মোস্তফা ইমরুল কায়েস
২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২১ পিএম
- ২০১৮ সালে বাংলামোটরে গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার দাবি
- চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়ার চিঠির পর এলাকায় বেপরোয়া তৎপরতার অভিযোগ
- পুলিশের ভূমিকা ও তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা ও হত্যাচেষ্টা মামলায় যুবলীগ নেতা আব্দুল আউয়ালসহ ছয়জনকে চার্জশিট থেকে বাদ দিতে পুলিশ সদর দফতরে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের ‘নীরবতার সুযোগে’ এসব আসামি প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন এবং নিজ নিজ এলাকায় আগের মতোই প্রভাব ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।
জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর এলাকার যুবলীগ নেতা আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় যুবলীগের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। শাহবাগ ও যাত্রাবাড়ীসহ একাধিক থানায় হওয়া মামলাতেও তার নাম আছে।

অভিযোগ রয়েছে, আউয়ালসহ ছয়জনকে শাহবাগ থানায় খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় করা আলোচিত মামলায় চার্জশিট থেকে অব্যাহতি দিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই মামলায় সেই সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আরো কয়েকজন আসামি ছিলেন। বিষয়টি গোপনে করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠলেও পুলিশ বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে।
ডিএমপির চার থানা ও ফতুল্লা থানায় করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামিও আব্দুল আউয়াল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি মামলা হয়। কিন্তু গত ২৩ ডিসেম্বর মামলা থেকে ছয় আসামিকে অব্যাহিত দিতে পুলিশ সদর দফতরে চিঠি দেয় তদন্ত কর্মকর্তা। তারা হলেন- মো. আব্দুল আউয়াল, রবিউল, জাফরুল হক, খোকন আচার্য হৃদয়, জালাল মোল্লা, আব্দুল্লাহ ও মকবুল হোসেন। অথচ আব্দুল আউয়াল আওয়ামী লীগের পদদধারী নেতা ছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতার সঙ্গে তার ছবিও রয়েছে।

২০১৮ সালের ২ মার্চ রাজধানীর গুলশানের বাসা ফিরোজা থেকে বের হয়ে আদালতে যাওয়ার সময় বাংলামোটরে সিগন্যালে আটকা পড়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহর। সেই সময় গাড়িবহরে কয়েক দফা হামলা চালানো হয়। এই হামলায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা মশিউর রহমান রুবেল ও মামুনুর রশীদের পাশাপাশি আব্দুল আউয়াল, আব্দুল্লাহ, জালাল মিয়া, মকবুল হোসেনসহ আরো অনেকে অংশ নেন। সেদিন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা সামিউল হককে রাস্তায় ফেলে পেটায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এ ঘটনায় তখন কোনো মামলা না হলেও সম্প্রতি শাহবাগ থানায় মামলা হয়।
আলোচিত এই মামলার আসামি হলেন আব্দুল আউয়াল ও জাফরুল হক। তারা এখন নবীনগর এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরছেন। শুধু তাই নয় মামলার চার্জশিট থেকে অব্যাহতির চিঠি দেওয়ার পর তারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তারা এখন স্থানীয় বিএনপির নেতাদের ‘ম্যানেজ করে’ চলছেন বলে জানা গেছে।
গত শনিবার আউয়ালদের ইশারায় নবীনগরের মনিপুর গ্রামে রক্তক্ষয়ী এক সংঘর্ষ হয়। সেই ঘটনায় দুজন গুরুতর আহত হন। তারা এখন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন আছেন।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, আইনের চোখে পলাতক এমন গুরুত্বপূর্ণ মামলার আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

নবীনগর এলাকার ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি আউয়ালের ভয়ে এলাকায় যেতে পারি না। ২০০৮ সাল থেকে এলাকার মানুষের সঙ্গে নানা অপরাধ করে আসছিল। সেসব কাজে বাধা দেওয়ায় আমার নামে নবীনগর থানায় মামলা করে। সেই মামলায় পরে আমাকে তার সঙ্গে আপোস করতে হইছে। সে এলাকায় একজন বয়স্ক মানুষকেও ধরে মারে। সর্বশেষ এলাকায় সিএনজি অটোরিকশা আগেপরে যাওয়া নিয়ে দুইজনকে মাঠ থেকে ধরে এনে কোপাইছে। তারা এখন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন। তার ভয়ে এলাকায় কথা বলে না।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আউয়ালের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা থানার বিস্ফোরক মামলা (মামলা নং-১৮) হয়। এছাড়া ডিএমপির বাড্ডায় ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর একটি (মামলা নং- ১৬ মামলা হয়, যাতে তিনি ৬৭ নম্বর আসামি।
২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল ডিএমপির যাত্রাবাড়ি থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা (যার নং-১৬) হয়, যাতে তিনি ৭৪ নম্বর আসামি। ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানায় একটি মামলা হয় (মামলা নং-১০০)। ওই মামলার ১৭১ নম্বর আসামি তিনি এবং সর্বশেষ আলোচিত শাহবাগ থানায় ২০২৪ সালের ২৩ নভেম্বর ডিএমপি শাহবাগ থানায় বেগম খালেদা জিয়াকে হত্যাচেষ্টা ও গাড়ি ভাঙচুর মামলা হয় (মামলা নং- ৩৩) যাতে তিনি ২৫০ নম্বর আসামি। সব মিলিয়ে আউয়ালের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ থানায় একটি, যাত্রাবাড়ী থানায় দুটি, বাড্ডায় একটি ও শাহবাগ থানায় একটি মামলা রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর রমনা বিভাগ থেকে আব্দুল আউয়াল ও রবিউল হাসান ওরফে ফরহাদকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে পুলিশ সদর দফতরে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে রমনা বিভাগের ডিসি মাসুদের স্বাক্ষর রয়েছে। খালেদার গাড়িবহরে হামলার আসামি কী করে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন থেকে বাদ পড়ল সে বিষয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার (৩৩ নং মামলা) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) হাসানুজ্জমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি এখনো চার্জশিট দেইনি। আগের কর্মকর্তা (এসআই ইয়ামিন) একটি কাগজ পুলিশ সদর দফতরে পাঠাইছিল। আমি বিষয়টি তদন্ত করছি। তার আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকার সংশ্লিষ্ট পাওয়া যাচ্ছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে জমা দেওয়া হয়নি। যেটা আগে দেওয়া হয়েছিল সেটা হলো কোন আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর তার সংশ্লিষ্টতা না থাকলে একটা কাগজ দেওয়া হয় সেটা দেওয়া হয়েছিল আরকি।’
যাত্রাবাড়ীতে দায়ের হওয়া ১০০ নম্বর মামলার ব্যাপারে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও যাত্রাবাড়ীর থানার এসআই হাসান বশির ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা তার ব্যাপারে সেই এলাকার থানার কাছে জানতে চেয়েছিলাম সে আওয়ামী লীগের কেউ কিনা বা এই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কিনা কিন্তু সেখান থেকে কোনো উত্তর আসেনি। তার আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। ফলে তার রাজনৈতিক কোনো সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া যায়নি।’
যাত্রাবাড়ী থানার আরেকটি মামলার (মামলা নং-১৬) তদন্তকারী কর্মকারী রিয়াজ হোসেন বলেন, ‘আমার মামলাটি তদন্ত করছি। এখনো চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়নি। আর তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা তাও এখনো জানতে পারিনি।’
বাড্ডা থানায় করা মামলার (যার নং-১৬) তদন্ত কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘আমরা এই মামলা এখনো তদন্ত করছি। চার্জশিট দেওয়া হয়নি। তবে আব্দুল আউয়ালের ব্যাপারে তথ্য থাকলে আমাদের দিতে পারেন। কাজ শেষে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হবে।’
এমআইকে/এমআর