বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

পরিচালক-কর্মকর্তার নয়-ছয়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে দেড় হাজার কোটির হরিলুট!

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম

শেয়ার করুন:

পরিচালক-কর্মকর্তার নয়-ছয়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে দেড় হাজার কোটির হরিলুট!
মার্কেন্টাইল ব্যাংকে দেড় হাজার কোটি টাকার অনিয়ম। ছবি: এআই
  • কেনাকাটা, সিএসআরসহ নানা অনিয়মে লুটপাট ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা
  • বোর্ড সভার ফি ৮ হাজার টাকার পরিবর্তে পরিচালকদের পকেটে লাখ টাকা
  • প্রধান আর্থিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা লুটের অভিযোগ
  • প্রমাণিত অপরাধের দায়ে এমডি, পরিচালক ও সিএফওকে অপসারণের সুপারিশ

এবার বেসরকারি খাতের মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসিতে পরিচালক ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর), কম্বল, ডায়েরি-কালেন্ডার, ল্যাপটপ, সফটওয়্যার ও আসবাবপত্র কেনাকাটা থেকে শুরু করে কর্মীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, কল্যাণ তহবিল এবং বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন দল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে অনিয়মের সঙ্গে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মতিউল হাসান, দুই উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) তাপস চন্দ্র পালসহ একাধিক পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে। অনিয়মে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পর এমডি, দুই ডিএমডি ও সিএফওকে চাকরি থেকে অপসারণের সুপারিশ করা হয়েছে বলে ব্যাংকটিতে পাঠানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকের ডিএমডি ও সিএফও তাপস চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে আর্থিক জালিয়াতি, পেশাগত অসদাচরণ, পদ্ধতিগতভাবে তহবিল আত্মসাৎ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকের কয়েকজন পরিচালক ও এমডি মতিউল হাসানসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগসাজশে সাসপেন্স হিসাব ও ব্যয় হিসাব থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা তাপস চন্দ্র পাল আর্থিক বিবরণীতে কারসাজির মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক চিত্র আড়াল করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সিএ, এসিসিএ বা এফসিএর মতো পেশাগত সনদ না থাকা সত্ত্বেও ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশন (এফডিএ) ও সিএফও কার্যালয়ে দীর্ঘদিনের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তিনি এসব অনিয়ম করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কর্মীদের প্রাপ্য অর্থ নিয়েও গুরুতর অনিয়মের তথ্য পেয়েছে পরিদর্শন দল। অভিযোগ রয়েছে, কর্মচারীদের গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও কল্যাণ তহবিলের জন্য প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ না করেই ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা হয়েছে। এর ফলে অবসরপ্রাপ্ত ও চাকরি ছেড়ে যাওয়া বহু কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের আইনগত পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিএসআর ও কেনাকাটায় বড় অঙ্কের অনিয়ম

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে সিএসআর ও বিভিন্ন কেনাকাটার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সিএসআর তহবিলের আওতায় প্রায় ১১০ কোটি টাকার কম্বল কেনা দেখানো হলেও এর মধ্যে কমপক্ষে ৮৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় চেয়ারম্যানসহ সাতজন পরিচালক জড়িত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ব্যবসা উন্নয়ন খাতের আওতায় ডায়েরি ও ক্যালেন্ডার কেনার নামে ৭৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল ২০২১ সালে পরিচালক পদে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রম ও সিএসআর ব্যয়ের মাধ্যমে মোট ১৮৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের কথাও পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডায়েরি, ক্যালেন্ডার ও কম্বলের পাশাপাশি ল্যাপটপ, কম্পিউটার, সফটওয়্যার, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন পণ্য কেনার জন্য বরাদ্দ অর্থও প্রভাবশালী পরিচালক ও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরোক্ষ আর্থিক সুবিধা দিতে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বোর্ড সভার ৮ হাজারের ফি ১ লাখ

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী কমিটির সভার ফি নিয়েও অস্বাভাবিকতার তথ্য পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নথিতে বলা হয়েছে, প্রতি বোর্ড ও ইসি সভায় নির্ধারিত ৮ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ লাখ টাকা করে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ ক্ষেত্রে এমডি মতিউল হাসান কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম শুহিনের সহযোগিতা নেন বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ জন্য ব্যাংকের সাসপেন্স হিসাব এ/সি বিডিটি ১৪০৩৯০০০১০০০১ ব্যবহার করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ভুয়া বিল ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে এসব অর্থ সমন্বয় করা হয়ে থাকলে তা গুরুতর আর্থিক জালিয়াতি ও ফৌজদারি অপরাধের শামিল হতে পারে বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

টেন্ডার ছাড়াই সাড়ে ৩ কোটি টাকার কার্যাদেশ

ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়নের নামেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, এমডি মতিউল হাসান তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী প্রকৌশলী মো. রেজা হোসেনের সহায়তায় স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি কার্যাদেশ দেন। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় ডিএমডি আদিল রাইহানকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে আইটি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মাহমুদ হাসানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অনিয়মে সহযোগিতা করতে বাধ্য করার অভিযোগও উঠেছে।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ না করে একটি সফটওয়্যার ল্যাবকে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়ার পর এমডি মতিউল হাসান ও প্রকৌশলী রেজা হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় রেইনবো অ্যারের অনুকূলে ব্যাংকের কাওরান বাজার শাখার মাধ্যমে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্রুত পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন

তাপস চন্দ্র পালের চাকরিজীবন নিয়েও পরিদর্শন প্রতিবেদনে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। রূপালী ব্যাংকে কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দেন তিনি। এরপর ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতি পেয়ে ২০১৮ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি), ২০২১ সালে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি), ২০২২ সালে এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (ইভিপি) এবং ২০২৪ সালে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) হন। ২০২৬ সালে তিনি ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান। ব্যাংকের পরিচালকদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সঙ্গে তাঁর পদোন্নতির সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিয়েও নথিতে অভিযোগের ইঙ্গিত রয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসানের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান ঢাকা মেইলকে বলেন, মালিকরা এবং ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে ব্যাংকের ভক্ষক। রক্ষকরা যেন কোনোভাবে ভক্ষক না হন, সেটাই আমরা চাই। কোনো ব্যাংকের পরিচালক বা ম্যানেজমেন্টের কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে আমরা সেটা তদন্ত করে থাকি। অনিয়মে যে-ই জড়িত থাকুক না কেন, প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

টিএই/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর