মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

একের পর এক সংশোধনে আটকে আছে এতিমদের আবাসন নির্মাণ

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৯ এএম

শেয়ার করুন:

একের পর এক সংশোধনে আটকে এতিমদের আবাসন নির্মাণ
একের পর এক সংশোধন ও মেয়াদ বৃদ্ধিতে আটকে আছে ‘সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমনি নিবাস হোস্টেল নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ’প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
  • ২০১৮ সালের প্রকল্প, এখনো শেষ হয়নি 
  • ৬ কেন্দ্রে নির্মাণই শুরু হয়নি 
  • ১৩ কেন্দ্রে নির্মাণকাজ চলমান 
  • দ্রুত শেষ করতে হবে ক্রয়প্রক্রিয়া 
  • নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষের নির্দেশ 
  • ইউ-আকৃতির ভবন নির্মাণের পরামর্শ

দেশজুড়ে সরকারি শিশু পরিবার ও ছোটমনি নিবাস হোস্টেলের আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলে এতিম, অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে হাতে নেওয়া হয় ৩৮৫ কোটি ২০ লাখ টাকার ‘সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমনি নিবাস হোস্টেল নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ’ প্রকল্প। তবে একের পর এক সংশোধন ও মেয়াদ বৃদ্ধিতে আটকে গেছে বাস্তবায়নের কাজ। 

২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে প্রথম সংশোধনের মাধ্যমে মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হলেও এখনো সব কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। এর মধ্যে ৬টি কেন্দ্রে এখনো মূল নির্মাণকাজই শুরু হয়নি। ফলে নতুন করে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় সাত বছর পিছিয়ে যাচ্ছে।

জানা গেছে, প্রকল্পটি জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২১ মেয়াদে ২৬৬ কোটি ৭১ লাখ ৯১ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অনুমোদিত হয়। প্রথম সংশোধনের পর প্রকল্পটির মেয়াদ বর্তমানে জুন ২০২৬ পর্যন্ত এবং সর্বশেষ প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৮৫ কোটি ২০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয়ের পরিমাণ ২৭০ কোটি ২৭ লাখ ১১ হাজার টাকা এবং অবশিষ্ট রয়েছে ১০৮ কোটি ৯৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরএডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে ৪৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ৪১ লাখ ৩ হাজার টাকা এবং অবশিষ্ট রয়েছে ১৩ কোটি ৯৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। 

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা সভার কার্যবিবরণীতে প্রকল্পটির ধীরগতির চিত্র উঠে এসেছে। গত ১৫ জুলাই মন্ত্রণালয়ে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সচিব, মহাপরিচালক, প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, ‘সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমনি নিবাস হোস্টেল নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ’ প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন মেয়াদে ২৬৬ কোটি ৭১ লাখ ৯১ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অনুমোদিত হয়েছিল। পরে প্রথম সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে সর্বশেষ ৩৮৫ কোটি ২০ লাখ ৬৪ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ১১৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বেড়েছে। এরপরও নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় এখন দ্বিতীয় সংশোধনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণকাজ চলমান ১৩টি কেন্দ্রের মধ্যে রংপুর, গাইবান্ধা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, বগুড়া, নোয়াখালী এবং কিশোরগঞ্জ কেন্দ্রের কাজ শেষ করার কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি শরীয়তপুর, বরিশাল, পিরোজপুর, ফেনী, টাঙ্গাইল ও বাগেরহাট কেন্দ্রের নির্মাণকাজও চলমান রয়েছে। সিলেট, মৌলভীবাজার, ফরহাদাবাদ-চট্টগ্রাম, রউফাবাদ-চট্টগ্রাম, ঠাকুরগাঁও ও খাগড়াছড়ি কেন্দ্রে এখনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। 

প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি শিশু পরিবার ও ছোটমনি নিবাস হোস্টেলের অবকাঠামো নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানে এতিম, অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আবাসন, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন করার কথা রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কেন্দ্রে নির্মাণকাজের অগ্রগতির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। কোথাও কাজ শেষের পথে, কোথাও নির্মাণকাজ চলমান, আবার কোথাও এখনো মূল ভবনের কাজই শুরু করতে পারেনি।

এদিকে সভায় জানানো হয়, নির্মাণকাজ চলমান ১৩টি কেন্দ্রের মধ্যে রংপুর, গাইবান্ধা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, বগুড়া, নোয়াখালী ও কিশোরগঞ্জ কেন্দ্রের সব অঙ্গের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কার্যবিবরণীতে এসব কেন্দ্রের কাজ ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে শেষ করতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে শরীয়তপুর, বরিশাল, পিরোজপুর, ফেনী, টাঙ্গাইল ও বাগেরহাট কেন্দ্রের নির্মাণকাজ জুন ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

ছয়টি কেন্দ্রে এখনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। এগুলো হলো সিলেট, মৌলভীবাজার, ফরহাদাবাদ-চট্টগ্রাম, রউফাবাদ-চট্টগ্রাম, ঠাকুরগাঁও ও খাগড়াছড়ি। এসব কেন্দ্রে কাজ শুরু না হওয়ায় প্রকল্পের পূর্ণ বাস্তবায়ন আরও পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ পথশিশু দিনে রাস্তায় কাজ করে রাতে পরিবারের কাছে ফিরে যায়। ১৯ শতাংশ শিশু স্থায়ীভাবে রাস্তায় বসবাস করে। ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারের সঙ্গে রাস্তায় থাকে এবং ৫ দশমিক ৬ শতাংশ অন্য কোনো পরিবারের কাছে ফিরে যায়। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক শিশু এখনো পরিবার ও নিরাপদ আবাসনের বাইরে অনিশ্চিত জীবনযাপন করছে।
বিবিএসের ওই সমীক্ষায় আরও দেখা যায়, ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ পথশিশুর বাবা-মা দুজনই জীবিত। ৯১ দশমিক ২ শতাংশ শিশু পরিবারের সঙ্গে থাকতে চায়। তবে ৭১ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী নয়। এসব তথ্য বলছে, শিশুদের নিরাপদ আবাসনের পাশাপাশি তাদের পরিবারে ফেরানো, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, মানসিক সহায়তা এবং সামাজিক পুনর্বাসনের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি শিশু পরিবার ও নিবাসগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের একটি অংশকে নিরাপদ পরিবেশে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ডিপিপিতে বলা হয়েছে, দারিদ্র্য ও ক্ষুধাই শিশুদের বাড়ি ছাড়ার অন্যতম বড় কারণ। বিবিএসের সমীক্ষা অনুযায়ী, ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ পথশিশু দারিদ্র্য বা ক্ষুধার কারণে বাড়ি ছেড়ে শহরে এসেছে। সহজ যোগাযোগব্যবস্থা, বিশেষ করে রেলপথ ব্যবহার করেও অনেক শিশু ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে আসে। পরে অন্য পথশিশুদের মাধ্যমে তারা শহরের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে শুধু শহরে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, শিশুদের পরিবার ও সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

প্রকল্পের আওতায় প্রত্যক্ষভাবে ২৪ হাজার ৮৫০ জন এবং পরোক্ষভাবে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ১৫০ জনসহ মোট প্রায় পাঁচ লাখ শিশু উপকৃত হবে বলে ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক শিশুকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্য থাকায় প্রকল্পটি দ্রুত এবং মানসম্মতভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়ানো এবং কয়েকটি কেন্দ্রে এখনো নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় সেই লক্ষ্য অর্জন কতটা সময়মতো সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ভবনের নকশা নিয়েও সভায় বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব কেন্দ্রে মূল ভবনের নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি, সেসব ভবন ইউ-আকৃতিতে নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন মন্ত্রী। এর ফলে ভবনের ভেতরে গাড়ি প্রবেশ ও বের হওয়ার সুবিধা থাকবে। একই সঙ্গে নির্মাণাধীন সব ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরের উচ্চতা কমপক্ষে ১২ ফুট রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অগ্নিনির্বাপক কাজে ব্যবহৃত যানবাহন যাতে সহজে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারে, সেভাবেই সব কেন্দ্রের মূল ফটক নির্মাণ করতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় যেসব ক্রয়কার্যের দরপত্র এখনো আহ্বান করা হয়নি, সেগুলো দ্রুত আহ্বানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা বা নির্মাণকাজ চলমান থাকা ভবনের কাজ নতুন করে শুরু করার আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন থেকে মতামত নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে নির্মাণকাজের মান ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কারিগরি ত্রুটির ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

সভায় সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান, যেসব কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এবং নিবাসীদের স্থানান্তরের উপযোগী হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে দ্রুত নিবাসীদের স্থানান্তর করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে যেসব কেন্দ্রে মূল ভবনের নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি, সেসব ভবন ইউ-আকৃতির মতো করে নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাতে ভবনের ভেতরে গাড়ি প্রবেশ ও বের হতে কোনো সমস্যা না হয়।

এএইচ/জেবি

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর