শেষ করে ফেলল। তারপর বলল, আমাকে আরো খাবার দিন, আমি এখনও তৃপ্ত হইনি। তখন সুলাইমান (আ.) বললেন, তুমি সব খাবার খেয়ে ফেলেছ তাও তোমার পেট ভরেনি। তখন মাছ বলল, মেজবান কি মেহমানের সাথে এভাবে কথা বলে? হে (আল্লাহর নবী) সুলাইমান! শুনে রাখুন, আমার রব আমাকে প্রতিদিন এর তিন গুণ খাবার দেন। আজ আপনার কারণে আমাকে কম খেতে হল। এ কথা শুনে সুলাইমান (আ.) সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন...। 

আরও পড়ুন: সুলাইমান (আ.)-এর কি জাদুর আংটি ছিল?

এ ঘটনাটি একেবারেই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। হাদিস, তাফসির বা ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে এর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। তাছাড়া এ ঘটনার মাঝে এমন কিছু বিষয় আছে যা নিজেই প্রমাণ করে যে, ঘটনাটি সত্য নয়। যেমন- ১. একজন নবী এমন উদ্ভট ও অযৌক্তিক আবদার করবেন তা হতে পারে না। এর অর্থ দাড়ায় আল্লাহর মাখলুক সম্পর্কে তার ন্যূনতম ধারণা নেই। একজন নবীর শানে এ রকম ধারণা করা সমীচীন নয়। ২. আল্লাহ নিষেধ করার পরও একজন নবী এরকম আবদার করতে থাকবেন। আর আল্লাহও তাকে এমন অযৌক্তিক বিষয়ের অনুমতি দিয়ে দিবেন তা কীভাবে হয়? ৩. পৃথিবীর সকল প্রাণীই কি রান্না করা খাবার খায়? মাছ কি রান্না করা খাবার খায়? ৪. ঘটনায় বলা হয়েছে, খাবার যে জমিনে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তার দৈর্ঘ্য দুই মাসের পথ। মাছটি কি দুই মাসের পথ মুহূর্তেই অতিক্রম করে ফেলল? বা এত দীর্ঘ পথ জলের প্রাণী স্থলে থাকল কীভাবে?   ৪. যে মাছের পেটে এত খাবার সংকুলান হয় সে মাছটি কত বড়! ৫.শুধু বাতাস প্রবাহিত হওয়াই কি পাক করা খাদ্য নষ্ট না হওয়ার জন্য যথেষ্ট? এ ধরনের আরো অযৌক্তিক কথা এ কিচ্ছায় রয়েছে, যা এ ঘটনা মিথ্যা হওয়ার জন্য যথেষ্ট। এমন ঘটনা  বর্ণনা করা যেমন বৈধ নয় তেমনি বিশ্বাস করাও মূর্খতা ছাড়া কিছু নয়।

নবীজি জিব্রাইল (আ.)-কে বললেন, আমিই ওই তারকা...!
আমাদের দেশের কোনো কোনো অসতর্ক বক্তার মুখে শোনা যায়, ফাতেমা (রা.)-কে নবীজি (স.) বললেন, জিব্রাইল তোমার চাচা...। কেউ কেউ এভাবেও বলে, ফাতেমা (রা.) জিব্রাইলকে চাচা বললে জিব্রাইল (আ.) বলেন, আমি তোমার চাচা নই, জ্যাঠা (অর্থাৎ তোমার বাবার বড়)।  কেউ বলে, নবীজি জিব্রাইল (আ.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি বড়, নাকি আমি? জিব্রাইল (আ.) বললেন, আমি বড়। তখন নবীজি বললেন, হে জিব্রাইল! আপনার বয়স কত? তখন জিব্রাইল (আ.) বলেন, আমি আমার বয়স বলতে পারব না। তবে চতুর্থ হিজাবে (মানুষের ভাষায়- আসমানে) আমি একটি তারকা দেখেছি, যা প্রতি ৭০ হাজার বছরে একবার উদিত হয়। আমি বাহাত্তর হাজার বার ওই তারকা উদিত হতে দেখেছি। তখন নবীজি বললেন, হে জিব্রাইল! আমার রবের ইজজতের কসম, আমিই (ছিলাম) ওই তারকা (অর্থাৎ আপনার সৃষ্টির আগে আমার সৃষ্টি)।

এটি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন একটি কিসসা। নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে তা পাওয়া যায় না। এদেশের কোনো কোনো বক্তা কিসসাটিকে আরো চটকদার আকারে পেশ করার জন্য এর সাথে ‘চাচা আর জ্যাঠা’র বিষয়টি যুক্ত করেছে। অথচ আরবি ভাষায় ‘চাচা-জ্যাঠা’র বিষয় নেই; উভয়ের জন্য আরবি ভাষায় عَمّ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

আব্দুল্লাহ ইবনে সিদ্দিক আলগুমারি (রহ) ‘মুরশিদুল হা-ইর লিবায়ানি ওয়ায-ই হাদীসি জাবির’ কিতাবে কিসসাটি উল্লেখ করার পর বলেন-وهذا كذب قبيح، قبح الله من وضعه وافتراه ‘এটি একটি নিকৃষ্ট মিথ্যা (ও বানোয়াট কথা)। যে এটি জাল করেছে আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করুন। (মুরশিদুল হা-ইর লিবায়ানি ওয়ায-ই হাদীসি জাবির, পৃ. ৫)

আরও পড়ুন: কোন আসমানে কার সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন মহানবী (স.)

হুসাইন (রা.)-এর প্রশ্ন- ‘নানাজি আপনি বড় না আমি বড়?’ 
নবীজির উদ্দেশ্যে হজরত হুসাইন (রা.)-এর প্রশ্ন ‘নানাজি আপনি বড় না আমি বড়’ ঘটনাটি বহুল প্রচলিত এক কাহিনি। কিসসাটি এরকম— একবার হাসান-হুসাইন (শিশুকালে) নবীজীর সঙ্গে খেলা করছিলেন। হঠাৎ হুসাইন (রা.) নবীজীর কোলে বসে বললেন, নানাজি! বলুন তো, আপনি বড় না আমি বড়! ছোট্ট নাতির এমন প্রশ্ন শুনে নবীজি আশ্চর্য হলেন। বললেন, আমি বড়! হুসাইন বললেন- না, আমি বড়! নবীজি বললেন, বুঝলাম তুমি বড়; কিন্তু কীভাবে?

হুসাইন তখন প্রশ্ন করলেন- বলুন তো আপনার পিতার নাম কী? নবীজি বললেন, আব্দুল্লাহ। হুসাইন বললেন, আর আমার পিতার নাম জানেন? আমার পিতা হলেন, আসাদুল্লাহিল গালিব আলী ইবনে আবি তালিব। হুসাইন আবার প্রশ্ন করলেন- আপনার মায়ের নাম কী? নবীজি বললেন, আমেনা। হুসাইন তখন বললেন- আর আমার মায়ের নাম জানেন? আমার মা হলেন, সায়্যিদাতু নিসা-ই আহলিল জান্নাহ-জান্নাতের রমণীদের সরদার ফাতেমাতুজ জাহরা। হুসাইন আবার প্রশ্ন করলেন- আপনার নানীর নাম বলেন। নবীজি তাঁর নানীর নাম বললে হুসাইন বললেন- আর আমার নানীকে চেনেন? আমার নানী হলেন ওই নারী, যাকে আল্লাহ সালাম পাঠিয়েছেন। খাদিজাতুল কুবরা। এবার প্রশ্ন করলেন- বলুন তো আপনার নানার নাম কী? নবীজি নিজের নানার নাম বললে হুসাইন বললেন- আর আমার নানা কে জানেন? আমার নানা হলেন, দোজাহানের সরদার, সায়্যিদুল মুরসালিন, খাতামুন্নাবিয়্যিন মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

এই গল্প আমরা প্রায়ই চটকদার উপস্থাপনায় শুনে থাকি। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এর নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র নেই। 

সাপের পেটে করে ইবলিস জান্নাতে প্রবেশ করেছিল
কোনো কোনো মানুষকে বলতে শোনা যায়- ইবলিস যখন আদম-হাওয়া (আ.)-কে ধোঁকা দেওয়ার ইচ্ছা করে তখন সাপের পেটে করে জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আদম-হাওয়া (আ.)-কে ধোঁকা দেয়। ফলে সাপ অভিশপ্ত।

আরও পড়ুন: আল্লাহর শেখানো যে দোয়া পড়ে আদম (আ.) ক্ষমা পেয়েছেন

কেউ কেউ এভাবেও বলে, ইবলিস জান্নাতে প্রবেশ করার জন্য সকল প্রাণীকে আবেদন করেছে, কেউ রাজি হয়নি। সাপ রাজি হয়; ইবলিস সাপের পেটে করে জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আদম-হাওয়া (আ.)-কে ধোঁকা দেয়। ফলে আল্লাহ সাপকে অভিশপ্ত করেন। কেউ কেউ এটাও বলে, সাপ আগে চার পা বিশিষ্ট প্রাণী ছিল, এ অপরাধের কারণে আল্লাহ তাকে পা-বিহীন করে দিয়েছেন।

এ সবই ভিত্তিহীন কথা। শয়তান সাপের পেটে করে জান্নাতে প্রবেশ করা এবং এ কারণে অভিশপ্ত হওয়া এবং পা-বিহীন প্রাণী হয়ে যাওয়া ইত্যাদি কাহিনি ইসরাঈলী বর্ণনা-নির্ভর, যার গ্রহণযোগ্যতার কোনো প্রমাণ নেই। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ সকল কিসসা-কাহিনি পাওয়া যায় না। ফলে এগুলো বিশ্বাস করা যাবে না। (আলইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাউজুআত ফি কুতুবিত তাফাসির: ১৭৮-১৮০; আলবাদউ ওয়াত তারিখ, মুতাহহির ইবনে তাহের আলমাকদিসি: ২/৯৫-৯৬)

নবীজি জন্মের সাথে সাথে উঠে আল্লাহকে সেজদা করেন
লোকমুখে প্রসিদ্ধ, নবীজি (স.) নাকি জন্মের পরপরই উঠে আল্লাহ তাআলাকে সেজদা করেছিলেন এবং কাপড় পরতে চেয়েছিলেন। যখন ভূমিষ্ঠ হন তখন ঘরে আলো না থাকায় আকাশের চাঁদ নিচে নেমে এসে মা আমেনার ঘরে আলো দিয়েছিল। কথাগুলো শুনতে ভালো লাগলেও এর কোনো দালিলিক ভিত্তি নেই। নির্ভরযোগ্য কোনো বর্ণনায় তা পাওয়া যায় না। অবশ্য সহিহ হাদিসে এটা পাওয়া যায় যে, “নবীজি বলেছেন, আমি সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ যা আমার মাতা দেখেছিলেন- তাঁর থেকে একটি নূর বের হয়, যার আলোয় সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত হয়ে যায়”। এ ধরনের স্বপ্ন নবী-জননীগণ (নবীদের জন্মের আগে) দেখে থাকেন। আর রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আম্মা তাঁকে জন্মদানের সময় এক নূর দেখতে পান, যার আলোয় সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ তাঁর সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। (মুসনাদে আহমদ: ১৭১৬৩; মুসতাদরাকে হাকেম: ৪১৭৫; আলমুজামুল কাবির, তবারানি: ৬২৯; সহিহ ইবনে হিব্বান: ৬৪০৪; শুআবুল ঈমান, বায়হাকি: ১৩২২; মুসনাদে বাজজার: ৪১৯৯; আলখাসাইসুল কুবরা: ১/৮২-৮৩)

সূত্র: আল-কাউসার