Dhaka Mail Logo

জাতীয়

বিদ্যুৎ গেলেই নেটওয়ার্কে টান, বড় শঙ্কা ডেটা সেন্টারে

মহিউদ্দিন রাব্বানি

১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৭ এএম

  • ৫–৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, জেনারেটরেই ভরসা 
  • প্রতিদিন খরচ প্রায় ১ লাখ লিটার জ্বালানি 
  • টাওয়ারের চেয়ে বড় ঝুঁকি ডেটা সেন্টারে 
  • জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ 
  • বিদ্যুৎ সংকটে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে ৪০% 
  • গ্রামীণ নেটওয়ার্কে ‘ব্ল্যাক জোনের’ শঙ্কা

একটি ফোনকল, একটি জরুরি বার্তা, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে একটি লেনদেন কিংবা কোনো হাসপাতাল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসে জরুরি যোগাযোগ। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে এসব সেবা পাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে মানুষ। অথচ এই পুরো যোগাযোগব্যবস্থার পেছনে যে অবকাঠামো, সেটিই এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের চাপে পড়েছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল রাখতে জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব)-এর হিসাবে, শুধু গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের বিটিএস সচল রাখতেই প্রতিদিন প্রয়োজন হচ্ছে ৫২ হাজার ৪২৫ লিটার ডিজেল এবং ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন। এর বাইরে ডেটা সেন্টার ও সুইচিং স্থাপনায় লাগছে আরও ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল।

সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ সংকট সামাল দিতে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে প্রতিদিন প্রায় ৯৯ হাজার ৫০০ লিটার জ্বালানি খরচ হচ্ছে। সংকট দীর্ঘ হলে এই নির্ভরতা শুধু ব্যয় বাড়াবে না, জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাকেও চাপে ফেলতে পারে।

আর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি টাওয়ারে নয়, নেটওয়ার্কের কেন্দ্রীয় স্থাপনায়। কারণ কোনো টাওয়ার বন্ধ হলে একটি এলাকার গ্রাহক সমস্যায় পড়তে পারেন। কিন্তু ডেটা সেন্টার বা কোর নেটওয়ার্কে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো দেশের যোগাযোগব্যবস্থায়।

৫–৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, ভরসা জেনারেটর
অপারেটরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে। ফলে মোবাইল টাওয়ার, ডেটা সেন্টার ও সুইচিং স্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সচল রাখতে বাড়াতে হচ্ছে ব্যাকআপের ব্যবহার।

অ্যামটবের হিসাবে, গ্রামীণফোনের বিটিএস চালাতে প্রতিদিন ২৮ হাজার ৭৯ লিটার ডিজেল ও ৯ হাজার ২৫৪ লিটার অকটেন প্রয়োজন হচ্ছে। রবির ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ১৩ হাজার ১৪০ লিটার ডিজেল ও ৫ হাজার ৬১০ লিটার অকটেন। বাংলালিংকের বিটিএস সচল রাখতে প্রতিদিন লাগছে ১১ হাজার ২০৬ লিটার ডিজেল ও ৪ হাজার ৯৯৫ লিটার অকটেন।

এর বাইরে ডেটা সেন্টার ও সুইচিং স্থাপনায় প্রতিদিন প্রয়োজন হচ্ছে ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল। অর্থাৎ গ্রিড বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে জেনারেটরের ব্যবহার এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যবস্থা নয়। এটি ক্রমেই মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল রাখার অন্যতম প্রধান নির্ভরতা হয়ে উঠছে।

আসল ঝুঁকি ডেটা সেন্টারে
মোবাইল টাওয়ারকে নেটওয়ার্কের হাত-পা বলা হলে ডেটা সেন্টারকে বলা যায় তার মস্তিষ্ক। কল সংযোগ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, ইন্টারনেট ট্রাফিক এবং নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বড় অংশ এসব কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল।

অ্যামটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, কোনো ধরনের বিঘ্নতা তাৎক্ষণিকভাবে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে দিতে পারে। ডেটা সেন্টারগুলো অপারেটরগুলোর ‘ব্রেইন’। যদি সেটি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে গোটা নেটওয়ার্ক অচল হয়ে যাবে।

অপারেটরদের তথ্য অনুযায়ী, ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুতের চাহিদা দৈনিক প্রায় চার মেগাওয়াট। গ্রিডের বিদ্যুৎ না থাকলে বাধ্যতামূলকভাবে জেনারেটর চালাতে হয়। কোনো কোনো ডেটা সেন্টারে জেনারেটর চালাতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে একটি কেন্দ্রেই দিনে কয়েক হাজার লিটার জ্বালানি খরচ হতে পারে।

এ কারণে টাওয়ারের ব্যাকআপের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্থাপনাগুলোর জ্বালানি মজুত নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি আছে, সরবরাহ নিশ্চিত তো?
জেনারেটর থাকলেই যে নেটওয়ার্ক নির্বিঘ্ন থাকবে, বাস্তবতা তা নয়। জ্বালানি সরবরাহই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অ্যামটবের অভিযোগ, স্থানীয় ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ জ্বালানি পাওয়া সব সময় সম্ভব হচ্ছে না। আবার এক জেলা থেকে অন্য জেলায় জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের জটিলতা রয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগাযোগ স্থাপনায় পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

অপারেটরদের সংগঠনটি এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগাযোগ স্থাপনায় অগ্রাধিকারভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ, ডিপো থেকে সরাসরি জ্বালানি দেওয়ার ব্যবস্থা এবং জরুরি জ্বালানি পরিবহনে বাধা না দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। কারণ কোনো একটি টাওয়ারে জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে সেটি হয়তো একটি এলাকার সমস্যা। কিন্তু ডেটা সেন্টার বা কোর নেটওয়ার্কে একই ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব অনেক বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিদ্যুৎ সংকটে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে ব্যয়
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে অপারেটরদের পরিচালন ব্যয়েও। বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার টি এম তৈমুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, চলমান লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের পরিচালন ব্যয় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ প্রায় ৭ দশমিক ০১ শতাংশ কমেছে। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টেও সরবরাহ কমেছে প্রায় ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেও নেটওয়ার্ক সচল রাখতে বাংলালিংক বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতি আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করছে। প্রায় ৪০ শতাংশ সাইট এবং সব ডেটা সেন্টারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

তৈমুর রহমান জানান, বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যাকআপ জেনারেটরের মাধ্যমে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ সময় নেটওয়ার্ক সচল রাখতে হচ্ছে।

ব্যাটারি বাড়াচ্ছে টেলিটক
বিদ্যুৎ সংকট থেকে বাদ যায়নি রাষ্ট্রীয় অপারেটর টেলিটকও। টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় নেটওয়ার্ক পরিচালনায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, নেটওয়ার্ক সচল রাখতে নতুন ও উন্নত ব্যাটারি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু ব্যাটারি সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি জেনারেটর ব্যাকআপের মাধ্যমেও নেটওয়ার্ক সচল রাখার চেষ্টা চলছে।

তবে কোনো সাইটে কত ঘণ্টা ব্যাকআপ দেওয়া সম্ভব, তা সাইটভেদে ভিন্ন বলে জানান তিনি।

গ্রাহকের ভোগান্তি কি ইতোমধ্যেই শুরু?
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি মোবাইল সেবার মান নিয়েও গ্রাহকের অভিযোগ রয়েছে। দুর্বল নেটওয়ার্ক, কলড্রপ, ধীরগতির ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিটিআরসিতে অভিযোগ জমা পড়ছে।

বিটিআরসির সপ্তম গণশুনানিতে নেটওয়ার্ক কাভারেজ, ইন্টারনেটের গতি, কলড্রপ, ডাটা প্যাকেজ ও সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষের বিষয়টি উঠে আসে। গত সাড়ে পাঁচ বছরে চার মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে ৬৬ হাজার ৭০৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে।

এর মধ্যে রবির বিরুদ্ধে ২৪ হাজার ৮৭৪টি, গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে ২১ হাজার ৫২৬টি, টেলিটকের বিরুদ্ধে ১১ হাজার ৫৯৪টি এবং বাংলালিংকের বিরুদ্ধে ৮ হাজার ৭১১টি অভিযোগ রয়েছে।

মোবাইল ফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবিলম্বে শুধু কাগজ-কলমে নজরদারি সীমিত না রেখে দৃশ্যমান জরিমানা ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে গ্রাহকের ওপর এই ডিজিটাল হয়রানি থামানো সম্ভব হবে না।

এবার নিজেরাই নেটওয়ার্ক মাপছে বিটিআরসি 
বিটিআরসির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আজম পারভেজ বলেন, নতুন পদ্ধতিতে গ্রাহকসেবার মানের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসছে। আগে অপারেটরদের দেওয়া সেবার মানসংক্রান্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন নেটওয়ার্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম ও ড্রাইভ টেস্টের মাধ্যমে নিজস্বভাবে সেবার মান যাচাই করছে বিটিআরসি।

তার ভাষ্য, এতে অপারেটরদের তথ্য গোপন বা লুকোচুরির সুযোগ কমেছে। কোন অপারেটর কোথায় কেমন সেবা দিচ্ছে, তা এখন গ্রাহকের সামনে আরও স্পষ্ট হবে। সেবার মান খারাপ হলে গ্রাহক স্বাভাবিকভাবেই সেই অপারেটর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।

কিউওএস প্রতিবেদনেও স্বস্তি নেই

বিটিআরসির সেবার মান পর্যালোচনায়ও একাধিক দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে বিটিআরসির পরিমাপ করা ভিওএলটিই কলড্রপের হার ০ দশমিক ৩৮১৪ শতাংশ। অপারেটরটির নিজস্ব হিসাবে এই হার ০ দশমিক ০৪২২ শতাংশ।

রবির গড় ফোরজি ডাউনলোড গতি ৬ দশমিক ৮৪৮ এমবিপিএস। একই হিসাবে বাংলালিংকের গতি ৮ দশমিক ৬০৭ এবং গ্রামীণফোনের ৮ দশমিক ২২৬ এমবিপিএস।

টেলিটকের ক্ষেত্রে বিটিআরসির নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী ডাটা সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার হার সর্বোচ্চ ০ দশমিক ৫০ শতাংশ হওয়ার কথা। সেখানে তাদের হার ছিল ০ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দীর্ঘ হলে আগে থেকেই সেবার মান নিয়ে চাপের মধ্যে থাকা নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

‘ব্ল্যাক জোনে’ পরিণত হতে পারে গ্রামীণ এলাকা 
রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম পরিস্থিতিকে টেলিযোগাযোগ খাতকে ‘ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা অপারেটরদের জেনারেটর নির্ভরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সমন্বিত জ্বালানি লজিস্টিক ব্যবস্থা না থাকলে সাময়িক বিঘ্নগুলো স্থায়ী নেটওয়ার্ক ‘ব্ল্যাক জোনে’ পরিণত হতে পারে, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে।

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। আমরা টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ চাই। ডেটা সেন্টারের জন্য বিদ্যুতে অগ্রাধিকার চাই। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও জ্বালানি পরিবহন সহজ করার ব্যবস্থা চাই। এসব ব্যবস্থা না নিলে লাখো ব্যবহারকারীর জন্য নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

টেলিযোগাযোগ খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী। তিনি বলেন, কমিশন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার জন্য কাজ করছে।

তবে অপারেটরদের মতে, শুধু সমন্বয় নয়, এখন প্রয়োজন দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সেন্টার, কোর নেটওয়ার্ক ও টেলিযোগাযোগ স্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং জরুরি প্রয়োজনে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

নেটওয়ার্ক থামলে থামতে পারে অর্থনীতির চাকা
বাংলাদেশে সক্রিয় মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা এখন ১৯ কোটি ৪ লাখ ৪০ হাজার। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর যোগাযোগের পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল মোবাইল আর্থিক সেবা, অনলাইন কেনাকাটা, ব্যবসায়িক যোগাযোগ, পরিবহন, বিভিন্ন সরকারি সেবা এবং জরুরি যোগাযোগ।

ফলে বড় ধরনের নেটওয়ার্ক বিপর্যয়ের অর্থ শুধু ফোন করা বা ইন্টারনেট ব্যবহারে সমস্যা নয়। একই সঙ্গে ব্যাহত হতে পারে মোবাইল ব্যাংকিং, অর্থ লেনদেন, ওটিপি-নির্ভর সেবা, অনলাইন বাণিজ্য, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং জরুরি যোগাযোগ।

বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকায় ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কারণ এসব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ যেমন দুর্বল, তেমনি বিকল্প জ্বালানি পৌঁছে দেওয়াও কঠিন। প্রশ্নটা এখন বিদ্যুৎ আসার নয়, জ্বালানি কতদিন চলবে অপারেটররা এখনো ব্যাটারি, জেনারেটর ও অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে নেটওয়ার্ক সচল রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রতিদিন প্রায় এক লাখ লিটার জ্বালানি খরচ করে এই ব্যবস্থা কতদিন চালানো সম্ভব, সেই প্রশ্নই সামনে চলে এসেছে।

বিদ্যুৎ সংকট কয়েক ঘণ্টার হলে ব্যাটারি ও জেনারেটর দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং ব্যয়ের চাপ একসঙ্গে বাড়বে। আর সেই চাপ যদি ডেটা সেন্টার ও কোর নেটওয়ার্কে গিয়ে পড়ে, তাহলে একটি নির্দিষ্ট এলাকার নেটওয়ার্ক সমস্যা জাতীয় যোগাযোগ সংকটে রূপ নিতে পারে।

তাই এখন প্রশ্ন শুধু ‘বিদ্যুৎ গেলে নেটওয়ার্ক থাকবে কি না’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হলো, বিদ্যুৎ না থাকলে কতদিন জেনারেটর চলবে, জ্বালানি কতদিন মিলবে, আর সেই জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে দেশের ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা কতটা নিরাপদ থাকবে?

কারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক এখন আর শুধু মানুষের হাতে থাকা একটি যন্ত্রের সংযোগ নয়। এটি দেশের ব্যাংকিং, ব্যবসা, জরুরি সেবা ও দৈনন্দিন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অবকাঠামো। সেখানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের ছায়া যত দীর্ঘ হবে, ঝুঁকিটাও তত গভীর হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব এখন শুধু ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানা ও উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি সরাসরি দেশের ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে মোবাইল নেটওয়ার্ক, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট, অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে মোবাইল টাওয়ার ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ব্যাকআপ ব্যবস্থায় চলে যায়। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যাকআপের সক্ষমতা কমে আসে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক গ্রাহক মোবাইল ডেটা ব্যবহার করায় নির্দিষ্ট এলাকার নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। ফলে সংযোগ সচল থাকলেও ইন্টারনেটের গতি কমে যেতে পারে।

মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, টেলিযোগাযোগ এখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর অংশ। তাই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মোবাইল অপারেটর ও ইন্টারনেট সেবাদাতাদের পর্যাপ্ত ব্যাকআপ বিদ্যুৎ, ব্যাটারি, জ্বালানি মজুত ও বিকল্প শক্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্কে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো এবং নিয়মিত সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।

মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, শুধু অপারেটরদের দায়ী করলে সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই বিদ্যুৎ নিরাপত্তাকে এখন টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল অর্থনীতির নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এদিকে অ্যামটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার সতর্ক করে বলেন, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী কোনো ধরনের বিঘ্নতা হলে এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে সারা দেশের যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে মোবাইল অপারেটরদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও ডেটা সেন্টারগুলো সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি।

তার মতে, ডেটা সেন্টারগুলো অপারেটরদের ‘ব্রেইন’। এগুলো কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে শুধু একটি নির্দিষ্ট এলাকার সেবা নয়, পুরো নেটওয়ার্কই অচল হয়ে যেতে পারে। তাই টেলিযোগাযোগ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পর্যাপ্ত ব্যাকআপ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে নেটওয়ার্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ খাতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প বিদ্যুৎ ও ব্যাকআপ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।’

এমআর/জেবি